মুক্তমন রিপোর্ট : সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ার করতেও পিছপা হবে না—পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে জাস্টিস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টি (জেডিপি)। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য আইজিপিকে আল্টিমেটাম দিয়েছে দলটি। একই সঙ্গে পুলিশের এমন বক্তব্যের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেডিপির নেতারা।
সোমবার বিকেলে জাতীয় জাদুঘরের সামনে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হুমকির প্রতিবাদে আয়োজিত এক সভায় জেডিপির আহ্বায়ক নাঈম আহমাদ এ আল্টিমেটাম দেন।
নাঈম আহমাদ বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইঙ্গিত ছাড়া কোনো পুলিশ কর্মকর্তার পক্ষে এমন মানবাধিকারবিরোধী মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তাঁর অভিযোগ, পুলিশকে আবারও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আইজিপিকে বক্তব্য প্রত্যাহার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে।
জেডিপির আহ্বায়ক আরও বলেন, মাসখানেক আগে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’-এর আদলে বিচারবহির্ভূত অভিযান পরিচালনার গুঞ্জন উঠেছিল। আইজিপির সাম্প্রতিক বক্তব্যে নতুন করে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিকে কাজে লাগিয়ে ক্রসফায়ারের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা হচ্ছে কি না। সরকারের অনুমোদনের প্রসঙ্গ তোলায় পুলিশ এ ধরনের পদক্ষেপের জন্য অনুমতি চাইছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নাঈম আহমাদ বলেন, অপরাধ দমন ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তবে সেই দায়িত্ব পালনের নামে বিচারিক প্রক্রিয়ার বাইরে কাউকে হত্যার হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। অপরাধের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ও আদালতের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের অনুমোদন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বৈধতা দিতে পারে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা, জুলাই সনদের অঙ্গীকার ও গণভোটের গণরায়ের আলোকে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠিত হলে আইজিপি এমন মন্তব্য করার সাহস পেতেন না। তাঁর অভিযোগ, সরকার সংস্কারপ্রক্রিয়া উপেক্ষা করে দমন-পীড়নের পথ প্রশস্ত করছে। একই সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের তৎপরতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
গণভোট বাস্তবায়ন নাগরিক ফোরামের আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর বলেন, পুলিশ জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। অথচ সেই পুলিশই ক্রসফায়ারের অনুমতি চাইছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, এ ধরনের পদক্ষেপ আইন ও সংবিধানের লঙ্ঘন। বিএনপি সরকারের আগের মেয়াদে র্যাব গঠন ও ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি চালুর প্রসঙ্গ টেনে তিনি একই ধরনের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা প্রকাশ করেন। আইজিপির বক্তব্যের জন্য তাঁকে বহিষ্কারেরও দাবি জানান তিনি।
জেডিপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল আলিম বলেন, রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্রের সংখ্যা দিয়ে নয়, বরং সবচেয়ে দুর্বল নাগরিক কতটা নিরাপদ—তা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত। মানুষকে ভয় দেখানোর পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারকে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা পুলিশের দায়িত্ব, কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে উঠে যাওয়া কারও দায়িত্ব নয়। পুলিশকে শত্রু হিসেবে দেখার পরিবর্তে জনগণের বন্ধু হিসেবে দেখতে চান তাঁরা। তাঁর মতে, পুলিশকে অপরাধীর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিরপরাধ ও দুর্বল মানুষের পাশে থাকতে হবে।
প্রতিবাদ সভায় বাংলাদেশ ন্যাপের মহাসচিব এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য জাতিকে আতঙ্কিত করছে। তাঁর বক্তব্যে দেশকে আবারও ফ্যাসিবাদী শাসনের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে কি না, সেই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এটি সরকারের সিদ্ধান্ত, নাকি পুলিশ সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করতে চাইছে—সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের জন্য যেসব সুপারিশ করা হয়েছিল, সেগুলো বাস্তবায়ন না করার কারণ সরকারকে ব্যাখ্যা করতে হবে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলের মতো ক্রসফায়ার ফিরিয়ে আনার কোনো উদ্যোগ জনগণ মেনে নেবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
জেডিপির প্রধান সংগঠক আহছান উল্লাহ বলেন, আইজিপির বক্তব্য বাংলাদেশকে পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে। বিরোধী মত দমনে ক্রসফায়ারের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র হতে পারে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় ঔপনিবেশিক আমলের ১৮৬১ সালের পুলিশ অ্যাক্টের পরিবর্তে নতুন আইন প্রণয়ন করে পুলিশ সংস্কার করা প্রয়োজন। তিনি আইজিপির ক্ষমা চাওয়া এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে তাঁর পদত্যাগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।
জেডিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আব্দুল হামিদের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন মঞ্চ ২৪-এর আহ্বায়ক ফাহিম ফারুকী, জাতীয় ছাত্রমঞ্চের মুখপাত্র সালমান শরীফসহ অন্যরা।
Muktomon/TA