মত প্রকাশ

রাজনীতিতে ‘পায়ে সালাম’ সংস্কৃতি: ব্যক্তিপূজা বনাম গণতান্ত্রিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধ

জাহিদ ইকবাল: বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতির একাল-সেকাল বিশ্লেষণ করলে একটি নেতিবাচক প্রবণতা বারবার সামনে আসে—আর তা হলো ব্যক্তিপূজা বা নেতাকে অতিমানব করার চেষ্টা। অতি সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নেতাদের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এই ‘পায়ে ধরা’ সংস্কৃতি কেবল গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার বহির্ভূত নয়, বরং এটি একটি স্বৈরাচারী মানসিকতার পরিচায়ক এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষার পরিপন্থী।

বিগত দেড় দশকে আমরা দেখেছি কীভাবে জনবিচ্ছিন্ন রাজনীতিতে আনুগত্য প্রমাণের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছিল পা ছুয়ে সালাম করা। বয়সে বড় বা প্রবীণ নেতারাও নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে শেখ হাসিনাকে তুষ্ট করতে এই পথ বেছে নিতেন। এটি মূলত মানুষকে মানসিকভাবে ছোট করার এবং নেতার মনে “সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী” হওয়ার অহংকার জাগিয়ে তোলার একটি হাতিয়ার ছিল। যখন কোনো নেতা অন্যকে নিজের পায়ে নত হতে দেখে আনন্দ পান, তখন সেখানে আর গণতন্ত্র বা সাম্য অবশিষ্ট থাকে না; জন্ম নেয় এক নতুন স্বৈরাচার।

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে এই সংস্কৃতির প্রশ্রয় দেননি। এটি তার রাজনৈতিক রুচি ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা প্রমাণ করে। বর্তমানে তারেক রহমান যখন নতুন বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তখন কিছু উৎসাহী নেতা-কর্মীর মাঝে আবারও সেই পুরোনো ‘হাসিনা কালচার’ অর্থাৎ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এটি অবিলম্বে বন্ধ হওয়া জরুরি। কারণ, এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা দলে তেলবাজি বাড়ায়, যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্যকে বড় করে তোলে এবং শেষ পর্যন্ত নেতাকে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে।

ইসলামে সালাম একটি দোয়া এবং সম্মানের মাধ্যম, কিন্তু এই সম্মান প্রদর্শনের একটি নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। কাউকে সম্মান করতে গিয়ে সিজদাহর মতো ভঙ্গি করা বা মাথা নত করে পা স্পর্শ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

* অহংকার ও বিনয়: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে তিল পরিমাণ অহংকার থাকবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না” (সহীহ মুসলিম)। পায়ে হাত দিয়ে সালাম নেয়া ব্যক্তির মনে অজান্তেই অহংকার তৈরি করে, যা তার আমল ও ব্যক্তিত্বকে ধ্বংস করে দেয়।

* সিজদাহ কেবল আল্লাহর জন্য: ইসলামে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সামনে মাথা নত করা বা সিজদাহ করা নিষিদ্ধ। যদিও অনেকে একে ‘সম্মান’ হিসেবে দেখেন, কিন্তু এটি সরাসরি শিরকের কাছাকাছি একটি কাজ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে।

* সাহাবায়ে কেরামের আচরণ: নবী করিম (সা.)-এর দরবারে যখন সাহাবীরা আসতেন, তারা কখনও তাঁর পা ছুয়ে সালাম করতেন না। বরং তারা মুসাফাহা (হাত মেলানো) বা মুয়ানাকা (কোলাকুলি) করতেন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে কেউ যখন তার কোনো ভাই বা বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তখন সে কি মাথা নত করবে?’ তিনি বললেন, ‘না’ (সুনানে ইবনে মাজাহ)।

রাজনীতি হওয়া উচিত মানুষের কল্যাণের জন্য, ব্যক্তিপূজার জন্য নয়। ‘পায়ে সালাম’ করার এই চর্চা মানুষকে দাসে পরিণত করে এবং নেতাকে উদ্ধত করে তোলে। তারেক রহমান বা নতুন প্রজন্মের নেতাদের উচিত এখনই কঠোর নির্দেশনার মাধ্যমে এই প্রথা নিষিদ্ধ করা। নেতা ও কর্মীর সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার, দাসত্বের নয়।
আমরা যদি একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চাই, তবে সমাজ ও রাজনীতি থেকে এই ‘পায়ে ধরা সংস্কৃতি’ উপড়ে ফেলতে হবে। মনে রাখতে হবে, মানুষের মাথা নত হবে কেবল সৃষ্টিকর্তার সামনে, অন্য কারো সামনে নয়।

লেখক পরিচিতি: সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েন।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button