মুক্তমন রিপোর্টার : যুক্তরাজ্যে হোটেলে অবস্থানরত আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা গত এক বছরে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের শেষে ১৬০টি হোটেলে ১৬ হাজার ২১ জন আশ্রয়প্রার্থী অবস্থান করছিলেন। এক বছর আগে একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৪১ জন।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ ৫৬ হাজার ১৮ জনে পৌঁছেছিল।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আশ্রয় ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ফলে যুক্তরাজ্যে বৈধ পথে প্রবেশ এবং আশ্রয়ের আবেদন—দুই ক্ষেত্রেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে হোটেলের পরিবর্তে বেসরকারি আবাসনে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে।
সরকার হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীদের একাধিক পরিবারের বসবাসের উপযোগী ব্যক্তিগত ভাড়া বাড়ি অথবা হাউস ইন মাল্টিপল অকুপেশন (HMO)-এ স্থানান্তর করছে।
আশ্রয়প্রার্থীদের থাকার জন্য ব্যবহৃত হোটেলগুলো বিশেষ করে গত গ্রীষ্মে উগ্র ডানপন্থীদের বিক্ষোভ ও উত্তেজনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বর্তমান সরকার চলতি সংসদীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এসব হোটেলের ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে সরকার জানিয়েছিল, আরও ১৩টি হোটেলের ব্যবহার বন্ধ করা হয়েছে।
তবে হোটেলের বাইরে এখনো হাজার হাজার আশ্রয়প্রার্থী অস্থায়ী আবাসনে বসবাস করছেন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ৬৯ হাজার ৩৮ জন আশ্রয়প্রার্থী অস্থায়ী আবাসনে রয়েছেন। এসব আবাসন নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিতর্কের পাশাপাশি আশ্রয়প্রার্থীদের জীবনযাত্রার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
হোটেল থেকে আশ্রয়প্রার্থীদের অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল আবাসনে স্থানান্তরের ফলে আশ্রয় ব্যবস্থায় ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যয় ৮ শতাংশ কমেছে।
দেশজুড়ে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন আরও সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেসরকারি ভাড়া বাড়িতে তাদের রাখার জন্য বাড়তি অর্থ দেওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে। পরিকল্পনাটি ইংল্যান্ডের গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র অ্যান্ডি বার্নহামের প্রস্তাবের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, এসব পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে যে সরকার সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনছে এবং অভিবাসন ব্যবস্থায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে আশ্রয়ের আবেদন জমে থাকা সংখ্যা কমেছে, হোটেলে থাকা আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা কমছে এবং নির্বাসন ও ফেরত পাঠানোর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশের ঘটনাও গত এক বছরে ২৩ শতাংশ কমেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, মানবপাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়ানো এবং ফরাসি পুলিশের নৌকা আটকানোর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনিয়মিত পারাপার কমেছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ফ্রান্স সরকারের সঙ্গে একটি চুক্তি করেছিলেন। এর আওতায় যুক্তরাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করা কিছু অভিবাসীকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর বিনিময়ে অন্য কিছু ব্যক্তির জন্য যুক্তরাজ্যে আসার নিরাপদ ও বৈধ পথ রাখার কথা ছিল। এই ব্যবস্থা ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ নীতি হিসেবে পরিচিত।
তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যবস্থা চালুর পর ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সময় বলপ্রয়োগের ঘটনা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। মোট ২১০টি ঘটনায় বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮১টি ঘটনায় শারীরিক নিয়ন্ত্রণের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে।
দাতব্য সংস্থাগুলোর দাবি, ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সময় আশ্রয়প্রার্থীদের আহত হওয়ার ঘটনাও তারা নথিবদ্ধ করেছে।
শাবানা মাহমুদ বলেন, ছোট নৌকায় ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যুক্তরাজ্যে আসা ঠেকাতে আরও কাজ করতে হবে। তিনি জানান, এ কারণে ফ্রান্সের সৈকত ও বিদেশে নজরদারি ও অভিযান বাড়ানো হয়েছে এবং অনিরাপদ ও অবৈধ পথে যুক্তরাজ্যে আসতে মানুষকে উৎসাহিত করার কারণগুলো মোকাবিলায় নতুন আইন করা হয়েছে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইগ্রেশন অবজারভেটরির নুনি ইয়র্গেনস বলেন, আশ্রয়ের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব হওয়ায় সরকার অনেক হোটেল খালি করতে পেরেছে। তবে এখন আদালতে আশ্রয়ের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন জমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে নতুন পরিসংখ্যানে অভিবাসী কর্মীদের নিয়োগের জন্য স্পনসর করার অনুমতি হারানো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ওয়ার্ক রাইটস সেন্টারের তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা একটি আবেদনের তথ্য এবং ত্রৈমাসিক অভিবাসন পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে অভিবাসী কর্মীদের স্পনসর করার লাইসেন্স বাতিল হয়েছে ৪ হাজার ৪০৩টি। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৮২৮টি।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, শুধু আশ্রয়প্রার্থীদের হোটেল থেকে সরিয়ে অন্য ধরনের আবাসনে স্থানান্তর করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। তাঁদের মতে, আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের আইনগত অধিকারও সুরক্ষিত করতে হবে।
যুক্তরাজ্য সরকার অবশ্য বলছে, হোটেলনির্ভর আশ্রয় ব্যবস্থা কমিয়ে অভিবাসন ব্যবস্থায় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা ফিরিয়ে আনাই তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।