যাদুকাটায় রাতভর ড্রেজার, ভাঙনের শঙ্কায় গ্রাম

যাদুকাটা নদীর পাড়ে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য
যাদুকাটা নদীর পাড়ে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য

মুক্তমন রিপোর্ট: সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে যাদুকাটা নদীর পাড় কেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ড্রেজার ও সেভ মেশিন দিয়ে বালু তোলার কারণে নদীভাঙন তীব্র হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে পর্যটনকেন্দ্র শিমুল বাগান, নির্মাণাধীন সেতু এবং নদীর দুই পাড়ের অন্তত ২০-২৫টি গ্রাম ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে যাদুকাটা নদীর বিভিন্ন এলাকায় নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন করে আসছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে চলে এ কার্যক্রম। এতে নদীর তীর ও তলদেশের স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে ভাঙন বাড়ছে।

বাদাঘাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত জয়নাল আবেদীনের উদ্যোগে গড়ে ওঠা শিমুল বাগানটি প্রতি বসন্তে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। তবে নদীর তীর ঘেঁষে বালু উত্তোলনের কারণে বাগানটির অস্তিত্ব নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, গড়কাটি থেকে ঝালরটেক হয়ে ঘাগটিয়া পর্যন্ত নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে বালু উত্তোলনের জন্য গভীর গর্ত ও কোয়ারি তৈরি করা হয়েছে। এতে নদীর স্বাভাবিক গতিপথের পাশাপাশি তীরবর্তী বসতবাড়ি, কৃষিজমি ও স্থাপনা ঝুঁকিতে পড়েছে।

যাদুকাটা নদীর ওপর নির্মাণাধীন সেতুটিও ঝুঁকিতে পড়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। এরই মধ্যে সেতুর পাঁচটি গার্ডার ভেঙে পড়েছে। নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের কারণে তলদেশ ও তীরের মাটি দুর্বল হয়ে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের বক্তব্যে ঘাগটিয়া গ্রামের রানু মেম্বার ও মানিগাঁও গ্রামের হাসানের নাম এসেছে। তবে রানু মেম্বার তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের বালু উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে ২০-২৫টি গ্রাম ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। অনেক পরিবার বসতভিটা হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।

যাদুকাটা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল ও নাসির মিয়া বলেন, তাঁরা শুরু থেকেই নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের বিরোধিতা করে আসছেন। অবৈধ উত্তোলন বন্ধে নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপনের দাবি জানান তাঁরা।

সুনামগঞ্জের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, শিমুল বাগান, নির্মাণাধীন সেতু এবং নদীর দুই পাড়ের জনপদ রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। এ বিষয়ে পুলিশ ক্যাম্প ও কোস্টগার্ড নিয়োগের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।

তাহিরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) শাহরুক আলম শান্তনু বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে প্রশাসন নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মোবাইল কোর্টও পরিচালনা করা হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় ৬৬টি মামলা হয়েছে এবং ৭০১ জনকে আসামি করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে মোবাইল কোর্ট ও টাস্কফোর্সের অভিযান ছাড়া অবৈধ বালু উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন বলেও জানান তিনি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মতিউর রহমান খান জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। বিষয়টি প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে।

তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান মানিকও যাদুকাটা নদীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনার কথা জানিয়েছেন।

এদিকে শিমুল বাগানের বর্তমান মালিক রাখাব উদ্দিন বলেন, তাঁর বাবা দীর্ঘদিন ধরে তিল তিল করে বাগানটি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু নদীর পাড়ে বালু উত্তোলনের কারণে এখন বাগানটি হুমকির মুখে। প্রশাসনকে বারবার অবহিত করেও বালু উত্তোলন বন্ধ না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

ঘাগটিয়া গ্রামের বাসিন্দা রাফিয়া বেগম বলেন, নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের কারণে সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতিবাদ করলে ভয়ভীতি দেখানোরও অভিযোগ করেন তিনি।

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, যাদুকাটা নদীর তীর রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অবৈধভাবে নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী নজরদারি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে শিমুল বাগানের পাশাপাশি যাদুকাটা নদীর দুই পাড়ের বহু বসতি, কৃষিজমি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।