মুক্তমন প্রতিবেদন : গ্রামীণফোনের জিপি শিল্ড ওয়েবসাইটের হোমপেইজে দুটি সংখ্যা চোখে পড়ে—মোট স্ক্যান এবং মোট ব্লক।
ওয়েবসাইটে প্রদর্শিত হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ছয়শো আটাত্তর কোটি অনুরোধ স্ক্যান করা হয়েছে। এর মধ্যে ব্লক করা হয়েছে প্রায় এক কোটি আটচল্লিশ লাখ।
অনুপাতে হিসাব করলে প্রায় প্রতি সাড়ে চারশো অনুরোধের মধ্যে একটি ব্লক হয়েছে।
সংখ্যার নিচে রয়েছে মে মাসের শেষ থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত দিনভিত্তিক একটি গ্রাফ। আর একই পাতার ওপরে বড় অক্ষরে লেখা—
“অনলাইনে আপনার সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান জিপি শিল্ড।”
কিন্তু একই ওয়েবসাইটের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে লেখা হয়েছে ভিন্ন কথা।
সেখানে বলা হয়েছে, সেবাটি ব্যবহার করলেও সব সম্ভাব্য হুমকি, আক্রমণ বা দুর্বলতা প্রতিরোধ করা যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না।
একই পণ্যের ওয়েবসাইটের এক জায়গায় ‘সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান’, আর আইনি শর্তে ‘সব হুমকি ঠেকানোর নিশ্চয়তা নেই’—এই দুই বক্তব্যের মধ্যকার ব্যবধান থেকেই শুরু হয় জিপি শিল্ড নিয়ে অনুসন্ধান।
প্রশ্ন হলো—জিপি শিল্ড আসলে কী করতে পারে?
আর কী করতে পারে না?
মাসে ৫০ টাকার সাইবার নিরাপত্তা
গ্রামীণফোন ‘জিপি শিল্ড’ বাজারে আনে ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর।
কোম্পানির সে সময়ের প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, মাইজিপি অ্যাপের মাধ্যমে মাসে ৫০ টাকা অথবা বছরে ৫০০ টাকায় সেবাটি নেওয়ার সুযোগ ছিল।
বর্তমানে জিপি শিল্ডের ওয়েবসাইটে দুটি প্যাকেজ দেখা যায়—মাসিক ৫০ টাকা এবং বার্ষিক ৪০০ টাকা।
এ দুটি মূল্য ছাড়ের পরের বলে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়মিত মূল্য হিসেবে দেখানো হয়েছে মাসে ১০০ টাকা এবং বছরে ১ হাজার ২০০ টাকা।
শর্তে বলা হয়েছে, সেবাটি ব্যবহারের জন্য গ্রামীণফোনের সিম এবং একটি স্মার্টফোন প্রয়োজন।
জিপি শিল্ডের বিজ্ঞাপনে বিশেষভাবে সামনে আনা হয়েছে অনলাইন ব্যবসা ও ফেসবুক পেইজের নিরাপত্তার বিষয়টি।
ফেসবুকে প্রচারিত একটি বিজ্ঞাপনে উদ্বিগ্ন এক নারী উদ্যোক্তাকে দেখানো হয়। সেখানে ক্যাপশনে লেখা—
“হঠাৎ দেখি আমার পেইজ হ্যাকড।”
আর বিজ্ঞাপনের ওপরের অংশে লেখা—
“আপনার অনলাইন পেইজকে হ্যাকার থেকে সেফ রাখতে ব্যবহার করুন জিপি শিল্ড।”
ওয়েবসাইটেও চারটি মূল সুবিধার কথা বলা হয়েছে—
· ডিভাইস সুরক্ষা
· ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা
· হ্যাকার ঠেকানো
· প্রতারণা ঠেকানো
বাংলাদেশে এই ধরনের নিরাপত্তা পণ্যের সম্ভাব্য বাজারও ছোট নয়।
ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের হিসাবে, দেশে ফেসবুকে ব্যবসার পেইজ রয়েছে পাঁচ লাখের বেশি। এর মধ্যে নিয়মিত বিক্রি হয় প্রায় ৬০ হাজার পেইজে।
অন্যদিকে সাইবার ক্রাইম অ্যাওয়ারনেস ফাউন্ডেশনের ২০২৪ সালের জরিপ অনুযায়ী, দেশে সাইবার অপরাধের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনার একটি হলো সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং। মোট ঘটনার ২১ দশমিক ৬ শতাংশ এই শ্রেণির।
অর্থাৎ, অনলাইন ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগগুলোর একটি যখন অ্যাকাউন্ট ও পেইজ বেদখল, তখন জিপি শিল্ডের বিজ্ঞাপন সেই উদ্বেগকেই সামনে আনছে।
কিন্তু পণ্যটি কি সত্যিই ফেসবুক পেইজ হ্যাক হওয়া ঠেকাতে পারে?
জিপি শিল্ড আসলে কী?
জিপি শিল্ডের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসের প্রথম অংশে বলা হয়েছে, সেবাটি পরিচালিত হয় সিসকোর Umbrella Mobile Protection প্রযুক্তির মাধ্যমে।
এটি মূলত একটি DNS স্তরের ক্লাউডভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ইন্টারনেটে মানুষ ওয়েবসাইটের নাম লেখে অক্ষরে—যেমন কোনো ওয়েবসাইটের ডোমেইন নাম।
কিন্তু ইন্টারনেট যোগাযোগ করে সংখ্যার মাধ্যমে, যাকে বলা হয় আইপি অ্যাড্রেস।
একটি ওয়েবসাইটের নাম থেকে তার সংখ্যাভিত্তিক আইপি ঠিকানা খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াকে বলা হয় DNS Resolution।
জিপি শিল্ড কাজ করে এই জায়গায়।
কোনো ডোমেইন যদি আগে থেকেই ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত থাকে, তাহলে DNS সেটির আইপি ঠিকানা খুঁজে দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ করে দিতে পারে।
ফলে সেই ওয়েবসাইটের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয় না।
জিপি শিল্ডের ফিল্টারিং কার্যক্রম পরিচালিত হয় সিসকোর Talos Threat Intelligence-এর তথ্যভান্ডারের ভিত্তিতে।
সিসকো একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নেটওয়ার্ক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। তাদের Talos বিভাগ বিশ্বজুড়ে সাইবার হুমকি পর্যবেক্ষণ করে ক্ষতিকর ডোমেইন ও অবকাঠামোর তালিকা তৈরি ও হালনাগাদ করে।
জিপি শিল্ড মূলত সেই তালিকা অনুসরণ করে।
সিসকো নিজেই এই ধরনের ব্যবস্থাকে বলে “First Line of Defense”—অর্থাৎ প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর।
জিপি শিল্ডের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসেও একই ধরনের অবস্থান উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ আর ‘সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান’—দুটি কি একই কথা?
সামনের প্রতিরক্ষা লাইন, নাকি পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থা?
‘ফার্স্ট লাইন অব ডিফেন্স’ কথাটি সহজভাবে বোঝার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রের উদাহরণ নেওয়া যেতে পারে।
সীমান্তে সেনাবাহিনীর সামনের প্রতিরক্ষা অবস্থানকে প্রথম প্রতিরক্ষা লাইন বলা যায়।
কিন্তু কোনো দেশ শুধু একটি সামনের সারি দিয়ে তার পুরো নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না।
পেছনে থাকে দ্বিতীয় স্তর।
তারও পেছনে থাকে আরও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সামনের প্রতিরক্ষা ভেঙে গেলে পরবর্তী স্তরগুলো সক্রিয় হয়।
করপোরেট সাইবার নিরাপত্তায়ও একই ধারণা ব্যবহৃত হয়।
বড় প্রতিষ্ঠানে DNS নিরাপত্তার পাশাপাশি থাকে—
· ফায়ারওয়াল
· অ্যান্টিভাইরাস ও এন্ডপয়েন্ট সিকিউরিটি
· মাল্টি-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন
· ইমেইল নিরাপত্তা
· লগ পর্যবেক্ষণ
· সিকিউরিটি অপারেশনস টিম
· ব্যাকআপ ও রিকভারি ব্যবস্থা
DNS ফিল্টার সেখানে প্রথম দিকের একটি প্রতিরক্ষা স্তর।
কিন্তু জিপি শিল্ডের বিজ্ঞাপনে যে ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে—‘সব নিরাপত্তা হুমকির এক নম্বর সমাধান’—তা গ্রাহকের কাছে একটি ভিন্ন ধারণা তৈরি করতে পারে বলে প্রশ্ন উঠছে।
বিশেষ করে যখন বিজ্ঞাপনে সরাসরি ‘হ্যাক হওয়া ফেসবুক পেইজ’-এর উদ্বেগকে সামনে আনা হচ্ছে।
ফেসবুক পেইজ কীভাবে বেদখল হয়?
ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট বেদখলের সব পদ্ধতি এক নয়।
অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাকার ক্ষতিকর কোনো ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীকে পাঠায় না।
ব্যবহারকারী নিজেই বৈধ ওয়েবসাইটে লগইন করা অবস্থায় আক্রান্ত হতে পারেন।
মেটা ২০২৩ সালে প্রকাশিত একটি নিরাপত্তা বিশ্লেষণে NodeStealer ও DuckTail নামের দুটি ম্যালওয়্যার পরিবারের কথা উল্লেখ করে।
দুটির প্রধান লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়িক পেইজের অ্যাডমিন ও ডিজিটাল মার্কেটিং পেশাজীবীরা।
এই ধরনের ম্যালওয়্যার ব্রাউজার থেকে পাসওয়ার্ড ও কুকি চুরি করতে পারে।
কুকির মধ্যে থাকে তথাকথিত Session Token।
একজন ব্যবহারকারী লগইন করার পর তার ব্রাউজারে এই সেশনের তথ্য সংরক্ষিত থাকে।
হ্যাকার যদি সেই সেশন টোকেন চুরি করতে পারে, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে তাকে নতুন করে পাসওয়ার্ড দিতে হয় না।
টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন বা ওটিপির প্রয়োজনও নাও হতে পারে।
হ্যাকার তখন ব্যবহারকারীর সক্রিয় সেশনের পরিচয় ব্যবহার করে ফেসবুকের বৈধ ডোমেইনেই প্রবেশ করতে পারে।
অর্থাৎ, সংযোগটি হতে পারে সরাসরি facebook.com-এর সঙ্গে।
এখানে একটি DNS ফিল্টারের জন্য বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
কারণ facebook.com ক্ষতিকর ডোমেইনের তালিকায় থাকার কথা নয়।
বরং এটি একটি বৈধ ও বহুল ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম।
ফলে ক্ষতিকর ডোমেইন ব্লক করার ব্যবস্থা এখানে স্বাভাবিকভাবে কাজ করার সুযোগ সীমিত।
মেটার বর্ণনায় আরও দেখা যায়, চুরি হওয়া সেশন বাতিল করে দেওয়ার পর হ্যাকাররা কৌশল পরিবর্তন করে।
অ্যাকাউন্টে প্রবেশের পর তারা নিজেদের ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট বা পেইজের অ্যাডমিন হিসেবে যুক্ত করে দিতে পারে।
একবার প্রশাসনিক অনুমতি পেয়ে গেলে শুধু সেশন বাতিল করলেই হ্যাকারকে সরানো যায় না।
ফলে পেইজের মালিকের নিজস্ব অ্যাডমিন তালিকায় ঢুকে পড়তে পারে একজন অননুমোদিত ব্যক্তি।
এই ধরনের আক্রমণ ঠেকানো DNS ফিল্টারের মূল কাজ নয়।
ফেসবুকের ভেতর থেকেই ফাঁদ
ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠান ডিসমিসল্যাব ২০২৩ সালে ‘অ্যাড ম্যানেজার স্ক্যাম’ নিয়ে একটি অনুসন্ধান প্রকাশ করে।
সেখানে একাধিক ফেসবুক পেইজ এবং ক্ষতিকর ওয়েবসাইট ব্যবহার করে একটি প্রতারণা চক্রের কার্যক্রমের তথ্য তুলে ধরা হয়।
ফাঁদ পাতা হতো ফেসবুকের ভেতরেই।
কখনো নতুন অ্যাড ম্যানেজারের ঘোষণা।
কখনো নতুন প্রযুক্তি বা এআই টুল ব্যবহারের প্রলোভন।
আবার কখনো ভয় দেখানো হতো যে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা না নিলে বিজ্ঞাপন দেওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।
ব্যবহারকারী ক্লিক করলে ক্ষতিকর ফাইল ডাউনলোড হওয়ার ঝুঁকি থাকত।
সেই ফাইলের মাধ্যমে পাসওয়ার্ড ও ব্রাউজার কুকি চুরি করা সম্ভব হতো।
এ ধরনের ঘটনায় ক্ষতিকর ডোমেইন থাকলে এবং সেটি আগে থেকেই থ্রেট ইন্টেলিজেন্স তালিকায় থাকলে DNS ফিল্টার কিছু ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।
কিন্তু একটি বড় সমস্যা হলো—আক্রমণকারীরা সবসময় নিজেদের ক্ষতিকর ডোমেইন ব্যবহার করে না।
ম্যালওয়্যার রাখা হতে পারে—
· গুগল ড্রাইভে
· ড্রপবক্সে
· ট্রেলোতে
· গুগল সাইটসে
· অথবা অন্য কোনো বৈধ ক্লাউড প্ল্যাটফর্মে
এসব সেবা নিজেরা ক্ষতিকর নয়।
ফলে পুরো ডোমেইন ব্লক করা সম্ভবও নয়।
এখন আর ফাইল ডাউনলোডও দরকার হয় না
সাইবার আক্রমণের কৌশল সময়ের সঙ্গে বদলাচ্ছে।
নতুন ধরনের ফিশিং আক্রমণে ব্যবহারকারীকে আর সবসময় ক্ষতিকর ফাইল ডাউনলোড করাতে হয় না।
মেইল আসতে পারে কোনো বৈধ অনলাইন সেবা ব্যবহার করে।
ইমেইলে বলা হতে পারে—আপনার বিজনেস অ্যাকাউন্ট বাতিল হতে যাচ্ছে।
আপিল করতে হবে।
লিংকে ক্লিক করলে ব্যবহারকারী এমন একটি পেইজে যেতে পারেন, যা দেখতে পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের মতো।
সেখানে চাওয়া হতে পারে—
· পাসওয়ার্ড
· ফোন নম্বর
· জন্মতারিখ
· পরিচয়পত্রের ছবি
· টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন কোড
এ ধরনের পেইজ বৈধ হোস্টিং প্ল্যাটফর্মেও তৈরি করা সম্ভব।
ফলে পুরো আক্রমণের যাত্রাপথে এমন কোনো ডোমেইন নাও থাকতে পারে, যা DNS ফিল্টারের তালিকায় আগে থেকেই ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত।
এখানেই DNS ফিল্টারিংয়ের সীমাবদ্ধতা।
সব ফিশিং লিংক কি সময়মতো ধরা পড়ে?
ফিশিং প্রতিরোধে DNS ফিল্টারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কোনো ফিশিং ডোমেইন আগে থেকেই ক্ষতিকর হিসেবে শনাক্ত থাকলে সেটি ব্লক করা সম্ভব।
কিন্তু নতুন তৈরি হওয়া ফিশিং সাইট শনাক্ত হওয়ার আগে একটি সময়ের ব্যবধান থাকে।
একটি গবেষণায় নতুন ফিশিং অবকাঠামো শনাক্ত ও ব্লকিং ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার আগে কয়েক ঘণ্টা থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সক্রিয় থাকার বিষয়টি উঠে এসেছে।
এই সময়ের মধ্যেই অনেক ব্যবহারকারী প্রতারণার শিকার হতে পারেন।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো, অনেক ফিশিং পেইজ হ্যাকারদের নিজস্ব ডোমেইনে থাকে না।
বৈধ ওয়েবসাইট হ্যাক করে সেখানে ফিশিং পেইজ বসানো হতে পারে।
এমন ক্ষেত্রে পুরো ডোমেইন ব্লক করলে বৈধ ব্যবসা বা ওয়েবসাইটও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, DNS ফিল্টার কার্যকর হলেও এটি প্রতিটি ফিশিং আক্রমণের বিরুদ্ধে নিশ্চিত সুরক্ষা দিতে পারে না।
কোথায় জিপি শিল্ড কার্যকর?
অনুসন্ধানে পাওয়া প্রযুক্তিগত তথ্য অনুযায়ী, DNS ফিল্টারকে সম্পূর্ণ অকার্যকর বলার সুযোগ নেই।
বরং এর নির্দিষ্ট কিছু কাজ রয়েছে।
যেমন—
কোনো ক্ষতিকর ওয়েবসাইট আগে থেকেই শনাক্ত হয়ে থাকলে এবং ব্যবহারকারী জিপির মোবাইল ডেটা ব্যবহার করে সেখানে প্রবেশের চেষ্টা করলে জিপি শিল্ড সেটি ব্লক করতে পারে।
ফিশিং ডোমেইন, ম্যালওয়্যার ডাউনলোড সার্ভার অথবা পরিচিত ক্ষতিকর ওয়েব অবকাঠামো ব্লক করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির ভূমিকা রয়েছে।
ম্যালওয়্যার ফোনে প্রবেশ করার পরেও অনেক ক্ষেত্রে সেটি তথ্য পাঠানোর জন্য দূরের সার্ভারের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
সেই যোগাযোগ যদি ক্ষতিকর ডোমেইনের মাধ্যমে হয় এবং সেটি থ্রেট ইন্টেলিজেন্স তালিকায় থাকে, তাহলে DNS ফিল্টার সেই যোগাযোগও বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
মাসে ৫০ টাকার একটি নিরাপত্তা সেবার ক্ষেত্রে এই ধরনের সুরক্ষা গ্রাহকের জন্য কার্যকর হতে পারে।
গ্রামীণফোনের প্রেস রিলিজেও ম্যালওয়্যার, র্যানসমওয়্যার ও ফিশিং প্রতিরোধের কথা বলা হয়েছে।
কিন্তু সেখানে ফেসবুক পেইজ হ্যাক প্রতিরোধের সরাসরি প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
প্রশ্নটি তৈরি হয়েছে ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞাপনের ভাষা থেকে।
ওয়েবসাইটে এক কথা, শর্তে আরেক কথা
জিপি শিল্ডের ওয়েবসাইটে বলা হচ্ছে—
“অনলাইনে আপনার সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান।”
একই সঙ্গে হ্যাকার ঠেকানোর দাবিও রয়েছে।
ফেসবুক বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হচ্ছে হ্যাক হওয়া পেইজের উদ্বেগ।
কিন্তু টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে বলা হয়েছে—
সেবাটি ‘As Is’ ভিত্তিতে দেওয়া হচ্ছে।
অর্থাৎ, যেমন আছে তেমন।
সব ধরনের হুমকি বা নিরাপত্তা লঙ্ঘন ঠেকানোর নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে না।
নিরাপত্তা লঙ্ঘনের কারণে গ্রাহকের তথ্য বা আর্থিক ক্ষতি হলে কোম্পানির দায়ও সীমিত।
শর্ত অনুযায়ী, কোম্পানির সর্বোচ্চ দায় হতে পারে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্রাহকের দেওয়া সেবামূল্যের সীমার মধ্যে।
মাসিক প্যাকেজের ক্ষেত্রে তা সর্বোচ্চ কয়েক মাসের ফি পর্যন্ত হতে পারে।
টাকা ফেরতের কোনো ব্যবস্থাও উল্লেখ নেই।
এখানে মূল প্রশ্ন হলো—
বিজ্ঞাপনে যে মাত্রার নিরাপত্তার ধারণা তৈরি করা হচ্ছে, পণ্যের আইনি শর্ত কি সেই মাত্রার নিশ্চয়তা দেয়?
শুধু জিপির মোবাইল ডেটায় সুরক্ষা
জিপি শিল্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা হলো এর কার্যপরিধি।
সেবাটি মূলত গ্রামীণফোনের মোবাইল ডেটা ব্যবহারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
ওয়াইফাই বা ভিপিএন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সেবার কার্যকারিতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে আলাদা শর্ত রয়েছে।
অর্থাৎ একজন ব্যবহারকারী যদি বাসার ওয়াইফাই, অফিসের ইন্টারনেট বা অন্য কোনো নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেন, তখন জিপি শিল্ড একইভাবে কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
ফেসবুক পেইজ যার ব্যবসার প্রধান মাধ্যম, তাকে নিরাপত্তার জন্য সর্বক্ষণ মোবাইল ডেটার ওপর নির্ভর করতে হলে সেটি বাস্তব ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে।
ফোনে সিসকোর সার্টিফিকেট কেন?
জিপি শিল্ডের প্রশ্নোত্তর অংশে কিছু ক্ষেত্রে ফোনে সিসকোর একটি সার্টিফিকেট ইনস্টল করার কথা বলা হয়েছে।
সাইবার নিরাপত্তায় সার্টিফিকেট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত বিষয়।
ফোন বা ব্রাউজারে আগে থেকেই কিছু বিশ্বস্ত সার্টিফিকেট কর্তৃপক্ষের তালিকা থাকে।
কোনো নিরাপদ ওয়েবসাইটে প্রবেশের সময় ফোন যাচাই করে—সাইটটির পরিচয় নিশ্চিত করার সার্টিফিকেট বিশ্বস্ত কোনো কর্তৃপক্ষ দিয়েছে কি না।
সঠিক হলে সংযোগ স্থাপন করা হয়।
নতুন কোনো ‘রুট সার্টিফিকেট’ যুক্ত হলে সেটি ফোনের বিশ্বাসের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এই ধরনের ব্যবস্থা নির্দিষ্ট নিরাপত্তা প্রযুক্তির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
তবে এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণের জন্য মধ্যবর্তী পর্যায়ে সার্টিফিকেট ব্যবহারের প্রযুক্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে।
কারণ, ভুলভাবে ব্যবহৃত হলে এটি তথাকথিত ‘ম্যান-ইন-দ্য-মিডল’ ধরনের ঝুঁকির সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিসকোর প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে এই সার্টিফিকেট কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে, গ্রাহকের কোন ধরনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে এবং এর নিরাপত্তা সীমাবদ্ধতা কী—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ও সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা গ্রাহকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আপনি কোন ওয়েবসাইটে যান, সেই তথ্য কার কাছে?
DNS প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো গোপনীয়তা।
একজন ব্যবহারকারী কোন কোন ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করছেন, তার DNS অনুরোধ একটি রিজলভারের মাধ্যমে যায়।
আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট প্রকৌশল বিষয়ক নথিতেও DNS তথ্য থেকে ব্যবহারকারীর অনলাইন আচরণ সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কেউ যদি—
· স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ওয়েবসাইটে যান
· ঋণ বা আর্থিক সেবার ওয়েবসাইটে যান
· নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের তথ্য খোঁজেন
· নির্দিষ্ট অনলাইন সেবা ব্যবহার করেন
তাহলে DNS অনুরোধের একটি দীর্ঘ তালিকা থেকে ব্যবহারকারীর অনলাইন আচরণ সম্পর্কে ধারণা তৈরি হতে পারে।
জিপি শিল্ডের প্রশ্নোত্তরে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে এবং GDPR মানার কথা বলা হয়েছে।
তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রকাশ্যে পাওয়া যায় না—
· DNS লগ কত দিন সংরক্ষণ করা হয়?
· তথ্য কোন দেশের সার্ভারে থাকে?
· গ্রামীণফোনের কোন পর্যায়ের কর্মীরা এই তথ্য দেখতে পারেন?
· তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে কোনো তথ্য বিনিময় হয় কি না?
· বাংলাদেশের গ্রাহকের ক্ষেত্রে GDPR কীভাবে প্রযোজ্য?
সিসকোর প্রকাশিত বিভিন্ন সেবায় লগ সংরক্ষণের একাধিক সময়সীমার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু বাংলাদেশের জিপি শিল্ড গ্রাহকের ক্ষেত্রে কোন নীতিটি প্রযোজ্য, তা স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন তথ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
আইন কী বলে?
বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এ মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপনের বিষয়ে বিধান রয়েছে।
আইনে মিথ্যা বা অসত্য বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ভোক্তাকে বিভ্রান্ত করার বিরুদ্ধে শাস্তির কথাও বলা হয়েছে।
আবার প্রতিশ্রুত সেবা না পাওয়ার ক্ষেত্রেও আইনি বিধান রয়েছে।
তবে বাস্তবে ভোক্তার জন্য অভিযোগ ও প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ নয়।
অনেক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে অভিযোগ করতে হয়।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থার জনবল ও সক্ষমতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে বিজ্ঞাপনের সত্যতা ও বিভ্রান্তিকর দাবি যাচাইয়ের জন্য বিশেষায়িত ও স্বতন্ত্র একটি নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানও নেই।
বিটিআরসি টেলিকম সেবার মান, নেটওয়ার্ক ও গ্রাহকসেবা তদারক করে।
কিন্তু কোনো বিজ্ঞাপনের প্রযুক্তিগত দাবি সত্য কি না, সেটি নিয়মিত যাচাই করা তাদের মূল দায়িত্বের মধ্যে পড়ে কি না—সেটিও প্রশ্নের বিষয়।
এখন কারা জবাব দেবে?
জিপি শিল্ডের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন নয় যে এটি আদৌ কাজ করে কি না।
DNS-ভিত্তিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত একটি স্বীকৃত প্রযুক্তি।
পরিচিত ক্ষতিকর ডোমেইন, ম্যালওয়্যার সার্ভার ও ফিশিং অবকাঠামোর বিরুদ্ধে এটি কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হতে পারে।
কিন্তু অনুসন্ধানে মূল প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
যে প্রযুক্তিকে তার নির্মাতা নিজেই ‘প্রথম প্রতিরক্ষা স্তর’ হিসেবে বর্ণনা করে, সেটিকে গ্রাহকের কাছে ‘সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান’ হিসেবে উপস্থাপন করা কতটা সঙ্গত?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—
ফেসবুক পেইজ হ্যাক হওয়ার মতো একটি জটিল সমস্যার সঙ্গে জিপি শিল্ডের বিজ্ঞাপন যুক্ত করা হলে একজন সাধারণ গ্রাহক কি পণ্যের প্রকৃত সীমাবদ্ধতা বুঝতে পারবেন?
গ্রামীণফোনের ওয়েবসাইটের দুই প্রান্তে এখন দুটি ভিন্ন বার্তা।
প্রথমটি—
“অনলাইনে আপনার সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান।”
আর দ্বিতীয়টি—
সব সম্ভাব্য হুমকি, আক্রমণ বা দুর্বলতা প্রতিরোধ করা যাবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।
প্রশ্ন হলো, গ্রাহক কোন কথাটি বিশ্বাস করবেন?
যদি পণ্যটি সব ধরনের নিরাপত্তা হুমকির সমাধান না হয়, তাহলে বিজ্ঞাপনে সেই ধারণা কেন দেওয়া হচ্ছে?
আর যদি ক্ষতি হয়, তাহলে একজন গ্রাহক কী পাবেন?
টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস অনুযায়ী, ক্ষতিপূরণের দায় সীমিত।
মাসিক প্যাকেজের গ্রাহকের ক্ষেত্রে সেই সীমা কয়েক মাসের ফি পর্যন্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, ফেসবুক পেইজ বেদখল হয়ে ব্যবসার লাখ টাকার ক্ষতি হলেও গ্রাহকের সম্ভাব্য প্রতিকার আর পণ্যের বিজ্ঞাপনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান থাকতে পারে।
সাইবার নিরাপত্তা পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রযুক্তি নয়, সঠিক প্রত্যাশা তৈরি করা।
কারণ নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় হ্যাকার নয়।
ঝুঁকি হতে পারে—ব্যবহারকারীর ভুল ধারণা।
একটি পণ্য তাকে সব ধরনের হ্যাকিং থেকে রক্ষা করবে—এই বিশ্বাস যদি তাকে অন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে বিরত রাখে, তাহলে সেটিই নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
জিপি শিল্ডের প্রযুক্তি হয়তো একটি কার্যকর প্রতিরক্ষা স্তর।
কিন্তু অনুসন্ধানের শেষে প্রশ্নটি থেকেই যায়—
প্রথম প্রতিরক্ষা স্তরকে কি ‘সব নিরাপত্তা-হুমকির এক নম্বর সমাধান’ বলা যায়?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন গ্রামীণফোন, বিটিআরসি এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কর্তৃপক্ষের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।