হার্ভার্ড অধ্যাপকের সতর্কবার্তা

এআই বিশ্বকে ‘মানুষের কারখানা’ তৈরির দিকে ঠেলে দিতে পারে!

Photo : AI
Photo : AI

অনলাইন ডেস্ক : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিস্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক জিল লেপোর। তাঁর আশঙ্কা, প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কিছু ধারণা বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এআইনির্ভর একটি ব্যবস্থা মানুষের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোতে রাষ্ট্র ও নাগরিকের ভূমিকা ক্রমেই কমিয়ে দিতে পারে।

সম্প্রতি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর ‘হার্ড ফর্ক’ পডকাস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লেপোর তাঁর ‘আর্টিফিশিয়াল স্টেট’ বা কৃত্রিম রাষ্ট্রের ধারণা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছে যেখানে রাষ্ট্রের কিছু প্রচলিত কার্যক্রম ধীরে ধীরে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

লেপোরের ভাষায়, ভবিষ্যতের এই ব্যবস্থায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের সম্মতির পরিবর্তে মেশিনের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। আর এসব মেশিন ও প্রযুক্তি অবকাঠামোর মালিকানা থাকবে বড় বড় করপোরেশনের হাতে।

তবে তিনি মনে করেন, এই ‘কৃত্রিম রাষ্ট্র’ এখনো পুরোপুরি বাস্তবতা হয়ে ওঠেনি। বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যা প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে।

মানুষের বদলে প্রযুক্তিনির্ভর জীবন

লেপোরের মতে, মানুষের দৈনন্দিন জীবন ইতোমধ্যে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া থেকে শুরু করে গ্রাহকসেবা, সংবাদ, রাজনৈতিক তথ্য কিংবা নির্বাচনী সিদ্ধান্ত—বিভিন্ন ক্ষেত্রে মানুষকে সরাসরি অন্য মানুষের পরিবর্তে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বা এআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।

এতে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—মানুষের জীবনযাপনের এই ধরন নির্ধারণ করল কে?

লেপোর মনে করেন, এআই ও ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক দুর্বল করে বিচ্ছিন্নতা ও একাকিত্ব বাড়াতে পারে। তাঁর ২০২৪ সালের একটি লেখায় তিনি এই প্রবণতাকে ‘জনজীবনের কারখানাভিত্তিক উৎপাদন’ ধরনের একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন, যেখানে মানুষকে আলাদা আলাদা গোষ্ঠীতে ভাগ করা, বিচ্ছিন্ন করা এবং সামাজিক বন্ধন দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

গণতন্ত্র নিয়েও উদ্বেগ

হার্ভার্ডের এই অধ্যাপক বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা নিয়ে।

মানুষ এখন রাজনৈতিক বিষয়েও এআই চ্যাটবটের কাছে পরামর্শ চাইছে। একই সময়ে রাজনৈতিক বার্তা তৈরি, তথ্য বিশ্লেষণ, সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণেও এআই ব্যবহৃত হচ্ছে।

লেপোরের আশঙ্কা, এসব প্রযুক্তি যদি অল্প কয়েকটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের ওপর তাদের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে পারে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি খাতের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এআইয়ের বিস্তারকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যেন এটি ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। তাঁর মতে, এই ধারণা একটি ‘ভুল ভিত্তি’। প্রযুক্তির অগ্রগতিকে অনিবার্য ধরে নেওয়ার পরিবর্তে এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে মানুষের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত।

‘নিয়ন্ত্রণ উদ্ভাবন থামিয়ে দেয়’—এই যুক্তির সমালোচনা

এআই নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি খাতের বহুল ব্যবহৃত যুক্তিগুলোরও সমালোচনা করেছেন লেপোর। তাঁর মতে, অতীতে ব্যক্তিগত কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়েও বলা হয়েছিল—নতুন প্রযুক্তি স্বাভাবিকভাবেই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে এবং মানুষের জীবন উন্নত করবে।

কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতায় এসব প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর তথ্য, নজরদারি, সামাজিক বিভাজন ও মানুষের ব্যক্তিগত তথ্যের ওপর করপোরেট নিয়ন্ত্রণের মতো সমস্যাও দেখা দিয়েছে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের আশাবাদী ধারণার ওপর নির্ভর না করে সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

সামনে যে প্রশ্ন

লেপোরের সতর্কবার্তার মূল বিষয় এআই নিজে নয়; বরং এআই কে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সেই নিয়ন্ত্রণের ওপর মানুষের কতটা গণতান্ত্রিক কর্তৃত্ব থাকবে—এটাই বড় প্রশ্ন।

এআই যদি মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সহায়ক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে এর সুফল ব্যাপক হতে পারে। কিন্তু মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তি যদি ক্রমশ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র হয়ে ওঠে এবং সেই প্রযুক্তি অল্প কয়েকটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তাহলে নাগরিক স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।

লেপোরের আসন্ন বই The Rise and Fall of the Artificial State-এ এসব বিষয় আরও বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয়েছে।