রনজিৎ সরকার রাজ : দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ঘোষিত বালুমহাল না থাকায় তীব্র বালু সংকট দেখা দিয়েছে। এতে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বেসরকারি নির্মাণকাজেও স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। দূরবর্তী এলাকা থেকে বেশি ভাড়ায় বালু আনতে হওয়ায় নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাজের গতিও কমে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বীরগঞ্জের আত্রাই নদীর শতগ্রাম এলাকার বলদিয়াপাড়া ও সুজালপুরের মাকড়াই বালুমহাল বা বালুঘাট ইজারা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকেই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। আগে নদী খনন থেকে উত্তোলিত বালু সহজলভ্য থাকলেও পরবর্তী সময়ে ইজারার মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়।
বালুমহাল বন্ধ থাকায় সরকারি মাঝারি ও বড় প্রকল্পের ঠিকাদারদের পাশাপাশি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সড়ক নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরাও সমস্যায় পড়েছেন। বীরগঞ্জ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি আব্দুল বাসেত, সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান এবং ঠিকাদার সিরাজুল ইসলাম, আব্দুর রহমান ও আলম হোসেন জানান, বালুর সংকটের কারণে চুক্তিবদ্ধ বিভিন্ন সরকারি নির্মাণকাজ সময়মতো এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ব্যবসায়ী ফরিদ হোসেন, মজিবর রহমান, সাজেদুর রহমান ও হামিদুল ইসলাম বলেন, স্থানীয়ভাবে বালু না পাওয়ায় দূরবর্তী এলাকা থেকে বেশি পরিবহন খরচ দিয়ে বালু আনতে হচ্ছে। একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন সড়ক পাকাকরণ কাজের ঠিকাদার শহিদুল ইসলাম।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বালু সংকটের কারণে সরকারি-বেসরকারি নির্মাণকাজে সমস্যা তৈরির কথা জানিয়েছেন। নিজপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউপি চেয়ারম্যান শাহীনুর রহমান চৌধুরী শাহীন, শতগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান মতিয়ার রহমান, পাল্টাপুর ইউপি চেয়ারম্যান তৌহিদুল ইসলাম, সুজালপুর ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম, শিবরামপুর ইউপি চেয়ারম্যান সত্যজিৎ রায় কার্তিক ও পলাশবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাক আহমেদ সিদ্দিকী মানিকসহ স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি এ সংকট নিরসনের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে বীরগঞ্জের কাশিপুর মৌজায় আত্রাই নদীর পশ্চিম তীর থেকে পূর্ব তীরের দক্ষিণ দিকে প্রায় এক কিলোমিটার বিস্তৃত একটি বালুচরকে সম্ভাবনাময় বালুমহাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে ওই এলাকাকে সরকারি বালুমহাল ঘোষণার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আবেদনকারী পক্ষের দাবি, প্রস্তাবিত বালুমহালের যৌথ সীমানা নির্ধারণের কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। বালুমহাল সৃজন এবং মধ্যবর্তী সময়ে ইজারা দেওয়ার বিষয়ে হাইকোর্টে ১৪৬৮৯/২০২৫ নম্বর রিটও চলমান রয়েছে। এর আগে কাশিপুর এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগে প্রশাসনের অভিযান ও মামলা হওয়ার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
বালুমহাল ঘোষণার ক্ষেত্রে পরিবেশ, নদীর গতিপথ, ভূমিক্ষয়, সরকারি স্থাপনা ও জনস্বার্থের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়গুলো যাচাই করে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের বিধান রয়েছে।
বালু সংকট নিরসনে গত ৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় দিনাজপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে প্রস্তাবিত কাশিপুর বালুচরকে দ্রুত বালুমহাল ঘোষণার আবেদন করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটারও আবেদনের সঙ্গে দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জানে আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনি আবেদন ও ডিও লেটার পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত সুরাহার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দিনাজপুর-১ (বীরগঞ্জ-কাহারোল) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মনজুরুল ইসলাম মঞ্জুও এলাকায় বালু সংকট ও উন্নয়নকাজে এর প্রভাবের কথা জানার কথা উল্লেখ করেছেন। জনস্বার্থে প্রস্তাবিত কাশিপুর বালুচরকে বালুমহাল ঘোষণার কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ে আবেদনকারীকে ইজারা দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে জেলা প্রশাসককে ডিও লেটার দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় যাচাই শেষে প্রস্তাবিত কাশিপুর বালুমহাল চালু হলে স্থানীয়ভাবে বালুর সংকট কিছুটা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দিনাজপুর প্রতিনিধি
Muktomon/TA