বাংলাদেশে অদৃশ্য শিশুশ্রম

বাংলাদেশে অদৃশ্য শিশুশ্রম

দায়মিরা আক্তার :

স্কুলের হাজিরা খাতায় তাদের নাম থাকে। তারপর একদিন নামটি মুছে যায়। রাষ্ট্র জানে শিশুটি স্কুলে নেই—কিন্তু সে কোথায় গেল, কী কাজ করছে, কার ঘরে আছে, কী অবস্থায় আছে—সেই হিসাব আর রাষ্ট্রের কাছে নেই।

রিক্তা মণির মৃত্যু সেই অন্ধকারের একটি নাম মাত্র।

গত জুনে ঢাকার ধানমন্ডির একটি বাসায়, যেখানে সে গৃহকর্মীর কাজ করত, তার মৃত্যু হয়। মানবাধিকার সংগঠন ব্লাস্ট মৃত্যুটিকে রহস্যজনক উল্লেখ করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

কিন্তু রিক্তা মণি কে ছিল?

সে কোন জেলা থেকে ঢাকায় এসেছিল? কার মাধ্যমে এসেছিল? কত টাকা বেতনে তাকে কাজে দেওয়া হয়েছিল? সেই টাকা সে নিজে পেত, নাকি অন্য কেউ নিত? কতদিন সে ওই বাসায় ছিল? সর্বশেষ কোন শ্রেণিতে পড়েছিল?

এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই।

মৃত্যুর পর তার নাম থানার নথিতে উঠেছে। কিন্তু তার আগে সে রাষ্ট্রের কোনো কার্যকর তালিকায় ছিল না।

এই একটি ঘটনাই বাংলাদেশের শিশুশ্রম, গৃহশ্রম, স্কুল থেকে ঝরে পড়া এবং অদৃশ্য শিশুদের সবচেয়ে বড় সংকটটির দিকে আমাদের নিয়ে যায়—শিশুরা হারিয়ে যায় না, রাষ্ট্রের হিসাব থেকে তারা হারিয়ে যায়।


স্কুল পর্যন্ত রাষ্ট্রের চোখ, তারপর?

বাংলাদেশে প্রায় সব শিশুই কোনো না কোনো সময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। ভর্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার নাম ওঠে খাতায়। ছেলে-মেয়ে, শ্রেণি, জেলা—সবকিছুর একটি প্রশাসনিক চিহ্ন তৈরি হয়।

স্বাধীনতার পর প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যাপক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অন্যতম বড় অর্জন। মেয়েদের স্কুলে আনা ছিল আরও বড় পরিবর্তন। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা কার্যত দেশের শিশুদের উপস্থিতির সবচেয়ে বড় নিয়মিত তালিকাগুলোর একটি।

শিশুশ্রমের জরিপ হয় বহু বছর পরপর। পথশিশুর পূর্ণাঙ্গ শুমারি নেই। গৃহকর্মীর সংখ্যা নিয়েও নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক তথ্য নেই।

কিন্তু স্কুলে হাজিরা নেওয়া হয় প্রতিদিন।

তাই প্রশ্নটি উল্টো দিক থেকে করা যায়—দেশে কত শিশু কাজে ঢুকল, তার নির্ভুল হিসাব হয়তো নেই। কিন্তু কত শিশুর নাম স্কুলের তালিকা থেকে হারিয়ে গেল, সেই তথ্য আছে।

সমস্যা হলো, নাম হারানোর পর সেই শিশুকে আর কেউ অনুসরণ করে না।

সে কি অন্য স্কুলে গেল?

মাদ্রাসায় গেল?

বাবার সঙ্গে ক্ষেতে কাজ করছে?

গ্যারেজে ঢুকেছে?

লেগুনার হেলপার হয়েছে?

অন্যের বাসায় গৃহকর্মী?

নাকি বিয়ে হয়ে গেছে?

রাষ্ট্রের কাছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর কোনো উত্তর নেই।


যে শিশুর কর্মস্থলের ঠিকানা নেই

কারখানার নিবন্ধন নম্বর থাকে। পরিদর্শক থাকে। শ্রমিকের তালিকা থাকে। অনেক প্রতিষ্ঠানে হাজিরা খাতা থাকে।

কিন্তু ধানমন্ডির একটি ফ্ল্যাটের গৃহকর্মীর কোনো শ্রম নিবন্ধন নেই।

মোহাম্মদপুরের লেগুনা স্ট্যান্ডের হেলপারের কোনো কেন্দ্রীয় তালিকা নেই।

ফুটপাতে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি করা শিশুটিকে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগ দেয়নি।

বস্তির ভেতরের একটি ছোট ধাতু বা প্লাস্টিক কারখানার শিশুশ্রমিকের নাম অনেক সময় কোনো সরকারি তালিকায় ওঠে না।

শিশুটি কাজ করছে, কিন্তু প্রশাসনিক অর্থে সে যেন নেই।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যই দেখায়, দেশের বিপুল সংখ্যক শিশুশ্রমিক অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। অর্থাৎ এমন জায়গায়, যেখানে নিয়োগকর্তা নেই, কর্মঘণ্টার রেকর্ড নেই, শ্রম পরিদর্শনের কাঠামো নেই—অনেক ক্ষেত্রে ঠিকানাটাও নেই।

এখানেই বাংলাদেশের শিশুশ্রম বিতর্কের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।

আমরা শিশুশ্রমের সংখ্যা নিয়ে কথা বলি, কিন্তু শিশুর গন্তব্য নিয়ে কথা বলি না।


অডিট যেখানে, শিশুর হিসাবও সেখানে

বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শিশুশ্রম কমার গল্প প্রায়ই সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বলা হয়। সেটি সত্যও।

কিন্তু এই সাফল্যের পেছনের ঘটনাটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি পোশাকে শিশুশ্রমের অভিযোগ ওঠার পর যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়। সম্ভাব্য বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা দেখা দেয়।

বাংলাদেশের পোশাক কারখানা তখন আন্তর্জাতিক নজরদারির আওতায় আসে।

পরিদর্শন শুরু হয়।

তালিকা তৈরি হয়।

শিশু শ্রমিকদের শনাক্ত করা হয়।

বিশেষ শিক্ষা কর্মসূচির ব্যবস্থা করা হয়।

অর্থাৎ প্রথমবারের মতো একটি বড় খাতে শিশুদের নাম ধরে হিসাব রাখার প্রক্রিয়া শুরু হয়।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—কারখানা থেকে বেরিয়ে যাওয়া সব শিশু কোথায় গেল?

সবাই কি স্কুলে ফিরে গেল?

সবাই কি নিরাপদ কর্মসংস্থানে গেল?

উত্তরটি কখনোই এত সরল ছিল না।

অনেকেই চলে যায় ছোট, অনিবন্ধিত ও নজরদারির বাইরে থাকা কর্মক্ষেত্রে।

এই অভিজ্ঞতার শিক্ষা শিশুশ্রম বন্ধ করা যাবে না—তা নয়।

শিক্ষা হলো, শুধু একটি জায়গা থেকে শিশুকে সরিয়ে দিলেই শিশুশ্রম শেষ হয় না। শিশুটি কোথায় গেল, সেটিও জানতে হয়।

আজও সেই শিক্ষা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।

যেখানে আন্তর্জাতিক ক্রেতার অডিট আছে, সেখানে নজরদারি আছে।

যেখানে নেই, সেখানে শিশুরাও অদৃশ্য।


সতেরো লাখের বেশি শিশুর ঠিকানা কোথায়?

ঝুঁকিপূর্ণ কয়েকটি খাতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক জরিপে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান এবং সেখানে কর্মরত শিশুদের তথ্য পাওয়া যায়।

কিন্তু জাতীয় শিশুশ্রমের মোট সংখ্যার সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায় ভয়াবহ এক ব্যবধান।

প্রতিষ্ঠান, সাইনবোর্ড বা শনাক্তযোগ্য কর্মস্থলে যে সংখ্যক শিশু পাওয়া যায়, তার বাইরে বিপুল সংখ্যক শিশু অনানুষ্ঠানিক নিয়োগে কাজ করে।

অর্থাৎ দেশের শিশুশ্রমের বড় অংশ এমন জায়গায়, যেখানে রাষ্ট্র পৌঁছায় না।

এটি কেবল পরিসংখ্যানের দুর্বলতা নয়।

এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন।

কারণ যে শিশুর কর্মস্থল অজানা, তার কর্মঘণ্টা জানা যায় না।

যার কর্মঘণ্টা জানা যায় না, তার ওপর নির্যাতন হচ্ছে কি না জানা যায় না।

যার ওপর নির্যাতনের খবর নেই, তার মৃত্যু হলে সেটিকে দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড—তা বোঝাও কঠিন হয়ে যায়।

রিক্তা মণির ঘটনা সেই কাঠামোরই একটি প্রতীক।


ছেলেরা দেখা যায়, মেয়েরা আরও বেশি অদৃশ্য

স্কুল থেকে ঝরে পড়া ছেলে ও মেয়ের গল্প এক নয়।

অনেক ছেলে স্কুল ছাড়ার পর কোনো না কোনো দৃশ্যমান শ্রমবাজারে যায়।

লেগুনার হেলপার।

গ্যারেজের কর্মচারী।

নির্মাণশ্রমিক।

কারখানার শ্রমিক।

দোকানের কর্মচারী।

এসব কাজ বিপজ্জনক হলেও দৃশ্যমান।

তাদের দেখা যায়।

কিন্তু মেয়েদের একটি বড় অংশের কাজ দৃশ্যমান নয়।

ঘরের রান্না।

ছোট ভাইবোনের যত্ন।

অসুস্থ স্বজনের সেবা।

ঘরে বসে উৎপাদনমূলক কাজ।

অন্যের বাসায় গৃহকর্ম।

তারপর বিয়ে।

এই কাজগুলোর অনেকগুলোই জাতীয় অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানে পূর্ণাঙ্গভাবে ধরা পড়ে না।

ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

একজন ছেলে স্কুল ছেড়ে রাস্তায় গাড়ির হেলপার হলে তাকে শ্রমিক হিসেবে দেখা যায়।

একজন মেয়ে স্কুল ছেড়ে সারাদিন ঘরের কাজ করলে তাকে অনেক জরিপে শ্রমিক হিসেবে দেখা হয় না।

অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মী হলেও তার কাজের জায়গাটি থাকে একটি ব্যক্তিগত বাসা—যেখানে শ্রম পরিদর্শনের সুযোগ নেই।

ফলে মেয়েদের শ্রম অদৃশ্য।

এবং অদৃশ্য হওয়ার কারণে তাদের ঝুঁকিও অদৃশ্য।


একটি বন্ধ ঘর কেন সবচেয়ে বিপজ্জনক কর্মস্থল

গৃহকর্মীর কর্মস্থল একটি ব্যক্তিগত বাড়ি।

বাইরে থেকে দেখা যায় না।

ভেতরে সাক্ষী থাকে না।

কাজের সময় নির্ধারিত থাকে না।

অনেক ক্ষেত্রে বেতন নিয়মিত দেওয়ার লিখিত চুক্তি থাকে না।

শিশুটি কোথা থেকে এসেছে, কে তাকে নিয়োগ দিয়েছে—তারও কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড থাকে না।

তাই নির্যাতন হলে প্রমাণ পাওয়া কঠিন।

মৃত্যু হলে তদন্ত আরও কঠিন।

বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের জন্য আইনগত সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা বহুদিনের। নীতিমালা থাকলেও সেটি পূর্ণাঙ্গ শ্রম আইন নয়। আদালতের নির্দেশনা ও বিভিন্ন সংশোধনের পরও মজুরি, কর্মঘণ্টা, বিশ্রাম, পর্যবেক্ষণ ও অভিযোগ ব্যবস্থার প্রশ্নে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।

ফলে অনেক সময় আইন ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তখনই, যখন ঘটনা হত্যাকাণ্ড বা গুরুতর নির্যাতনে গড়ায়।

তার আগের দীর্ঘ সময়টি—অতিরিক্ত শ্রম, আটকে রাখা বেতন, বিশ্রামের অভাব, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন—আইনের কার্যকর নজরদারির বাইরে থেকে যায়।

রিক্তা মণির আগে তার নাম কোনো শ্রমিক তালিকায় ছিল না।

মৃত্যুর পর সে মামলার নথিতে এসেছে।

এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা।


ঝরে পড়া: একটি প্রশাসনিক স্বীকারোক্তি

শিশুশ্রম নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রীয় আলোচনায় একটি সংখ্যা বারবার আসে—কত শিশু কাজ করছে।

কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি সংখ্যা হলো—কত শিশু স্কুল থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।

স্কুল থেকে ঝরে পড়া মানেই সবাই শ্রমবাজারে যাচ্ছে না।

কেউ মাদ্রাসায় যায়।

কেউ পরে আবার স্কুলে ফিরে আসে।

কেউ পরিবারের সঙ্গে অন্যত্র চলে যায়।

কিন্তু যারা আর ফিরে আসে না, তাদের একটি বড় অংশ চলে যায় এমন জায়গায়, যেখানে রাষ্ট্রের নিয়মিত উপস্থিতি নেই।

রাস্তায়।

ওয়ার্কশপে।

অন্যের বাসায়।

কৃষিক্ষেতে।

ছোট দোকানে।

পরিবারের অদৃশ্য শ্রমে।

অথবা বিয়ের মাধ্যমে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে।

তাই ঝরে পড়ার সংখ্যা শুধু শিক্ষার ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়।

এটি একটি সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ শিশু জনগোষ্ঠীর তালিকা।

কিন্তু বাংলাদেশে এখনো স্কুল থেকে ঝরে পড়া একটি শিশুর জন্য এমন কোনো জাতীয় অনুসরণব্যবস্থা নেই, যা তাকে খুঁজে বের করবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানে সে স্কুলে নেই।

শ্রম মন্ত্রণালয় জানে না সে কোথায়।

সমাজসেবা জানে না সে ঝুঁকিতে আছে কি না।

স্থানীয় প্রশাসন জানে না সে অন্যের বাড়িতে কাজ করছে কি না।

একটি শিশু রাষ্ট্রের এক তালিকা থেকে বাদ পড়ে—তারপর সে অন্য কোনো তালিকায় ওঠে না।


সংখ্যা কমলেই কি শিশুশ্রম কমে?

শিশুশ্রমের পরিসংখ্যান নিয়েও একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে।

বিভিন্ন সময়ে জরিপের সংজ্ঞা বদলেছে।

কাজের ঘণ্টার সীমা বদলেছে।

বয়সের সীমা বদলেছে।

ঝুঁকিপূর্ণ খাতের তালিকাও এক নয়।

ফলে এক জরিপের সঙ্গে আরেক জরিপের সংখ্যা সরাসরি তুলনা করা সব সময় সহজ নয়।

সংজ্ঞা পরিবর্তন করে শিশুশ্রমের সংখ্যা কম দেখানো সম্ভব—ইচ্ছাকৃতভাবে না হলেও পদ্ধতিগতভাবে।

কাজের ঘণ্টার সীমা বাড়ালে কিছু শিশু পরিসংখ্যান থেকে বাদ পড়ে যেতে পারে।

কিছু খাতের তালিকা পরিবর্তন করলে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সংখ্যা কমে যেতে পারে।

শ্রমশক্তির জরিপে বয়সসীমা পরিবর্তন করলেও একটি বড় অংশ দৃশ্যের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাই শুধু বলা যে শিশুশ্রম কমেছে বা বেড়েছে—তা যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন করতে হবে:

যে শিশুরা আগে কাজ করছিল, তারা এখন কোথায়?

যদি সেই প্রশ্নের উত্তর না থাকে, তাহলে পরিসংখ্যানের উন্নতি বাস্তবতার উন্নতি প্রমাণ করে না।


রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অজুহাত: ‘হিসাব করা কঠিন’

পথশিশুদের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা।

একটি নির্দিষ্ট জরিপে হাজার হাজার পথশিশুর সঙ্গে কথা বলা যায়।

তারা কোথায় ঘুমায়, কী খায়, কার হাতে নির্যাতনের শিকার হয়—এসব তথ্যও সংগ্রহ করা যায়।

কিন্তু দেশের মোট পথশিশুর সংখ্যা কত—তার উত্তর নেই।

কারণ পূর্ণাঙ্গ শুমারি করা হয়নি।

অর্থাৎ আমরা একটি শিশুর ঘুমানোর জায়গা পর্যন্ত জানতে পারি, কিন্তু দেশের কত শিশু রাস্তায় ঘুমায়—সেটির জাতীয় হিসাব করি না।

সমস্যাটি সামর্থ্যের নয়।

সমস্যাটি অগ্রাধিকারের।

যে বিষয়কে রাষ্ট্র গণনার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি গণনা করা সম্ভব হয়।

যেটিকে সিদ্ধান্ত নেয় না, সেটি অদৃশ্য থেকে যায়।


রান্নাঘর পর্যন্ত আইন না পৌঁছালে শিশুরা অদৃশ্যই থাকবে

বাংলাদেশে শিশুশ্রম নিয়ে ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সম্ভবত নতুন কোনো জরিপের সংখ্যা নয়।

প্রশ্ন হলো—

রাষ্ট্র কি শিশুর গন্তব্য জানার দায়িত্ব নেবে?

একটি শিশু স্কুল ছাড়ল।

তারপর কী হবে?

তার পরিবারকে কি কেউ খুঁজবে?

স্থানীয় পর্যায়ে কি জানা হবে সে কোথায় গেছে?

সে কি কাজে নেমেছে?

ঝুঁকিপূর্ণ কাজে আছে?

গৃহকর্মী হয়েছে?

বিয়ের ঝুঁকিতে আছে?

রাস্তার শিশুর তালিকায় গেছে?

এই প্রশ্নগুলোর জন্য শিক্ষা, শ্রম, সমাজসেবা, স্থানীয় সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বিত কাঠামো নেই।

অথচ প্রযুক্তির যুগে একটি শিশুর স্কুল ত্যাগের তথ্যকে ঝুঁকি-সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা অসম্ভব নয়।

কিন্তু তার জন্য প্রথমে রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে—স্কুল থেকে ঝরে পড়া শুধু শিক্ষার সমস্যা নয়। এটি শিশুর নিরাপত্তারও সমস্যা।


রিক্তা মণির নামটি আমাদের কী শেখায়?

রিক্তা মণি হয়তো কোনো স্কুলে পড়ত।

কোনো একদিন তার নাম হাজিরা খাতায় লেখা হয়েছিল।

তারপর কোনো একদিন নামটি আর ডাকা হয়নি।

তারপর সে হয়তো আরেকটি শহরে এসেছে।

অন্যের বাসায় কাজ করেছে।

তারপর একদিন তার মৃত্যু হয়েছে।

মৃত্যুর পর রাষ্ট্র তাকে খুঁজে পেয়েছে।

এই গল্পটি শুধু রিক্তা মণির নয়।

এটি বাংলাদেশের অগণিত শিশুর গল্প, যারা রাষ্ট্রের এক তালিকা থেকে বাদ পড়ে আরেকটি তালিকায় ওঠে না।

আমরা জানি কত শিশু স্কুলে ভর্তি হয়েছে।

আমরা মোটামুটি জানি কত শিশু ঝরে পড়েছে।

আমরা বিভিন্ন জরিপে জানতে পারি কত শিশু কাজ করছে।

কিন্তু এই তিনটি তথ্যকে একসঙ্গে রেখে আমরা এখনো বলতে পারি না—

স্কুল থেকে হারিয়ে যাওয়া শিশুটি কোথায় গেল?

সেখানেই বাংলাদেশের শিশুসুরক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শূন্যতা।

রিক্তা মণির মৃত্যুর তদন্ত অবশ্যই প্রয়োজন। দায়ী কেউ থাকলে তার বিচারও প্রয়োজন।

কিন্তু শুধু একটি মৃত্যুর বিচার যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন হলো, রিক্তা মণি যখন জীবিত ছিল, তখন তাকে রাষ্ট্র কেন দেখতে পায়নি?

তার নাম কোন তালিকায় ছিল?

তার কর্মস্থল কোথায় নিবন্ধিত ছিল?

তার নিয়োগকর্তা কে?

তার কাজের সময় কত?

তার বয়স কত?

তার বেতন কে নিত?

তার ওপর কেউ নজর রাখত কি না?

যে রাষ্ট্র এসব প্রশ্নের উত্তর জানে না, সে মৃত্যুর পর তদন্ত করতে পারে—কিন্তু জীবিত অবস্থায় সুরক্ষা দিতে পারে না।


শেষ কথা

পরের জরিপে শিশুশ্রমের সংখ্যা হয়তো কমবে।

সংজ্ঞা বদলাতে পারে।

ঘণ্টার সীমা বদলাতে পারে।

কিছু খাত বাদ যেতে পারে।

বয়সের সীমা পরিবর্তন হতে পারে।

কাগজে সংখ্যা কমানো কঠিন নয়।

কিন্তু শিশুরা সত্যিই কম ঝুঁকিতে আছে—এ কথা বলা যাবে একটিই শর্তে:

যে জায়গাগুলোতে শিশুরা হারিয়ে যায়, রাষ্ট্রকে সেসব জায়গায় পৌঁছাতে হবে।

অন্যের রান্নাঘর পর্যন্ত আইনকে যেতে হবে।

রাস্তা পর্যন্ত শুমারিকে যেতে হবে।

অনানুষ্ঠানিক কারখানা পর্যন্ত পরিদর্শনকে যেতে হবে।

স্কুল থেকে ঝরে পড়া শিশুর পেছনে প্রশাসনিক অনুসরণব্যবস্থাকে যেতে হবে।

তার আগে পর্যন্ত ঝরে পড়ার সংখ্যা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়।

এটি রাষ্ট্রের একটি নীরব স্বীকারোক্তি—

রাষ্ট্র জানে, শিশুটি চলে গেছে। কিন্তু কোথায় গেছে, তা জানার দায়িত্ব সে নেয়নি।

রিক্তা মণি কোন স্কুলে পড়ত, কোন বছর তার নাম হাজিরা খাতা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল—হয়তো কোথাও লেখা আছে।

কিন্তু সেই নামটি খুঁজে দেখার সময় আমাদের কারও হয়নি।