গাজার শান্তিচুক্তি বারবার ভেঙে পড়ছে কেন?

গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা
গাজায় ইসরায়েলি হামলার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ধ্বংসস্তূপ পরিদর্শন করছেন ফিলিস্তিনিরা

মুক্তমন প্রতিবেদক : গাজায় যুদ্ধ বন্ধ ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একের পর এক চুক্তি ও পরিকল্পনা সামনে এলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন বারবার থমকে যাচ্ছে। এর অন্যতম বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে—চুক্তি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করবে কে এবং কোনো পক্ষ শর্ত না মানলে কীভাবে বিরোধের নিষ্পত্তি হবে, সে বিষয়ে আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নির্ধারণ না করা।

জুলাইয়ের শেষ দিকে গাজার জন্য ১৫ দফা একটি রোডম্যাপ প্রকাশ করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হামাস তার অস্ত্র একটি ফিলিস্তিনি কারিগরি কমিটির কাছে হস্তান্তর করবে এবং একটি আন্তর্জাতিক যাচাইকারী সংস্থা তা প্রত্যয়ন করবে। একই সঙ্গে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কথা বলা হয়।

তবে ৯ আগস্ট ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে। এরপর মার্কিন দূত জ্যারেড কুশনার মিসরের উপকূলে হামাসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি জেরুজালেমে যান। সেখানে প্রস্তাব আসে, হামাসের অস্ত্র আন্তর্জাতিক কমিটির বদলে একজন মার্কিন জেনারেলের তত্ত্বাবধানে হস্তান্তর করা হবে।

চুক্তির বাস্তবায়ন যাচাইয়ের দায়িত্ব নিয়ে এই পরিবর্তনই গাজা নিয়ে আগের চুক্তিগুলোর বড় দুর্বলতাকে সামনে এনেছে।

এডিনবরার বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘পিস অ্যাগ্রিমেন্ট ডেটাবেস অ্যান্ড ডেটাসেট’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে গাজা যুদ্ধবিরতি প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট চারটি চুক্তি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারির যুদ্ধবিরতি চুক্তি, অক্টোবরে হওয়া একাধিক যুদ্ধবিরতি ও সংশ্লিষ্ট চুক্তি এবং নভেম্বরে জাতিসংঘের একটি প্রস্তাব রয়েছে।

এসব চুক্তিতে জিম্মি ও বন্দিবিনিময়, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং গাজার জন্য একটি অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু চুক্তি লঙ্ঘনের সংজ্ঞা কী হবে, বিরোধ দেখা দিলে কে সিদ্ধান্ত দেবে এবং কোনো পক্ষ চুক্তি ভঙ্গ করলে প্রক্রিয়া কীভাবে আবার চালু হবে—এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কাঠামো ছিল না।

জানুয়ারি ২০২৫-এর চুক্তিতে জিম্মি ও বন্দিদের বিনিময়ের সংখ্যা, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পথ এবং বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের ঘরে ফেরার সময়সূচির মতো বিষয় বিস্তারিতভাবে উল্লেখ ছিল।

কিন্তু চুক্তি বাস্তবায়নে পক্ষগুলোকে বাধ্য করার কার্যকর ব্যবস্থা সেখানে রাখা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, মিসর ও কাতারকে পরবর্তী আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের হাতে চুক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা ছিল না।

এর ফলও দেখা যায় দ্রুত। প্রথম ধাপ ১ মার্চ শেষ হওয়ার পর দ্বিতীয় ধাপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এরপর ১৮ মার্চ ইসরায়েল গাজায় আবারও ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে।

অক্টোবর ২০২৫-এর দুটি চুক্তির লক্ষ্য ছিল নতুন শর্তে শান্তি প্রক্রিয়াকে আবার সচল করা। ১০ অক্টোবরের চুক্তিতে জানুয়ারির চুক্তির দুর্বল প্রয়োগব্যবস্থা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হয়।

ইসরায়েল থেকে পরিচালিত যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের অধীনে একটি কেন্দ্র গঠন করা হয়, যার কাজ ছিল মানবিক সহায়তা সমন্বয় ও যুদ্ধবিরতি পর্যবেক্ষণ করা।

তবে দুই মাস পরও পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়নি। ত্রাণকর্মী ও জাতিসংঘের কর্মীরা গাজায় ত্রাণ প্রবেশে নানা বাধা এবং ভবিষ্যতে গাজা কে শাসন ও নিরাপত্তা দেবে—এ নিয়ে আলোচনার ঘাটতির কথা জানান।

১৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, কাতার ও তুরস্কের নেতারা তথাকথিত ‘ট্রাম্প ডিক্লারেশন ফর এন্ডিউরিং পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’-তে স্বাক্ষর করেন। এতে ধর্মীয় সহনশীলতা, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সংলাপের মতো বিস্তৃত নীতির কথা বলা হয়।

তবে ইসরায়েল ও হামাস কেউই এতে স্বাক্ষর করেনি। যুদ্ধরত পক্ষগুলো কোনো চুক্তিতে স্বাক্ষর না করলেও গ্যারান্টর রাষ্ট্রগুলো স্বাক্ষর করতে পারে। কিন্তু যেসব পক্ষ চুক্তিতে নেই, তাদের হয়ে অন্য রাষ্ট্রগুলো মানবাধিকার বা সহনশীলতার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সেই নীতিগুলো বাস্তবায়নে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তাও চুক্তিতে স্পষ্ট করা হয়নি।

নভেম্বরের জাতিসংঘের প্রস্তাব ছিল প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে ট্রাম্পের ‘কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান টু এন্ড দ্য গাজা কনফ্লিক্ট’ আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন করা হয় এবং গাজার রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য একটি নতুন অন্তর্বর্তী কাঠামোর নেতৃত্বে ‘বোর্ড অব পিস’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়।

তবে এই বোর্ডে কারা থাকবেন, এমনকি নারীদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না—এসব বিষয়েও স্পষ্টতা ছিল না।

অবশ্য প্রস্তাবে গাজার অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য কাঠামো তৈরি করা হয়। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়।

কিন্তু এখানেও বাস্তবায়নের প্রশ্নে সমস্যা থেকে যায়। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সংস্কার ‘বিশ্বস্তভাবে’ সম্পন্ন হওয়া এবং গাজার পুনর্গঠন ‘অগ্রসর’ হওয়ার পর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার কথা বলা হলেও কখন এসব শর্ত পূরণ হয়েছে, তা নির্ধারণের জন্য কোনো নিরপেক্ষ কর্তৃপক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি।

জুলাইয়ের ১৫ দফা রোডম্যাপে আগের চুক্তিগুলোর ঘাটতি পূরণের কিছু চেষ্টা দেখা যায়। পরিকল্পনায় একটি আন্তর্জাতিক যাচাই কমিটির কথা বলা হয়েছিল, যারা উভয় পক্ষ প্রতিটি ধাপের শর্ত পূরণ করেছে কি না তা প্রত্যয়ন করবে। এরপরই পরবর্তী ধাপে যাওয়ার কথা ছিল।

কিন্তু পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে।

১৭ আগস্ট ‘বোর্ড অব পিস’ ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করে যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে সরে যাবে না। একই সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি যাচাইয়ের দায়িত্ব আন্তর্জাতিক বহুপক্ষীয় কমিটির পরিবর্তে একজন মার্কিন জেনারেলের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে।

এতে আবারও প্রশ্ন উঠছে—চুক্তির কোনো পক্ষ শর্ত না মানলে কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে?

গাজায় কার্যকর শান্তিচুক্তির জন্য শুধু যুদ্ধবিরতি বা ধাপে ধাপে কিছু পদক্ষেপ নির্ধারণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন এমন একজন নিরপেক্ষ সালিশকারী বা মধ্যস্থতাকারী, যাকে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি উভয় পক্ষই গ্রহণ করতে পারে।

চুক্তি শুরুর আগেই নির্ধারণ করতে হবে—কোন ঘটনাকে চুক্তিভঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হবে, বিরোধ দেখা দিলে কে সিদ্ধান্ত দেবে এবং চুক্তি ভঙ্গের পর কীভাবে প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু হবে।

একই সঙ্গে মিসর, কাতারসহ যেসব আঞ্চলিক পক্ষ শান্তি প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তাদেরও এই ব্যবস্থার অংশ হতে হবে।

এর পাশাপাশি গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থায় ফিলিস্তিনিদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। যুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর তাদের জন্য একটি রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও নিজেদের ভাগ্য নির্ধারণের বাস্তব সুযোগ না থাকলে শুধু নিরস্ত্রীকরণ বা সাময়িক যুদ্ধবিরতি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন।

অতীতের চুক্তিগুলোর সবচেয়ে বড় শিক্ষা তাই হলো—শান্তিচুক্তি শুধু কী করতে হবে তা বললেই কার্যকর হয় না; কে তা নিশ্চিত করবে এবং চুক্তি ভাঙলে কী হবে, সেটিও শুরুতেই নির্ধারণ করতে হয়।