পুলক, বিভুর পর কি ভিউজ বাংলাদেশের কেউ?

পুলক, বিভুর পর কি ভিউজ বাংলাদেশের কেউ?

মানিক মিয়াজি : পুলক দা-কে নিয়ে সাংবাদিক সমাজ লিখছে। তাঁর সুইসাইড নোটে সমকাল থেকে পাওনা টাকার কথা উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে বেশ আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। পাওনা অর্থের বিষয়টি তাঁর জীবনের শেষ লেখাতেও উঠে এসেছে—এটি নিঃসন্দেহে আমাদের ভাবায়।
গত বছর মেঘনা নদী থেকে বিভুরঞ্জন সরকারের লাশ উদ্ধার করা হয়। তাঁর জীবনের শেষ লেখাতেও অর্থনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত ও কর্মজীবনের নানা ঘটনা, পাওয়া-না পাওয়া এবং হতাশার কথা উঠে এসেছিল। পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও বিভিন্ন অভিযোগের কথাও তিনি লিখে গেছেন।
একজন সাংবাদিক মারা যাওয়ার পর তাঁর পাওনা, সংকট ও শেষ সময়ের কষ্ট নিয়ে আমরা সরব হয়ে উঠি। কিন্তু একজন সাংবাদিক জীবিত থাকা অবস্থায় যখন নিজের পাওনা বেতন বা সম্মানীর জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা করেন, তখন সেই সংকটের দিকে আমরা কতটা নজর দিই?
এই প্রশ্ন থেকেই বলতে চাই ভিউজ বাংলাদেশ Views Bangladesh প্রসঙ্গে।
আমরা তখন ভিউজ বাংলাদেশে কাজ করতাম, সময়টা ছিল গত বছরের জুলাই-আগস্টের দিকে। তখন টানা প্রায় তিন মাস আমাদের বেতন বকেয়া ছিল। অনেক সহকর্মী ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছিলেন। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিষ্ঠানের সম্পাদক রাশেদ মেহেদী ব্যক্তিগত কাজে দেশের বাইরে ছিলেন—এমন বিষয়ও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।
একদিকে বেতন বকেয়া, অন্যদিকে বিভিন্ন সময়ে কয়েকজন সহকর্মী চাকরি হারাচ্ছিলেন। আমাদের এক সহকর্মীকে ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ আগে রুমে ডেকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনা আমরা দেখেছি। তাঁর চাকরি শেষ করার কারণ সম্পর্কে আমাদের কাছে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
আরেক সহকর্মী তাঁর সন্তানের দুধের টাকা জোগাড়ের জন্য সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসে অপেক্ষা করতেন—এমন ঘটনাও আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে। এভাবে অনেক সংবাদকর্মী তখন কঠিন আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছিলেন।
এর মধ্যে রাশেদ মেহেদী দেশে ফেরার পর আমরা কয়েকজন তাঁর সঙ্গে দেখা করে বেতন দিতে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চাই। তিনি আমাদের জানান, মামলা-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মতপার্থক্যের কারণে বেতন পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে। ভিউজ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বিনিয়োগকারী হিসেবে VISAThing-এর নাম আমরা জানতাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর Fiber at Home -ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে আমাদের জানানো হয়েছিল।
রাশেদ মেহেদী তখন আমাদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে দ্রুত সময়ের মধ্যে বকেয়া বেতন পরিশোধের ব্যবস্থা করা হবে।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমরা ভিন্ন ধরনের বক্তব্য শুনি। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়, কর্মীদের বকেয়া বেতনের বিষয়ে তাঁরা অবগত নন। এমনকি তাঁরা প্রশ্ন তোলেন—বেতন বকেয়া থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি কীভাবে অবকাশযাপনে যেতে পারেন?
এখানে আমরা রাজা-বাদশাহদের মধ্যকার বিরোধে ঢুকতে চাই না। আমরা সংবাদকর্মী। মাস শেষে বেতন পেয়ে পরিবার নিয়ে চলাই আমাদের প্রধান প্রত্যাশা।
এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবরের ২২ বা ২৩ তারিখের দিকে আমরা জানতে পারি, প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের একজনের বিরুদ্ধে জুলাই-সংক্রান্ত একটি হত্যা মামলা রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মামলার একটি কপি আমাদের কাছে রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্মানের কথা বিবেচনা করে এখানে তাঁদের নাম উল্লেখ করছি না। বিষয়টি জানার পর আমরা মনে করি, হয়তো মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণেই বেতন পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে—যে ব্যাখ্যাটি এর আগে আমরা পেয়েছিলাম।
বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য আমরা রাশেদ মেহেদীর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাঁর প্রতিক্রিয়া ছিল কঠোর। তিনি আমাদের তাঁর কক্ষ থেকে চলে যেতে বলেন। ফলে বিষয়টি নিয়ে আমাদের মধ্যে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
এর কয়েক দিন পর, ৩০ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে বিকেলে আমাদের সহকর্মীদের ডেকে জানানো হয় যে মামলা-সংক্রান্ত বিষয়সহ আরও কিছু কারণে মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি আর পরিচালনা করতে আগ্রহী নয়। এরপর আমাদের এক মাসের বেতন দেওয়ার কথা জানিয়ে ১ অক্টোবর থেকে কার্যকর দেখিয়ে চাকরি শেষের নোটিশ দেওয়া হয়।
নোটিশটি পাওয়ার পর আমরা প্রশাসন ও হিসাব বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাঁদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্দেশটি কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দেওয়া হয়েছে এবং আমাদের বকেয়া বেতনসহ অন্যান্য পাওনা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধ করা হবে।
এর পরের ঘটনাও আমাদের কাছে ছিল বিস্ময়কর। চাকরি শেষের নোটিশ দেওয়ার পরদিনই কয়েকজন সহকর্মীকে আবার ডেকে কাজ শুরু করার সুযোগ দেওয়া হয় এবং তাঁদের অব্যাহতি-সংক্রান্ত কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়।
চাকরি হারানো সহকর্মীদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে বিভিন্নভাবে রাশেদ মেহেদী ও মালিকপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তাঁদের মূল দাবি ছিল—বকেয়া বেতন ও আইন অনুযায়ী প্রাপ্য পাওনা পরিশোধ করা। কিন্তু আমাদের অভিযোগ, বিষয়টি দীর্ঘ সময়েও নিষ্পত্তি হয়নি। বরং কেউ কেউ চাপ, আইনি পদক্ষেপের আশঙ্কা কিংবা পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
আমাদের এক সহকর্মী বিষয়টি কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, ঢাকা। অ‌ভি‌যোগ ক‌রেন। ৩ মে তিনি অনলাইনে অভিযোগটি করেছিলেন। ১৬ জুনের শালিস প্রমাণিত হয়েছিল, তাকেসহ ভিউজ বাংলাদেশ-এর সব কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা শ্রম আইনের ২০ ধারার ঘ উপধারা অনুসারে বেআইনি। তাই তারা মোট পাঁচ মাসের বেসিক এর সমান গ্রাচ্যুইটি প্রাপ্য। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে পাওনা পরিশোধের বিষয়ে আলোচনা ও নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে আমরা জানতে পারি। তবে বিষয়টির মালিক পক্ষ এখনও নিষ্প‌ত্তি ক‌রে নাই।
এই বিষ‌য়ে আমা‌দের সহকর্মীর বক্তব‌্য আরও মর্মা‌ন্তিক। তি‌নি জানান ভিউজ বাংলা‌দে‌শে #ViewsBangladesh কর্মরত এক সি‌নিয়র রিপোটার ব‌লে‌ছেন, পার‌লে আদাল‌তের মাধ‌্যমে টাকা আদায় কর‌তে। একজন মাঠ পর্যা‌য়ের সাংবাদ কর্মী যখন তার সা‌বেক সহকর্মী‌কে এমন কথা ব‌লে তথন আমরা নি‌র্বাক হই।
এদিকে কয়েক দফায় আমরা #VisaThing ও #Fibre@Home-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছি। আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও বকেয়া পাওনা বাস্তবে নিষ্পত্তি হয়নি।
এখানে আমার প্রশ্ন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা নয়। প্রশ্নটি আরও বড়—একজন সংবাদকর্মীর শ্রমের মূল্য এবং তাঁর বেতন পাওয়ার অধিকার নিয়ে।
একজন সাংবাদিক যখন কাজ করেন, তখন তিনি শুধু নিজের জন্য কাজ করেন না। তাঁর আয়ের ওপর নির্ভর করে একটি পরিবার। মাসের পর মাস বেতন না পাওয়া মানে শুধু একটি হিসাবের খাতা আটকে থাকা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, খাবার এবং পরিবারের ন্যূনতম নিরাপত্তা।
পুলক দা কিংবা বিভুরঞ্জন সরকারের মতো কোনো সাংবাদিকের জীবনের শেষ পরিণতি আমাদের নতুন করে প্রশ্নের মুখোমুখি না করুক—এটাই প্রত্যাশা।
আমাদের দাবি খুব সাধারণ: যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের ন্যায্য পাওনা দ্রুত পরিশোধ করা হোক।
পাওনা আদায়ের জন্য একজন সংবাদকর্মীকে যেন বছরের পর বছর দরজায় দরজায় ঘুরতে না হয়। তাঁকে যেন নিজের শ্রমের মূল্য পাওয়ার জন্য সামাজিক, পেশাগত বা আইনি চাপের মধ্যে পড়তে না হয়।
আর ভিউজ বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের কাছে আমাদের প্রশ্ন—পাওনা আদায়ের জন্য পুলক, বিভুর মতো কোনো সাংবাদিকের করুণ পরিণতির অপেক্ষা করতে হবে, নাকি তার আগেই সংশ্লিষ্টদের পাওনা পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে?
আমরা দ্বিতীয়টিই দেখতে চাই।

লেখক : সাংবাদিক