মুক্তমন রিপোর্টার : নিজস্ব প্রযুক্তিতে নির্মাণাধীন বিমানবাহী রণতরি ‘মুগেম’ আগামী বছর প্রথমবারের মতো সমুদ্রে নামাতে যাচ্ছে তুরস্ক। দেশটির নৌবাহিনীর কমান্ডার অ্যাডমিরাল এরজুমেন্ট তাতলিওগ্লুর ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রণতরীটির সাগরযাত্রা শুরু করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) তুরস্কের কোকায়েলি প্রদেশের গলচুক নৌঘাঁটিতে আয়োজিত ‘টেকনোফেস্ট ব্লু হোমল্যান্ড’ অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানান তিনি।
তাতলিওগ্লু বলেন, ‘মুগেম’ নির্মাণের কাজ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগিয়ে চলছে। এটি শুধু প্রচলিত যুদ্ধবিমান পরিচালনার প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহৃত হবে না। একই সঙ্গে মানববিহীন আকাশযান, নৌযান এবং পানির নিচে চলাচলকারী মানববিহীন যান পরিচালনার সক্ষমতাও থাকবে এতে।
তুরস্কের নৌবাহিনী প্রধানের দাবি, এ ধরনের সমন্বিত সক্ষমতাসম্পন্ন বিমানবাহী রণতরি পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চায় তুরস্ক।
তাতলিওগ্লু জানান, ‘মুগেম’-এ সর্বোচ্চ ৫২টি ‘কিজিলেলমা’ মানববিহীন যুদ্ধবিমান রাখার সক্ষমতা থাকবে। রণতরীটি সমুদ্রে নামার পর কিজিলেলমাসহ অন্যান্য দেশীয় প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করে এর কার্যক্রমের প্রস্তুতি শুরু করা হবে।
তুরস্ক বর্তমানে সামরিক ক্ষেত্রে মানববিহীন প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। দেশটির নৌবাহিনীর কাছে পাঁচ ধরনের মানববিহীন পৃষ্ঠযান, দুই ধরনের আত্মঘাতী মানববিহীন নৌযান এবং তিন ধরনের মানববিহীন ডুবোযান রয়েছে বলে জানিয়েছেন নৌবাহিনী প্রধান।
তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তিমন্ত্রী মেহমেত ফাতিহ কাচির জানিয়েছেন, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ দেশটির জাতীয় বিমানবাহী রণতরি সমুদ্রে নামানোর লক্ষ্য রয়েছে।
তার ভাষায়, তুরস্কের নৌ সক্ষমতা এখন শুধু উপকূলীয় জলসীমা সুরক্ষায় সীমাবদ্ধ নেই। দেশটি নিজেদের নৌ শক্তিকে আন্তমহাদেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চায়।
এ সময় তিনি তুরস্কের আরও কয়েকটি দেশীয় নৌ প্রকল্পের কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে টিএফ-২০০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ডেস্ট্রয়ার, টিসিজি আনাদোলু, আদা শ্রেণির করভেট, টিসিজি ইস্তাম্বুল ফ্রিগেট এবং রেইস শ্রেণির সাবমেরিন।
এ ছাড়া আত্মাকা জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, আকিয়া ভারী টর্পেডো এবং মালামান স্মার্ট নৌমাইনের মতো দেশীয় অস্ত্র ব্যবস্থাও তুরস্কের নৌ সক্ষমতা বাড়াচ্ছে বলে জানান তিনি।
আগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘মুগেম’-এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৫ মিটার, সর্বোচ্চ প্রস্থ ৭২ মিটার এবং ড্রাফট ১০ দশমিক ১ মিটার। এর ওজন প্রায় ৬০ হাজার টন হতে পারে।
রণতরীটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৬ নটের বেশি এবং ক্রুজিং গতি ১৪ নট। এই গতিতে প্রায় ১০ হাজার নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত চলতে সক্ষম হবে জাহাজটি। এতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনের থাকার ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘মুগেম’-এ চার ধরনের দেশীয় আকাশযান ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো হলো হুরজেটের নৌ সংস্করণ, কিজিলেলমা মানববিহীন যুদ্ধবিমান, আনকা-৩ উড়ন্ত ডানা নকশার মানববিহীন যুদ্ধবিমান এবং টিবি-৩ মানববিহীন যুদ্ধবিমান।
রণতরীটিতে স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন ও অবতরণ ব্যবস্থা বা এসটিওবিএআর প্রযুক্তি থাকবে। সামনের দিকে ১২ ডিগ্রি কোণে থাকা ‘স্কি-জাম্প’ র্যাম্প বিমান উড্ডয়নে সহায়তা করবে।
আকারের দিক থেকে ‘মুগেম’ যুক্তরাষ্ট্রের জেরাল্ড আর. ফোর্ড শ্রেণির রণতরির চেয়ে ছোট। ফোর্ড শ্রেণির রণতরির দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৩৭ মিটার এবং ওজন প্রায় ১ লাখ টন। যুক্তরাজ্যের কুইন এলিজাবেথ শ্রেণির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৯৪ মিটার এবং ওজন প্রায় ৮০ হাজার টন। অন্যদিকে ফ্রান্সের শার্ল দ্য গল রণতরির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬১ মিটার এবং ওজন প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ টন।
তবে ‘মুগেম’-এর মূল বিশেষত্ব প্রচলিত যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানববিহীন আকাশযান, নৌযান ও ডুবোযান পরিচালনার সক্ষমতা। ড্রোননির্ভর নৌ যুদ্ধক্ষমতার নতুন মডেল তৈরি করাই তুরস্কের এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।