নোটিশ, জরিমানা, সতর্কতা—তারপরও চালু রিসোর্ট

পর্যটন নিরাপত্তায় প্রশাসনিক জবাবদিহি কোথায়?

Photo : AI
Photo : AI

টুপটুপ রিসোর্টে আগুনে ১০ পর্যটকের মৃত্যু; সরকারি দপ্তরের আগাম পদক্ষেপের পরও কেন বন্ধ হয়নি কার্যক্রম, অনিয়ম ও অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ তদন্তের দাবি

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ : কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ পর্যটকের মৃত্যুর ঘটনা দেশের পর্যটনশিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা, প্রশাসনিক নজরদারি ও সরকারি দপ্তরগুলোর জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন সামনে এনেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, রিসোর্টটির বিভিন্ন অনিয়ম ও ঝুঁকি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর আগেই আপত্তি ছিল। পরিবেশ অধিদপ্তর নোটিশ দিয়েছিল, জরিমানাও করেছিল। ফায়ার সার্ভিস অগ্নিঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছিল। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও স্থাপনাটি নিয়ে একাধিকবার পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। তারপরও রিসোর্টটি কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সেই প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।

এ ঘটনা শুধু একটি স্থাপনায় অগ্নিকাণ্ডের বিষয় নয়; বরং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে আইন ও বিধিবিধান বাস্তবায়নের সক্ষমতা, সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়, প্রভাবশালী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সদিচ্ছা এবং অনিয়মের অভিযোগে জবাবদিহি নিশ্চিত করার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।

পর্যটনের আসন্ন মৌসুমে দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে মানুষের ভিড় বাড়ার আগে এসব প্রশ্নের নিষ্পত্তি জরুরি। কারণ, পর্যটনশিল্পের প্রসার তখনই টেকসই হবে, যখন ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি পর্যটকদের জীবন ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে।

আগেই ছিল সরকারি দপ্তরের আপত্তি

প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগে ২০২৬ সালের এপ্রিলে টুপটুপ রিসোর্টকে বন্ধের নোটিশ দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর। নির্দেশনা অনুসরণ না করায় ১৩ মে প্রতিষ্ঠানটিকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রিসোর্টটির পরিবেশগত ছাড়পত্র, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং ভবন নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন নিয়েও অনিয়মের তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সংস্থাটির একজন পরিদর্শক ২০২৬ সালের জুনে রিসোর্টটি পরিদর্শন করেন। ১১ জুন স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জামের ঘাটতি এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা না থাকার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উঠে আসে।

কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও রিসোর্টটিকে একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, স্থাপনাটি অনুমোদনসংক্রান্ত বিধিনিষেধের মধ্যে পড়েছিল এবং এর নির্মাণ ও কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি ছিল। অর্থাৎ, বিভিন্ন দপ্তরের বক্তব্য ও নথিতে রিসোর্টটির কার্যক্রম নিয়ে একাধিক আপত্তির বিষয় উঠে এসেছে। 

এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—নোটিশ দেওয়ার পর কী হয়েছিল? জরিমানা আদায় বা সতর্কবার্তা দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি নিয়ম মেনে চলছে কি না, তা কি যাচাই করা হয়েছিল? ঝুঁকি দূর না হওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখার মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি? একটি দপ্তর অনিয়ম শনাক্ত করার পর অন্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

শুধু নোটিশ দেওয়া, জরিমানা করা কিংবা ঝুঁকির কথা জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে জননিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, ঝুঁকি দূর হয়েছে কি না এবং নিয়ম অমান্য অব্যাহত থাকলে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে—সেটিও নিশ্চিত করতে হয়।

প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে চলার অভিযোগ, তদন্তের দাবি

সরকারি দপ্তরের নজরে থাকার পরও কোনো ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম চালিয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—নিয়ম প্রয়োগে ব্যর্থতার কারণ কী? এটি কি শুধু জনবল ও তদারকির সীমাবদ্ধতা, নাকি এর পেছনে প্রভাব খাটানো, দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য কিংবা অনৈতিক সুবিধা লেনদেনের মতো বিষয় রয়েছে?

টুপটুপ রিসোর্টের ক্ষেত্রে প্রশাসনকে অনৈতিকভাবে ‘ম্যানেজ’ করে কার্যক্রম চালানোর অভিযোগ থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে প্রকাশিত নথি ও সংবাদ প্রতিবেদন থেকে এখনই কোনো কর্মকর্তা ঘুষ নিয়েছেন বা কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি অনৈতিক সুবিধা দিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে তদন্ত, নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যের ভিত্তিতে।

তদন্তে তাই শুধু আগুনের সূত্রপাত বা অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি চিহ্নিত করলেই চলবে না। কোন দপ্তর কখন নোটিশ দিয়েছে, নোটিশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, পুনঃপরিদর্শন হয়েছিল কি না, ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম চালু থাকার বিষয়ে কার কী দায়িত্ব ছিল—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা জরুরি।

একই সঙ্গে রিসোর্ট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন, কার্যক্রম চালু রাখার শর্ত এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কোনো কর্মকর্তা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি না, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কি না কিংবা অনৈতিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না, তার প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

এই তদন্তের ফল শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের দায় নির্ধারণের জন্য নয়; বরং ভবিষ্যতে অন্য কোনো পর্যটনকেন্দ্রে একই ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত হওয়ার পরও যেন কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতা না ঘটে, তা নিশ্চিত করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

পর্যটনশিল্পে নজরদারির ঘাটতি কতটা বিস্তৃত?

টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনা কক্সবাজারের পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা নিয়েও উদ্বেগ বাড়িয়েছে। প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তালিকার বরাতে মেরিন ড্রাইভ এলাকায় প্রায় ১৫০টি অবৈধ হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট ও দোকানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি সংস্থা, হোটেল ব্যবসায়ী সংগঠন ও সংশ্লিষ্টদের প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে কক্সবাজার জেলায় ৭০০-এর বেশি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম থাকার আশঙ্কার কথা প্রকাশিত হয়েছে। এসব সংখ্যা পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত সরকারি হিসাব নয়; তবে পর্যটন স্থাপনাগুলোর নিয়মিত তদারকি ও সমন্বিত তথ্যভান্ডারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। 

প্রশ্ন হলো, দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ঠিক কতটি হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে? কতটি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর? কোন কোন স্থাপনা পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নির্মাণসংক্রান্ত অনুমোদন ছাড়া চলছে? কতটি পর্যটকবাহী নৌযানের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা রয়েছে? পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত ঝরনা, পাহাড়ি পথ কিংবা অন্যান্য স্থানে দুর্ঘটনা মোকাবিলায় উদ্ধারব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত?

এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য দেশব্যাপী নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্যভান্ডার প্রয়োজন। কোনো স্থাপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ বা নোটিশ থাকলে তার বর্তমান অবস্থা কী, পুনঃপরিদর্শন হয়েছে কি না এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব তথ্যও সেখানে থাকা দরকার।

তথ্যভান্ডার ও নিয়মিত তদারকির ঘাটতি থাকলে প্রশাসনের পক্ষে ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা শনাক্ত করা, পর্যটকদের সতর্ক করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে পর্যটন ব্যবসার সম্প্রসারণ ঘটলেও নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা পিছিয়ে থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।

জনবলসংকট বাস্তবতা, কিন্তু দায় এড়ানোর সুযোগ নয়

কক্সবাজারে অগ্নিনিরাপত্তা তদারকির সীমাবদ্ধতা নিয়েও সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, পুরো জেলায় বাণিজ্যিক স্থাপনা পরিদর্শনের জন্য অনুমোদিত পরিদর্শক ছিলেন মাত্র একজন। পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় কার্যালয়ের সীমিত জনবল নিয়েও প্রতিবেদনে তথ্য এসেছে। 

জনবলসংকট এবং বিপুলসংখ্যক স্থাপনা পরিদর্শনের সীমাবদ্ধতা প্রশাসনিক দুর্বলতার ব্যাখ্যা হতে পারে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পরও কেন তার কার্যক্রম চলতে থাকল, সেই প্রশ্নের উত্তর এটি একা দিতে পারে না।

যেসব স্থাপনায় গুরুতর ঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিদর্শন, পুনঃপরিদর্শন ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। একটি দপ্তর কোনো স্থাপনাকে ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করলে সংশ্লিষ্ট অন্য দপ্তরগুলোকে অবহিত করা এবং পরবর্তী পদক্ষেপের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি।

নোটিশ জারির তারিখ, প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া নির্দেশনা, নির্দেশ পালনের সময়সীমা, পুনঃপরিদর্শনের ফল এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দেশনা অমান্য করলে কোন কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেবে, সেটিও স্পষ্ট থাকা দরকার।

এ ধরনের জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকলে জনবলসংকটের মধ্যেও উচ্চঝুঁকির স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, নোটিশের পরবর্তী পদক্ষেপের রেকর্ড না থাকলে দায়িত্ব এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কি শুধু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য?

প্রশাসনিক জবাবদিহির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, নিয়ম ভঙ্গকারী ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ভূমিকাও যাচাই করা হচ্ছে কি না।

কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম না মেনে পরিচালিত হলে তার দায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক বা পরিচালকদের। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই অনিয়ম সম্পর্কে জানার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। বিশেষ করে, কোনো স্থাপনার বিরুদ্ধে একাধিকবার নোটিশ দেওয়া হলে এবং তারপরও সেটি চালু থাকলে নোটিশ-পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের হিসাব প্রকাশ করা জরুরি।

কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠা মানেই তিনি অপরাধ করেছেন—এমন নয়। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তি থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া এবং তদন্তের ফল অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। দায়িত্বে অবহেলা, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনৈতিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রযোজ্য বিধি অনুযায়ী বিভাগীয় ও আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পর্যটন স্থাপনায় অনিয়মের ঘটনায় আগে কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না এবং সেসব ব্যবস্থার ফল কী হয়েছে। এ ধরনের তথ্য প্রকাশ্যে থাকলে বোঝা যাবে, প্রশাসনিক জবাবদিহি বাস্তবে কতটা কার্যকর। তবে এমন নজির নেই—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।

টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। সেই তদন্তে অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও নিরাপত্তার ঘাটতির পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সিদ্ধান্ত, নোটিশের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা কতটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। 

আসন্ন পর্যটন মৌসুমে সরকারের জরুরি করণীয়

পর্যটন মৌসুমে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি পদক্ষেপকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, পর্যটন স্থাপনার পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি ও প্রকাশ করতে হবে। হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, পর্যটকবাহী নৌযান এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন আকর্ষণের অনুমোদন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও ঝুঁকির অবস্থা যাচাই করে হালনাগাদ তথ্যভান্ডার গড়ে তুলতে হবে। এতে কোন স্থাপনা নিয়ম মেনে চলছে আর কোনটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা প্রয়োজন, তা চিহ্নিত করা সহজ হবে।

দ্বিতীয়ত, উচ্চঝুঁকির স্থাপনায় জরুরি পরিদর্শন চালাতে হবে। অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, জরুরি বহির্গমনপথ, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা, উদ্ধারব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন আছে কি না, তা পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই যাচাই করতে হবে। গুরুতর ঝুঁকি পাওয়া গেলে আইন ও বিধি অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, নোটিশের পরবর্তী পদক্ষেপ বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানকে নোটিশ দেওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুনঃপরিদর্শন এবং নির্দেশনা পালনের অগ্রগতি যাচাই করতে হবে। ঝুঁকি দূর না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা কী নেওয়া হয়েছে, তার লিখিত রেকর্ড রাখতে হবে।

চতুর্থত, দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পরিবেশগত ছাড়পত্র, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, অগ্নিনিরাপত্তা এবং ব্যবসা পরিচালনার অনুমোদন—এসব বিষয় আলাদা দপ্তরের দায়িত্বে থাকলেও একটি স্থাপনার সামগ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের তথ্য বিনিময় ও যৌথ তদারকি প্রয়োজন।

পঞ্চমত, অনৈতিক লেনদেন ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ তদন্ত করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙেও কার্যক্রম চালিয়ে গেলে শুধু প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে নয়, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভূমিকা সম্পর্কেও তথ্যভিত্তিক তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে এবং তদন্তের ফল প্রকাশ করতে হবে।

ষষ্ঠত, পর্যটকদের জন্য অভিযোগ ও তথ্যপ্রাপ্তির ব্যবস্থা সহজ করতে হবে। নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগ জানানোর হটলাইন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যোগাযোগের তথ্য এবং অনুমোদিত স্থাপনা সম্পর্কে যাচাইযোগ্য তথ্য সহজলভ্য করতে হবে। এতে পর্যটকেরা ভ্রমণের আগে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং ঝুঁকির তথ্য প্রশাসনের কাছে দ্রুত পৌঁছাবে।

পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে

পর্যটনশিল্প শুধু নতুন হোটেল, রিসোর্ট বা বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলার মাধ্যমে টেকসই হয় না। পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, ব্যবসায়িক নিয়মের সমান প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতার ওপরও এ শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠান নিয়ম ভেঙেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারলে নিয়ম মেনে বিনিয়োগ করা উদ্যোক্তারা অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে থাকেন পর্যটকেরা।

টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু পর্যটন ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব নির্ধারণ ও সংস্কারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। তদন্তে যদি দেখা যায়, আগাম সতর্কতা ও নোটিশের পরও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি, তবে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কার কী দায়িত্ব ছিল এবং কোথায় ব্যর্থতা ঘটেছে—তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন। আর অনৈতিক লেনদেন বা ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

পর্যটনের আসন্ন মৌসুমের আগে তাই শুধু সাময়িক পরিদর্শন অভিযান নয়; প্রয়োজন কার্যকর ও ধারাবাহিক রাষ্ট্রীয় তদারকি। পর্যটন স্থাপনার হালনাগাদ তালিকা, নিয়মিত নিরাপত্তা যাচাই, আন্তদপ্তরীয় সমন্বয়, নোটিশ-পরবর্তী পদক্ষেপের স্বচ্ছ হিসাব এবং প্রমাণিত অনিয়মে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

টুপটুপ রিসোর্টের ঘটনায় প্রকৃত দায় নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা গেলে তা শুধু একটি দুর্ঘটনার তদন্তেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি জোরদার করার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যটনশিল্পের প্রতি সরকারের সচেতন দৃষ্টি তখনই কার্যকর বলে বিবেচিত হবে, যখন পর্যটকদের নিরাপত্তা কাগজে-কলমে নয়, বাস্তব ব্যবস্থাপনায় নিশ্চিত হবে।