মত প্রকাশ

নিকুঞ্জ: যেখানে অটোরিক্সা নেই, শহরের বাতাসে বাজে শান্তির সুর

জাহিদ ইকবাল: নিকুঞ্জ‑টানপাড়া এলাকা আজ বাংলাদেশের জন্য একটি উদাহরণ। নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকা এবং খিলক্ষেত টানপাড়া এলাকায় প্রায় এক বছর ধরে ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রয়েছে। এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। বাংলাদেশের অন্যান্য শহরের অভ্যন্তরীণ এলাকায় এমন উদ্যোগ এতটুকু সফল হয়নি, যেখানে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে, দল‑ধর্ম ও রাজনৈতিক মতভেদকে পেছনে রেখে নিজেদের নিরাপত্তা, শান্তি এবং মানসম্মত জীবনযাত্রার স্বার্থে এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।
এই অর্জন সম্ভব হয়েছে এলাকাবাসীর দৃঢ় ঐক্য, সচেতনতা এবং বাস্তবমুখী মনোবলের কারণে, যার প্রভাব প্রতিদিনের জীবন, পথচারীর নিরাপত্তা এবং সামাজিক পরিবেশে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে। নিকুঞ্জ‑টানপাড়া শুধু একটি এলাকা নয়, এটি একটি সক্রিয় সমাজের মডেল, যেখানে নাগরিক সচেতনতা, স্বনির্ভর উদ্যোগ এবং মানবিক সংহতি একত্রিত হয়ে স্থায়ী পরিবর্তন আনছে।

ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা বা মোটরচালিত তিনচাকার যানগুলো শহরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বড় শহরের প্রতিটি এলাকা, গলি‑নালা এবং মূল সড়কে এই যানগুলো ছড়িয়ে পড়ায় সড়ক ঘনত্ব, যানজট এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। অল্প সময়ে বৃদ্ধি পাওয়া এই যানগুলোর কারণে পথচারীদের নিরাপদ চলাচল বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে এবং শহরের সাধারণ জীবনযাত্রায় বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। অধিকাংশ চালক ট্রাফিক আইন মানে না, লাইসেন্সবিহীনভাবে যান চালায়, যা অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা এবং ব্যক্তিগত ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশে প্রায় ৬০ লাখেরও বেশি ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা রয়েছে। রাজধানী ঢাকায় প্রায় ১০–১২ লাখ রিক্সা চলাচল করছে। এত বিশাল সংখ্যক যান নিয়ে কার্যকর মনিটরিং বা নিরাপত্তা নীতি নেই। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি, যানজট এবং পরিবেশগত সমস্যা ক্রমবর্ধমান।

জাতীয় ইনস্টিটিউট অফ ট্রমাটোলজী ও অর্থোপেডিক্সের (NITOR) তথ্য অনুযায়ী ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় ৩৬.৮৪% আহত হয়েছিল অটো রিক্সা বা ব্যাটারি রিক্সা‑সম্পর্কিত দুর্ঘটনায়। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর ছিল এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী অক্ষমতা দেখা গেছে। বিভিন্ন সমীক্ষা এবং গবেষণায় দেখা যায় ব্যাটারি‑চালিত রিক্সার দুর্ঘটনার ঝুঁকি সাধারণ প্যাডেল রিক্সার তুলনায় অনেক বেশি। একটি শহুরে গবেষণায় দেখা গেছে অংশগ্রহণকারী ব্যাটারি‑রিক্সা চালকদের ৪৪.৪৫% গুরুতর দুর্ঘটনার সম্মুখীন হয়েছে, যেখানে সাধারণ প্যাডেল‑রিক্সার অংশগ্রহণকারী মাত্র ২৯.৬%।

ঢাকার মতো বড় শহরে ব্যাটারি‑রিক্সার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আইন ও শৃঙ্খলা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি জরিপে দেখা যায় যে এলাকাভুক্ত সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ২০% এই যানগুলোর কারণে ঘটে, বিশেষত শিশু ও মহিলাদের ক্ষেত্রে।

ঢাকা শহরের অন্যান্য এলাকা এবং জেলা শহরগুলোতেও ব্যাটারি‑রিক্সার সমস্যার পরিধি সমান। যানজট, সড়ক দুর্ঘটনা এবং বায়ু দূষণসহ নানারকম সামাজিক সমস্যার কারণে শহরগুলোতে বসবাসের মান নষ্ট হচ্ছে। বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের চলাচল সীমিত হচ্ছে।

২০২৫ সালের ৩০ এপ্রিল নিকুঞ্জ‑টানপাড়া এলাকায় স্থানীয় কল্যাণ সমিতি, ক্লাব, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, নারীবাদী সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী দল মিলে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। জনসাধারণের উদ্যোগে এই যানগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়। এটি কোনো রাজনৈতিক আদেশে নয়; সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং শান্তির স্বার্থে দলীয় মতভেদ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থ পেছনে রাখা হয়। সহিংসতা এবং ঝুঁকি উপেক্ষা করেও এই উদ্যোগ সফল হয়েছে।

ফলাফল স্পষ্ট। যখন ব্যাটারি চালিত অটো রিক্সা বন্ধ থাকে, তখন সড়ক পরিবহন, পথচারীর নিরাপত্তা এবং আর্থ‑সামাজিক জীবনে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। স্থানীয় স্কুল, মাদ্রাসা এবং কলেজের ছাত্রছাত্রীরা নিরাপদে যাতায়াত করতে পারছে। পথচারীদের জন্য খোলা স্থান তৈরি হয়েছে। প্রবীণ এবং প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর চলাচল অনেক সহজ হয়েছে। শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্লাসে ফোকাস ও শিক্ষার মান উন্নত হয়েছে।

পরিবেশগত প্রভাবও সুস্পষ্ট। ব্যাটারি চালিত যান কমে যাওয়ায় রাস্তার শব্দ দূষণ প্রায় ৪০% কমেছে। বায়ু দূষণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্বাস্থ্যকর পরিবেশে মানুষের মানসিক চাপ কমেছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসা ও অর্থনীতিও লাভবান হয়েছে। নিরাপদ সড়কের কারণে দোকানপাট, বাজার এবং ব্যবসায়িক এলাকা সচল হয়েছে। গ্রাহকরা নিরাপদে ঘুরাফেরা করতে পারছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বেচ্ছাসেবী এবং কমিউনিটি মনিটরিং কার্যক্রম নিয়মিত চলছে। কমিটি সড়ক নিরাপত্তা, পথচারীর নিরাপত্তা এবং শিক্ষার্থীর যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করছে। স্থানীয় ক্লাব, যুব সংস্থা এবং সামাজিক সংগঠন সচেতনতা প্রচার করছে।

এলাকায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ বুঝেছে যে তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা এবং একত্রিত প্রচেষ্টা বড় পরিবর্তন আনতে সক্ষম। উদ্যোগটি শুধু শারীরিক নিরাপত্তা নয়, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশকেও উন্নত করেছে। এটি প্রায় এক বছর ধরে চলমান এবং মানুষের জীবনে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।

শিক্ষা ক্ষেত্রেও ইতিবাচক প্রভাব দেখা গেছে। নিরাপদ রাস্তা শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি বাড়িয়েছে। পঠন‑পাঠন প্রক্রিয়া আগের তুলনায় আরও সুষ্ঠু হয়েছে। মা‑বাবারা শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত নিয়ে কম উদ্বিগ্ন। স্থানীয় স্কুল ও কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের আগমন ও উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং শিক্ষার্থীরা নিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করতে পারছে।

স্বাস্থ্য ক্ষেত্রেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। দুর্ঘটনার সংখ্যা কমে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন যে সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত জরুরি রোগীর চাপ কমে গেছে। দীর্ঘমেয়াদীভাবে এটি স্থানীয় স্বাস্থ্য খাতে চাপ কমিয়েছে এবং সুশৃঙ্খল পরিবেশে চিকিৎসা সেবা আরও কার্যকর হচ্ছে।

পরিবেশগত সচেতনতার ক্ষেত্রে নিকুঞ্জ‑টানপাড়া মডেল অনন্য। ব্যাটারি‑রিক্সা বন্ধ থাকায় কার্বন নির্গমন কমেছে। স্থানীয় কমিটি নিয়মিত বৃক্ষরোপণ এবং সবুজ চত্বর বৃদ্ধি প্রকল্পে কাজ করছে। শিশু এবং যুবকরা সচেতনভাবে পরিবেশ রক্ষা ও নিরাপদ সড়ক ব্যবহার সম্পর্কে শিক্ষিত হচ্ছে।

কমিউনিটি উদ্যোগে নতুন দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মানুষ এখন স্বেচ্ছায় সড়ক নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করছে। স্থানীয় ক্লাব, যুব সংস্থা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত সচেতনতা ক্যাম্প পরিচালনা করছে।

সামাজিক দিক থেকেও পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই উদ্যোগের ফলে প্রতিবেশী সম্প্রদায়ের মধ্যে সহযোগিতা, পারস্পরিক সম্মান এবং সংহতির বোধ বৃদ্ধি পেয়েছে। নিকুঞ্জ‑টানপাড়া এলাকায় এখন নতুন সামাজিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, যেখানে পথচারী, ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থী একে অপরের প্রতি যত্নশীল।
অর্থনৈতিক প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ সড়কের কারণে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল হয়েছে। দোকানপাট, বাজার এবং ছোট উদ্যোগ নিরাপদ পরিবেশে পরিচালিত হচ্ছে। মানুষ নিরাপদে ঘুরাফেরা করতে পারায় স্থানীয় অর্থনীতি সক্রিয় এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে।

যদিও কিছু ব্যক্তি এখনও রাজনৈতিক সাইনবোর্ডকে পুঁজি করে এলাকাটিতে মরণযান এই অটোরিক্সা পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে, এলাকাবাসী প্রমাণ করেছে যে একত্রিত হলে তারা যে কোনো বিপদ মোকাবিলা করতে সক্ষম।

নিকুঞ্জ‑টানপাড়া এলাকা সারাদেশের মানুষের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছে। যখন জনগণ একত্রিত হয়, তখন অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। প্রশাসনিক উদ্যোগের পাশাপাশি জনসচেতনতা এবং ঐক্যই একটি সমাজকে দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ এবং স্থিতিশীল করে।

নিকুঞ্জ‑টানপাড়া কেবল একটি নগরাঞ্চল নয়; এটি এমন একটি সমাজের প্রতীক যেখানে জনঐক্য এবং মানবিক সচেতনতা মিলিত হয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে। এই অর্জন শুধু স্থানীয় ইতিহাস নয়, এটি সারাদেশে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের একটি আধুনিক অনুকরণীয় মডেল।

লেখক পরিচিতি:সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button