প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সাফল্যের দাবি

তারেক রহমান সরকারের ৬ মাস: কী পেল বাংলাদেশ, কোন চ্যালেঞ্জ সামনে?

তারেক রহমান সরকারের ৬ মাস: কী পেল বাংলাদেশ, কোন চ্যালেঞ্জ সামনে?

মীম মাহমুদ : ক্ষমতায় যাওয়ার ছয় মাস পূর্ণ করেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে বলে দাবি করছে বিএনপি। তবে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক নিয়োগ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।

গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকার প্রথম ছয় মাসের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিক বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা করে।

যেসব ক্ষেত্রে সাফল্যের দাবি

সরকারের পক্ষ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, কৃষক সহায়তা, খাল খনন, বৃক্ষরোপণ এবং কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগকে প্রথম ছয় মাসের উল্লেখযোগ্য অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

সরকারের দাবি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও হেলথ কার্ড চালুর মাধ্যমে সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের ফলে ১৪ লাখের বেশি কৃষক ঋণমুক্ত হয়েছেন।

এ ছাড়া খাদ্যশস্যের মজুত বাড়ানো এবং প্রতি মাসে ৬৭ লাখের বেশি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারকে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা দরে চাল দেওয়ার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দেশব্যাপী খাল খনন, বৃক্ষরোপণ, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকদের ঋণ বিতরণ এবং স্টার্টআপের জন্য তহবিল গঠনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। কৃষি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, সবুজ শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন প্রকল্প চালুর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও কিছু উদ্যোগের কথা জানিয়েছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডিজিটাল ক্লাসরুম স্থাপন, ‘এক শিক্ষক, এক ট্যাব’ উদ্যোগ, নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া এবং স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ।

মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট বড় চ্যালেঞ্জ

তবে সরকারের অর্জনের পাশাপাশি প্রথম ছয় মাসে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এর মধ্যে অন্যতম মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট।

জ্বালানি সংকটের কারণে বিভিন্ন সময়ে তেল সংগ্রহে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনেও।

অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর চাপ তৈরি করেছে। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকার পুরোপুরি সফল হতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা নিয়েও উদ্বেগ

চুরি, হত্যা, চাঁদাবাজি ও বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলেও এই ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় সরকার সংস্থায় রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ নিয়েও সমালোচনা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন

‘জবান’-এর সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, ছয় মাসে প্রত্যাশিত মাত্রায় সাফল্য না এলেও দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

তার মতে, সরকারের ভুল স্বীকার করা এবং জনগণের কাছে যাওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

অন্যদিকে দৈনিক নয়া দিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর মনে করেন, বিএনপিকে এখন জনগণের প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে মানুষের নিরাপত্তা ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বিএনপির দাবি, অধিকাংশ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত

গত ১৪ আগস্ট বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী দাবি করেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের লক্ষ্য অনুযায়ী কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ এবং কোথাও ১০০ শতাংশ পর্যন্ত কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশের কথাও জানানো হয়েছে।

তবে বিরোধী দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বলেছে, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ডের মিল নেই।

সব মিলিয়ে তারেক রহমান সরকারের প্রথম ছয় মাসে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি সহায়তা ও অবকাঠামোগত উদ্যোগের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় পরীক্ষা হিসেবে সামনে এসেছে। এখন সরকারের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ হবে ঘোষিত উদ্যোগগুলোকে টেকসই ফলাফলে রূপ দেওয়া এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী জীবনযাত্রার চাপ কমানো।