মুক্তমন রিপোর্টার : গাজা থেকে ইসরায়েলের দিকে উড়ানো কাইট, বেলুন ও ড্রোনের কথিত হুমকি বন্ধে হামাসকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু। তা না হলে গাজায় ‘নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা’ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে নেতানিয়াহু জানান, তিনি ও ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ গাজা থেকে ইসরায়েলের দিকে ড্রোন, বেলুন ও কাইট উড়ানোর কথিত হুমকি নিয়ে একটি ‘পরিস্থিতি মূল্যায়ন’ বৈঠক করেছেন। বৈঠকে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল আইয়াল জামির, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
নেতানিয়াহু বলেন, গাজা থেকে এসব উড়ানো অবিলম্বে বন্ধ না হলে ইসরায়েল কাইট, ড্রোন ও বেলুন উৎক্ষেপণের জন্য ব্যবহৃত এলাকাগুলো থেকে বেসামরিক লোকজনকে সরিয়ে নেবে এবং এর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা বাড়াবে।
তিনি আরও বলেন, হামাস বা গাজার অন্য কোনো পক্ষকে ইসরায়েলি জনগণের নিরাপত্তা ও বসতিগুলোর ওপর হুমকি তৈরি করতে দেওয়া হবে না।
তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ১৩ বছর বয়সী ওমর হালাওয়ার কাছে কাইট ওড়ানো আনন্দের অন্যতম শেষ অবলম্বন। খান ইউনিসের উপকূলে কাইট ওড়ানোই সংঘাতের মধ্যে তার কিছুটা স্বস্তির সময়।
ওমর বলেন, “আমরা মন ভালো করার জন্য কাইট ওড়াই। গাজায় আমাদের আনন্দ দেওয়ার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।”
নিজেই কাইট তৈরি করে ওমর। কাইটের দুই পাশে ঝালর ও লেজও তৈরি করে সে। নেতানিয়াহুর সতর্কবার্তার বিষয়টি সে জানে। তবে তার দাবি, তারা শিশু এবং কোনো অস্ত্র ব্যবহার করে না।
ওমর বলেন, “আমরা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করি না, আমরা শিশু। আমরা হামাসের সঙ্গে যুক্ত নই, আমরা বাঁচতে চাই।”
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার আগে গাজা থেকে আগুন লাগানো কাইট ও বেলুন পাঠানোর অভিযোগ করেছিল ইসরায়েল। দেশটির দাবি ছিল, এসবের কারণে আগুন ও বিভিন্ন ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে গাজার কাছে একটি কিবুতজে কয়েকটি কাইট পাওয়ার কথা জানিয়েছে ইসরায়েল। তবে সেগুলোর সঙ্গে কোনো অস্ত্র বা বিপজ্জনক উপাদান যুক্ত ছিল না বলে জানা গেছে।
নেতানিয়াহুর সর্বশেষ হুঁশিয়ারির মধ্যেই সোমবার ইসরায়েলি বিমান হামলা ও ট্যাংকের গোলায় অন্তত চারজন নিহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। নিহতদের মধ্যে চার ও ১০ বছর বয়সী দুই শিশুও রয়েছে। বুরেইজ ও শাতি শরণার্থী শিবির, খান ইউনিস এবং দেইর আল-বালাহর একটি তাঁবুতে এসব হামলা হয়।
ইসরায়েলের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত এবং ২৫১ জন জিম্মি হন বলে ইসরায়েলি হিসাব। এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭৩ হাজার ৪২২ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৮৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
হামাস এক বিবৃতিতে শিশুদের কাইট ওড়ানো নিয়ে নেতানিয়াহুর বক্তব্যকে গাজায় হামলা অব্যাহত রাখার পূর্বপরিকল্পিত ইঙ্গিত হিসেবে অভিহিত করেছে। সংগঠনটি সাম্প্রতিক ইসরায়েলি হামলাকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ‘আরও একটি বড় ধরনের আগ্রাসন’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞার অভিযোগ তুলেছে।
হামাস যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন ও মধ্যস্থতাকারীদের ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানো এবং গাজায় প্রকৃত যুদ্ধবিরতির পথে থাকা রোডম্যাপ বাস্তবায়নে ইসরায়েলকে বাধ্য করার আহ্বান জানিয়েছে।
এদিকে, নেতানিয়াহুর হুঁশিয়ারির পর কাইট ওড়ানো নিয়েও ভয় তৈরি হয়েছে ওমরের মনে। তার আশঙ্কা, তাকে লক্ষ্য করে কোনো হামলা হলে আশপাশের মানুষও নিহত হতে পারেন।
ওমর বলেন, “আমি মরতে চাই না। এখানে কোনো নিরাপত্তা নেই।”
তার মা ৩৮ বছর বয়সী ইয়াসমিন হালাওয়া জানান, যুদ্ধের কারণে তার ছেলে স্কুল, ফুটবল খেলা ও সাঁতার—সবই হারিয়েছে। এরপর নিজের হাতে কাইট বানিয়ে সেটিকেই আনন্দের একটি মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে সে।
ইয়াসমিনের আশঙ্কা, নিরাপত্তার অজুহাতে ভবিষ্যতে শিশুদের আরও অনেক স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
দিন শেষে সমুদ্রতীরের পরিবর্তে তাঁবুর কাছেই কাইট ওড়াতে থাকে গাজার শিশুরা।