গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে ইসরায়েলি মন্ত্রীদের চাপ

পশ্চিম জেরুজালেমে সফরকালে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির
পশ্চিম জেরুজালেমে সফরকালে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির

মুক্তমন রিপোর্টার : গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ব্যাপকভাবে উচ্ছেদের পক্ষে গত সপ্তাহে আরও জোরালোভাবে অবস্থান নিয়েছেন ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থি কয়েকজন মন্ত্রী। একই সময়ে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে বাস্তুচ্যুতি, ঘরবাড়ি ধ্বংস এবং প্রাণহানি অব্যাহত রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ বুধবার এক সম্মেলনে বলেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়াই ‘একমাত্র সমাধান’। এ কাজ ‘সমুদ্রপথে, আকাশপথে এবং সম্ভাব্য সব উপায়ে’ করা হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

কাটজ দাবি করেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ধারণার সমর্থন বাতিল করেননি, বরং তা ‘স্থগিত’ রেখেছেন।

এরপর ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির গাজায় বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সাত বছরের একটি পরিকল্পনা প্রকাশ করেন। ‘ডিসএনগেজমেন্ট ৭১০’ নামের ওই পরিকল্পনাকে তিনি ‘স্বেচ্ছায় অভিবাসন’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

বেন-গভির আরও বলেন, তিনি পুনর্নির্বাচিত হলে ফিলিস্তিনিদের বহিষ্কারের জন্য একটি অভিবাসন মন্ত্রণালয় গঠন করবেন।

তবে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, গাজার জনগণকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত, বহিষ্কার বা বাধ্যতামূলকভাবে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা বা প্রস্তাব তারা সমর্থন করে না। তবে কাটজ বা বেন-গভিরের বক্তব্যের সরাসরি নিন্দা করেনি ওয়াশিংটন।

ইসরায়েলি হামলা ও অভিযান অব্যাহত থাকায় গাজায় মৃতের সংখ্যাও বাড়ছে। মঙ্গলবার গাজা সিটির আমেরিকান হাসপাতালে কাছে ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীর অভিযানে অন্তত চার ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে দুই শিশু ও এক নারী ছিলেন। অভিযানে ইসরায়েল মুইন আল-আরাবিদকে আটক করে, যাকে হামাসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে বর্ণনা করেছে ইসরায়েল।

বুধবার জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় এক শিশু নিহত হয়। একই দিনে খান ইউনিসে একটি তাঁবুতে হামলায় আরও একজন নিহত হন।

বৃহস্পতিবার ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে বেইত লাহিয়ার কাছে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরসহ দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। ইসরায়েলের দাবি, তারা ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। একই দিনে গাজা সিটির রেমাল এলাকায় একটি গির্জা চত্বরে কাছে ড্রোন হামলায় একজন নিহত হন।

রোববার গাজা সিটিতে একটি স্কুলের কাছে ইসরায়েলি হামলায় কয়েকজন আহত হন। একই দিন গাজা সিটির হামিদ মোড়ের কাছে একটি গাড়িতে ড্রোন হামলায় ইউসুফ আকিলা ও তার ছোট মেয়ে ওয়াফা নিহত হন।

সোমবার ভোরের আগে দেইর এল-বালাহর একটি স্কুলে গোলাবর্ষণে আরও অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৩ বছর বয়সী সাদি ঘালিয়াও ছিল। ওই স্কুলে বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজার ৬৫৮ জন নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬২২ জন আহত হয়েছেন। সোমবার আরও ১৬০ জনের মৃত্যুর তথ্য যুক্ত হওয়ার পর এ সংখ্যা হালনাগাদ করা হয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরের ইসরায়েল-হামাস ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণার পরও ১ হাজার ৩৪০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন।

গাজায় চলমান প্রাণহানির পাশাপাশি ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধারের কাজও ধীরগতিতে চলছে। রোববার উত্তর গাজার পরিবারগুলো গাজা সিটির জেইতুন এলাকা থেকে উদ্ধার করা প্রায় ১০০ জনের মরদেহের দাফন সম্পন্ন করে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ জন শিশু ছিলেন।

গাজা সিভিল ডিফেন্সের প্রধান রায়েদ আল-দাহশান বলেন, প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি পাওয়া গেলে ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা আরও প্রায় ৮ হাজার মরদেহ ৯০ দিনের মধ্যে উদ্ধার করা সম্ভব। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম না থাকলে এই কাজ কয়েক বছর ধরে চলতে পারে। গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও ১০ হাজার থেকে ১৪ হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এদিকে পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা না পৌঁছানোয় গাজার মানবিক পরিস্থিতির আরও অবনতি হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে গাজায় পানিদূষণ প্রায় তিন গুণ বেড়েছে। ফিলিস্তিনি পানি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গাজার পাঁচটি বর্জ্যপানি শোধনাগারই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৫৫ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশন গাজার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। মাসাফের ইয়াত্তার খিরবেত আল-তাব্বান এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী সব ১২টি বাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এতে ৩০ শিশুসহ প্রায় ৭০ মানুষ গৃহহীন হয়েছেন।

এলাকার পরিষদপ্রধান নিদাল ইউনিস বলেন, এভাবে পুরো গ্রামটিকেই ‘পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলা হচ্ছে’। তবে বাসিন্দারা আবার ঘরবাড়ি নির্মাণের প্রত্যয় জানিয়েছেন।

হেবরনের কাছে বেইত উম্মারে ইসরায়েলি বাহিনী চারটি পানির কূপ ও কয়েকটি গ্রিনহাউস ধ্বংস করেছে। এতে প্রায় ৬০ হাজার ডলারের ক্ষতি হয়েছে। বেথলেহেম গভর্নরেটের নাহালিনেও একটি বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

জেনিনের আশপাশে আরাবা-ইয়াবাদ ও জেনিন-নাবলুস সড়কের পাশে শত শত কৃষকের গাছ কেটে ফেলার কাজও অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে রামাল্লার উত্তর-পূর্বে আল-মুগাইয়ির গ্রামে গত সপ্তাহে সহিংসতা আরও বেড়ে যায়। ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনারা বুধবার রাতে সেখানে অভিযান চালায়। বাসিন্দাদের কাছ থেকে গবাদিপশু চুরির অভিযোগ ওঠার পর ওই অভিযান চালানো হয়।

বাসিন্দারা বসতি স্থাপনকারীদের ভেড়া নিয়ে যাওয়া ঠেকানোর চেষ্টা করলে ছাদ থেকে স্নাইপাররা গুলি চালায়। এতে ১৬ বছর বয়সী খলিল আবু আলিয়া ও ১৯ বছর বয়সী মোহাম্মদ নাসান নিহত হন।

পরবর্তী দিনগুলোতে শোকাহতদের মারধর ও মরিচের গুঁড়া স্প্রে করা হয় এবং তাদের একটি গাড়ি চুরি করা হয়। একটি অ্যাম্বুলেন্সেও হামলা চালানো হয়।

রোববার রাতে ফিলিস্তিনি বার্তা সংস্থা ওয়াফা জানায়, পশ্চিম তীরের কালকিলিয়া গভর্নরেটের পূর্বে হাজ্জা গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ২০ বছর বয়সী ওমর তুবাসি নিহত এবং আরও তিনজন আহত হয়েছেন।