কে হতে যাচ্ছেন ঢাকা ১৮ আসনের ‘উত্তর দরজা’র এমপি?

জাহিদ ইকবাল, বিশেষ প্রতিনিধি: রাজধানীর উত্তরাঞ্চলের কৌশলগত, প্রশাসনিক এবং যোগাযোগগত দিক থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে একটি হলো ঢাকা–১৮।
দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এই আসনের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে অবস্থিত। উত্তরা, তুরাগ, দক্ষিণখান, উত্তরখান, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত এবং ভাটারা থানার একটি অংশ নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজধানীর “উত্তর দরজা” হিসেবে পরিচিত।
এই কারণে জাতীয় নিরাপত্তা, বাণিজ্য, নগর যোগাযোগ, পরিবহন, নগর পরিকল্পনা ও সেবা ব্যবস্থার দিক থেকে এর গুরুত্ব অন্যান্য আসনের তুলনায় অনেক বেশি।
গত এক দশকে ঢাকা–১৮ আসনে নগরায়ন, আবাসন সম্প্রসারণ, বাণিজ্যিক কার্যক্রম এবং বিমানবন্দর কেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জনসংখ্যা, ভোটার কাঠামো এবং সামাজিক বিন্যাসে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা উত্তরা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ভোটার সমৃদ্ধ। অন্যদিকে তুরাগ, দক্ষিণখান, উত্তরখান ও খিলক্ষেত অঞ্চলে ঘনবসতিপূর্ণ এবং দ্রুত সম্প্রসারণশীল ওয়ার্ড রয়েছে, যেখানে নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের উপস্থিতি বেশি।
ভাটারা থানার অংশে নতুন আবাসন প্রকল্প, বাণিজ্যিক স্থাপনা এবং মিশ্র জনসংখ্যার কারণে ভোটের সমীকরণ আরও বহুমাত্রিক হয়েছে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, এই আসনে ভোটের সিদ্ধান্ত মূলত তিনটি বিষয়ে বেশি প্রভাবিত হয়—নগর সেবা ও অবকাঠামো, জীবনযাত্রার ব্যয় ও অর্থনৈতিক চাপ, এবং প্রার্থীর ব্যক্তিগত পরিচিতি ও মাঠপর্যায়ের যোগাযোগ। এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো হলো—বিমানবন্দর সংলগ্ন যানজট, সড়ক ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পানি–গ্যাস সংযোগ, খাল ও জলাশয় রক্ষা, আবাসন খাতের নিয়ম-অনিয়ম এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা।
এবারের নির্বাচনে বৃহৎ রাজনৈতিক দল, জোট এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যা প্রতিযোগিতাকে করেছে বহুমুখী এবং উত্তেজনাপূর্ণ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন। তিনি এলাকাবাসীর কাছে পরিচিত “এলাকার ছেলে” হিসেবে। দীর্ঘদিন ধরে উত্তরা, তুরাগ, দক্ষিণখান, উত্তরখান ও খিলক্ষেত অঞ্চলে রাজনৈতিক এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকার কারণে পুরো ঢাকা–১৮ আসনে তিনি পরিচিত মুখ। স্থানীয় নাগরিক ইস্যুতে সম্পৃক্ততা, তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ এবং ওয়ার্ডভিত্তিক সংগঠন তার বড় শক্তি।
তার প্রচারণার মূল বিষয়গুলো হলো—দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি, নগর সেবার ঘাটতি, জলাবদ্ধতা, পরিবেশ সুরক্ষা, জলাশয় ভরাট প্রতিরোধ এবং বিমানবন্দর এলাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা।
বিশ্লেষকদের মতে, মাঠপর্যায়ের প্রচারণা, কর্মী সক্রিয়তা এবং এলাকাভিত্তিক পরিচিতির কারণে তিনি আপাতত এগিয়ে রয়েছেন।
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির আরিফুল ইসলাম আদিবকে অনেক সমর্থক “জুলাই বিপ্লবী ধারার রাজনীতির প্রতিনিধিত্বকারী” হিসেবে দেখছেন। তরুণ ভোটার, আন্দোলন–সচেতন নাগরিক এবং পরিবর্তনকামী গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তিনি সুশাসন, স্বচ্ছতা, দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, নাগরিক অধিকার এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। বিশ্লেষকরা মনে করেন, যদি ১১ দলীয় জোটের ভোট একত্রিতভাবে কেন্দ্রে আসে এবং তরুণ ভোটাররা সক্রিয় হয়, তাহলে তিনি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেন।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি ও সাবেক ডাকসুর ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না এই আসনের আরেক উচ্চপ্রোফাইল প্রার্থী। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কার্যক্রম, আন্দোলন–সংগ্রামের পটভূমি এবং নীতিনির্ভর বক্তব্যের কারণে তিনি রাজনৈতিকভাবে সচেতন ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য। তার প্রচারণায় গুরুত্ব পাচ্ছে—গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা, প্রশাসনিক সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং নাগরিক নিরাপত্তা। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা–১৮ এর মতো বিস্তৃত এবং ঘনবসতিপূর্ণ আসনে শক্তিশালী বুথভিত্তিক সংগঠন ছাড়া এগিয়ে যাওয়া কঠিন। অিার সেটি ভেবেই হয়তো ঠিক ৩ দিন আগে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন এই রাজনীতিবিদ।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে মোঃ আনোয়ার হোসেন অংশ নিচ্ছেন। দীর্ঘকাল রাজনৈতিক সংগঠন এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে সক্রিয় এই নেতা স্থানীয় ইসলামি সম্প্রদায়ের কাছে পরিচিত। তার প্রচারণার মূল বিষয়গুলো হলো—ধর্মীয় মূল্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, শিক্ষা এবং কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মহিউদ্দিন রনি আলোচনায় আছেন। দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় ইস্যুতে সক্রিয়তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং সরাসরি গণসংযোগের কারণে তার প্রভাব লক্ষ্যণীয়। বিশেষ করে খিলক্ষেত, দক্ষিণখান ও আশপাশের এলাকায় তার প্রচারণা চোখে পড়ছে। বড় দলগুলোর বাইরে থাকা প্রতিবাদী ভোট এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক সমর্থন তার দিকে গেলে ভোটের ব্যবধান কমাতে বা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা–১৮ আসনের ভোটার কাঠামোও অনেক বৈচিত্র্যময়। এখানে ভাড়াটিয়া এবং অস্থায়ী নগরবাসীর সংখ্যা বেশি। তারা প্রায়শই জাতীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ এবং নাগরিক সেবার মানকে ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাবিত করে। একই সঙ্গে উত্তরা ও আশপাশের পরিকল্পিত এলাকায় বসবাসকারীরা নগর পরিকল্পনা, পরিবেশ, ট্রাফিক এবং সেবা মানকে বেশি গুরুত্ব দেন।
মাঠপর্যায়ের চিত্র, প্রার্থীদের সক্রিয়তা, সংগঠনগত বিস্তার, ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং ভোটার সংযোগ বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—বিএনপি প্রার্থী এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন আপাতত এগিয়ে আছেন।
একই সঙ্গে, জুলাই বিপ্লবী পরিচয়কে পুঁজি করে ১১ দলীয় জোট প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদিবও উল্লেখযোগ্য ভোটার সহানুভূতি পেতে পারেন।
সব মিলিয়ে—কৌশলগত গুরুত্ব, বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যা, এলাকার জনগণের কাছে পরিচিত প্রার্থী এবং ভিন্নধারার রাজনৈতিক বার্তার কারণে ঢাকা–১৮ আসনের নির্বাচন এবারও জাতীয় আগ্রহের কেন্দ্রে।
শেষ পর্যন্ত ভোটার উপস্থিতি, জোটের সমন্বয়, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম এবং প্রার্থীর প্রতি আস্থাই নির্ধারণ করবে—কে হচ্ছেন ঢাকা–১৮ আসনের জনতার এমপি।
এবারের নির্বাচনে ঢাকা–১৮ আসনে মোট ১০ জন প্রার্থী অংশগ্রহণ করছে। তারা হচ্ছেন—এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন (বিএনপি), আরিফুল ইসলাম আদিব (এনসিপি, ১১ দলীয় জোট), মাহমুদুর রহমান মান্না (নাগরিক ঐক্য), মোঃ আনোয়ার হোসেন (ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ), মোঃ জসিম উদ্দিন (বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট), মোঃ জাকির হোসেন (জাতীয় পার্টি), সাবিনা জাবেদ (এনপিপি), সৈয়দ হারুন অর রশীদ (বাসদ), মহিউদ্দিন রনি (স্বতন্ত্র) এবং মোঃ ইসমাইল হোসেন (স্বতন্ত্র)।



