খেলাপি ঋণের অঙ্ক আছে, নামও আছে—তবু প্রকাশ্যে আসে না কেন?

Photo : AI
Photo : AI

আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ : এক বাজেটে ব্যাংক খাতে ৭৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। একই বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

অন্যদিকে গত ২৩ বছরে ব্যাংক থেকে অবলোপন করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকার অবলোপিত ঋণের বিপরীতে ফেরত এসেছে ১৮ টাকার কিছু বেশি।

আর অর্থঋণ আদালতে ২২ বছরে মামলায় উঠেছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা—প্রতি ১০০ টাকার দাবির বিপরীতে দুই টাকারও কম।

খরচের চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ে ব্যাংক ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর, আর দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রীয় অর্থ ঢালতে হয়। কিন্তু যাদের ঋণের কারণে এই বিশাল অঙ্কের দায় তৈরি হয়েছে, তাদের পরিচয় কি রাষ্ট্র জানে না? উত্তর হচ্ছে- জানে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রহীতাদের তথ্য রয়েছে। প্রতি তিন মাসে খেলাপি ঋণের তথ্য হালনাগাদ হয়। ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ কাকে বলা হবে, তার আইন আছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে ঋণগ্রহীতার বক্তব্য শোনার বিধানও আছে। সংসদও ইতোমধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেছে।

তারপরও পুরো তালিকা—নাম এবং নামের পাশে বকেয়া টাকার অঙ্ক—একসঙ্গে প্রকাশিত হয়নি। এখানেই প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সংসদ নাম প্রকাশ করেছে, অঙ্ক নয়

গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেন।

কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ লিখিত প্রশ্নে জানতে চেয়েছিলেন দেশে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ কত, শীর্ষ খেলাপিরা কারা, তাদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে সরকার কী করছে এবং সংসদ সদস্যদের নিজেদের ঋণের অবস্থা কী।

অর্থমন্ত্রী লিখিত জবাবে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা দেন।

তালিকার প্রথম চারটি প্রতিষ্ঠানের নামেই রয়েছে এস আলমের সংশ্লিষ্টতা। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের হিসাবে শীর্ষ ২০-এর মধ্যে গ্রুপটির প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১১টি।

তালিকায় বেক্সিমকো, সিকদার গ্রুপের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, দেশবন্ধু সুগার মিলস, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোরশেদ খানের সিটিসেল এবং কেয়া কসমেটিকসের নামও রয়েছে।

কিন্তু অর্থমন্ত্রীর লিখিত জবাবে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পাশে বকেয়া ঋণের অঙ্ক দেওয়া হয়নি।

পরদিন ডেইলি স্টার বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করে তালিকার একটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের অঙ্ক বের করে। এস আলম সুপার এডিবল অয়েলের মোট ঋণ প্রায় ১৪ হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা, যার মধ্যে খেলাপি ঋণ প্রায় ৩ হাজার ২৬০ কোটি টাকা।

বাকি ১৯টি প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের অঙ্ক একইভাবে জনসমক্ষে আনা সম্ভব হয়নি। অর্থাৎ সংসদে নাম এসেছে, কিন্তু নামের পাশে টাকার অঙ্ক নেই।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অঙ্ক আছে, নাম নেই

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি তিন মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের হিসাব প্রকাশ করে। সর্বশেষ হিসাব প্রকাশিত হয়েছে ২ সেপ্টেম্বর। জুন শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৩৩ শতাংশ এখন খেলাপি।

বছরের প্রথম ছয় মাসেই খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। কোন ব্যাংকে কত খেলাপি ঋণ, কোন খাতে কত ঋণ খেলাপি হয়েছে—এসব তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট ঋণগ্রহীতার নাম সাধারণভাবে সেই প্রকাশিত হিসাবের সঙ্গে থাকে না।

ফলে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংসদ নাম প্রকাশ করে, কিন্তু অঙ্ক প্রকাশ করে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক অঙ্ক প্রকাশ করে, কিন্তু নাম প্রকাশ করে না। অথচ দুই ধরনের তথ্যের উৎস একই ব্যাংকিং ব্যবস্থার তথ্যভান্ডার। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—নাম ও অঙ্ক এক জায়গায় এনে পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে বাধা কোথায়?

ছয় লাখ কোটি টাকা মানেই রাষ্ট্রের ক্ষতি নয়

খেলাপি ঋণের পরিমাণ নিয়ে আলোচনায় একটি প্রচলিত ভুল হিসাবও পরিষ্কার করা জরুরি। ব্যাংক খাতের ৬ লাখ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ সরাসরি রাষ্ট্রের টাকা নয়। মূলত এটি আমানতকারীদের অর্থ, যা ব্যাংক ঋণ হিসেবে বিতরণ করেছিল কিন্তু সময়মতো ফেরত পায়নি।

তাই এই অর্থ দিয়ে কতগুলো হাসপাতাল, স্কুল বা সেতু নির্মাণ করা যেত—এ ধরনের সরাসরি তুলনা অর্থনৈতিকভাবে যথাযথ নয়।

এ সংখ্যাটিও সরাসরি ব্যাংকের প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নয়। খেলাপি ঋণের ওপর সুদ হিসাব হতে থাকায় সময়ের সঙ্গে বকেয়া অঙ্ক বাড়তে পারে। আবার কিছু ঋণের বিপরীতে জমি, ভবন বা অন্যান্য সম্পদ বন্ধক থাকতে পারে। অর্থাৎ ৬ লাখ কোটি টাকা মূলত বকেয়া ঋণের হিসাব; সরাসরি নিট ক্ষতির হিসাব নয়।

করদাতার টাকা কোথায় আসছে?

করদাতার অর্থ এখানে আসে অন্য একটি জায়গায়—দুর্বল ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে। গত ১১ জুন বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী জানান, দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনঃমূলধনীকরণে সরকার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করছে। এর বাইরে ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য আলাদা বরাদ্দ রয়েছে ৩৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। দুই অঙ্ক মিলিয়ে দাঁড়ায় ৭৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা।

একই বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতকে পুনর্গঠন ও পুনঃমূলধনীকরণের জন্য যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দের চেয়েও বেশি। এখানেই খেলাপি ঋণের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অর্থের সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়।

ঋণখেলাপি হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে বাজেট থেকে টাকা চলে যাওয়া নয়। কিন্তু বিপুল খেলাপি ঋণ ব্যাংকের মূলধন দুর্বল করে। ব্যাংককে সচল রাখতে তখন পুনঃমূলধনীকরণ প্রয়োজন হয়। আর সেই অর্থের একটি অংশ আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে।

অবলোপন: ঋণ মাফ নয়, কিন্তু হিসাবের বাইরে

ঋণ আদায়ের পথে ব্যাংকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া হলো ‘অবলোপন’। অবলোপন মানে ঋণ মাফ করে দেওয়া নয়। কোনো ঋণ দীর্ঘদিন আদায় না হলে সেটিকে ব্যাংকের মূল হিসাব থেকে সরিয়ে আলাদা হিসাবে নেওয়া হয়। ঋণগ্রহীতার দায় থাকার কথা এবং আদায়ের চেষ্টাও চলার কথা।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক যে নিয়মিত খেলাপি ঋণের হিসাব প্রকাশ করে, অবলোপন করা ঋণ সেই মূল হিসাবের মধ্যে থাকে না। ফলে ঋণটি একদিকে ব্যাংকের মূল হিসাবের বাইরে চলে যায়, অন্যদিকে সেটি আদায় না হলে ব্যাংকের মূলধনের ওপর চাপ তৈরি করে।

বাংলাদেশে অবলোপনের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৩ সালের বাংলাদেশ ব্যাংকের বিআরপিডি সার্কুলার নং-২-এর মাধ্যমে। তখন কোনো ঋণ টানা পাঁচ বছর মন্দ অবস্থায় থাকার পর অবলোপনের সুযোগ ছিল। ২০১৯ সালে সেই সময় কমিয়ে তিন বছর করা হয়।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা আরও কমিয়ে দুই বছর করা হয়। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব দিয়েছিল, দুই বছরের মন্দ ঋণ অবলোপনের আওতায় আনলে এক ধাক্কায় খেলাপি ঋণের হিসাব প্রায় ৪৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ নিয়ম পরিবর্তনের সঙ্গে প্রকাশিত খেলাপি ঋণের অঙ্ক কমে যাওয়ার প্রভাব তখনই জানা ছিল।

২০২৫ সালের অক্টোবরে নিয়ম আরও পরিবর্তিত হয়। নতুন প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, মন্দ ও ক্ষতিকর হিসেবে শ্রেণিকৃত যেসব ঋণের ভবিষ্যতে আদায়ের সম্ভাবনা কম বলে বিবেচিত হবে, সেগুলো অবলোপন করা যাবে। অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষার বদলে ঋণ আদায়ের সম্ভাবনাকে বিবেচনার কেন্দ্রে আনা হয়।

একই প্রজ্ঞাপনে ঋণগ্রহীতাকে অবলোপনের আগে লিখিতভাবে জানানোর বিধান করা হয়। প্রথমে অন্তত ৩০ কার্যদিবস আগে নোটিশ দেওয়ার কথা বলা হলেও পরবর্তী সময়ে সেই সময় কমিয়ে ১০ কার্যদিবস করা হয়।

অবলোপন বাড়ছে, আদায় কি বাড়ছে?

পরিসংখ্যান বলছে, অবলোপনের পরিমাণ দ্রুত বেড়েছে। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে, দুই বছরের নিয়ম কার্যকর হওয়ার সময় পর্যন্ত মোট অবলোপন ছিল ৬৮ হাজার ২৩ কোটি টাকা। এটি ছিল প্রায় ২১ বছরের জমা হিসাব। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে মোট অবলোপন দাঁড়ায় ১ লাখ ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২২ মাসে অবলোপন বেড়েছে ৩৪ হাজার ২১০ কোটি টাকা। ২৩ বছরে যত ঋণ অবলোপন করা হয়েছে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই হয়েছে নিয়ম শিথিলের পরের ২২ মাসে।

অন্যদিকে ১ লাখ ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। বাকি ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা এখনো অনাদায়ী।

সাম্প্রতিক অবলোপনগুলোর ক্ষেত্রে আদায়ের সময় এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি—এটি বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কিন্তু দুই দশকের পুরনো অবলোপিত ঋণের হিসাবও এই সামগ্রিক আদায় পরিস্থিতির অংশ।

প্রশ্ন হলো, অবলোপনের নিয়ম যত সহজ হয়েছে, আদায়ের ব্যবস্থা কি ততটাই কঠোর হয়েছে? উপরের পরিসংখ্যানে অন্তত তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আরেক পথ অর্থঋণ আদালত

ঋণ আদায়ের আরেকটি প্রধান পথ অর্থঋণ আদালত। অর্থঋণ আদালত আইনও ২০০৩ সালের। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত অর্থঋণ আদালতে মামলা হয়েছে ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯১টি। এসব মামলায় দাবির পরিমাণ ৩ লাখ ৪৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা।

এর মধ্যে বিচারাধীন মামলাতেই আটকে আছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট দাবির প্রতি ১০০ টাকায় আদায় হয়েছে দুই টাকারও কম।

ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক—সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বিডিবিএল ও বেসিক—ধরলে ২০২৫ সালের শেষে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৪৭ হাজার ৭১৪টি। এসব মামলায় আটকে থাকা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার ৭০৭ কোটি টাকা।

এগুলো অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য। অর্থাৎ ঋণ আদায়ের জন্য মামলা হয়েছে, কিন্তু বিপুল অর্থ বছরের পর বছর বিচারাধীন অবস্থায় পড়ে আছে।

সংসদ সদস্যদের ঋণেও মিলছে একই চিত্র

সংসদে দেওয়া অর্থমন্ত্রীর লিখিত জবাবেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। বর্তমান সংসদ সদস্য এবং তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার ১১৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩৩০ কোটি ৮ লাখ টাকা আদালতের নির্দেশনার কারণে খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়নি। অর্থাৎ মোট ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ আদালতের নির্দেশনার কারণে খেলাপি ঋণের হিসাবের বাইরে রয়েছে। এই তথ্য জানা গেছে কারণ একজন সংসদ সদস্য লিখিত প্রশ্ন করেছিলেন।

কিন্তু সারা দেশে আদালতের আদেশের কারণে কত টাকা খেলাপি ঋণের হিসাবের বাইরে রয়েছে—তার সামগ্রিক হিসাব সাধারণ মানুষের সামনে নেই। এখানেও একই সমস্যা। একটি অংশ প্রকাশিত, পুরো চিত্র অপ্রকাশিত।

নাম প্রকাশে আইনি বাধা কতটা?

ঋণখেলাপিদের নাম প্রকাশ না করার পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকিং গোপনীয়তা, ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ার মতো যুক্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ শনাক্ত ও তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে আইন ইতোমধ্যে একটি প্রক্রিয়া নির্ধারণ করেছে।

ব্যাংক-কোম্পানী আইন, ১৯৯১-এর ২৭-খ ধারায় ২০২৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে প্রত্যেক ব্যাংককে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তালিকা করে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানোর বিধান যুক্ত হয়েছে।

কাউকে চূড়ান্তভাবে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করার আগে তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণগ্রহীতাকে জানাতেও হবে।

২০২৪ সালের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের মাধ্যমে ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তের মানদণ্ড ও যাচাইয়ের পদ্ধতি নির্ধারণ করে।

২০২৫ সালের এপ্রিলে নির্দেশ দেওয়া হয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম ও পরিচয়সহ পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রতি প্রান্তিকে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোতে পাঠাতে হবে। এই ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো বাংলাদেশ ব্যাংকেরই অংশ। অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহের কাঠামো আছে, যাচাইয়ের পদ্ধতি আছে, অভিযুক্তকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আছে এবং তালিকা তৈরির ব্যবস্থাও আছে। তাহলে তথ্য প্রকাশের প্রশ্নে মূল বাধাটি কোথায়?

তালিকা আছে, প্রকাশ এখনো ‘উদ্যোগ’

এখানেই বিষয়টি সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। গত ৬ এপ্রিল অর্থমন্ত্রী সংসদে যে জবাব দিয়েছেন, সেখানে ঋণখেলাপিদের নাম প্রকাশের বিষয়টিকে ইতোমধ্যে সম্পন্ন কাজ হিসেবে নয়, বরং ‘খেলাপি ও ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা প্রকাশের উদ্যোগ’ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

অর্থাৎ তালিকা তৈরির প্রক্রিয়া রয়েছে, তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে, নাম জানা যাচ্ছে—কিন্তু পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

এদিকে একই সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করা হয়েছে। অর্থাৎ নাম প্রকাশ করা যায় কি না—এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উত্তর রাষ্ট্র নিজেই দিয়েছে। প্রশ্ন এখন অন্য জায়গায়। শুধু ২০টি নাম কেন? প্রতিটি নামের পাশে বকেয়া টাকার অঙ্ক থাকবে না কেন? আর যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে নাম ও অঙ্ক—দুই তথ্যই থাকে, তাহলে জনগণের সামনে দুটিকে একসঙ্গে আনা হচ্ছে না কেন?

ভারতের উদাহরণও সামনে আসে

ভারতে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের তালিকা নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। সেখানে নামের পাশাপাশি বকেয়া অর্থের অঙ্কও দেওয়া হয়। অর্থাৎ ব্যাংকিং গোপনীয়তা এবং ঋণখেলাপির তথ্য প্রকাশ—এই দুইয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করা সম্ভব।

বাংলাদেশেও এখন প্রশ্নটি গোপনীয়তার চেয়ে বেশি স্বচ্ছতার। কারণ কাউকে অন্যায়ভাবে ‘ইচ্ছাকৃত খেলাপি’ বলা হলে তার বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ আইনে রাখা হয়েছে। যাচাইয়ের পদ্ধতিও নির্ধারিত। তাহলে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হওয়া ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নাম ও সংশ্লিষ্ট বকেয়া ঋণের অঙ্ক প্রকাশে আর কী প্রয়োজন?

হিসাবটা শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়ায়?

চিত্রটি একসঙ্গে রাখলে হিসাবটি এমন— ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ২৩ বছরে অবলোপন করা হয়েছে ১ লাখ ২ হাজার ২২৩ কোটি টাকা। অবলোপিত ঋণ থেকে আদায় হয়েছে ১৮ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকা। অর্থঋণ আদালতে ২২ বছরে দাবি করা হয়েছে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ২৪২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৬৭৩ কোটি টাকা। বিচারাধীন মামলায় আটকে আছে ২ লাখ ৩০ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা।

দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনঃমূলধনীকরণ এবং ব্যাংক পুনর্গঠনে চলতি বাজেটে বরাদ্দ রয়েছে ৭৬ হাজার ৭০৬ কোটি টাকা। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা।

এই বিপুল অঙ্কের অর্থের পেছনে ব্যাংক খাতের দুর্বলতা একটি বড় কারণ। আর সেই দুর্বলতার অন্যতম উৎস অনাদায়ী ঋণ। কিন্তু এই ঋণ কারা নিয়েছেন—তার পূর্ণাঙ্গ নামের তালিকা এবং প্রত্যেকের পাশে কত টাকা বকেয়া—এই দুই তথ্য একসঙ্গে জনগণের সামনে নেই।

রাষ্ট্রের কাছে তথ্য আছে, দরকার শুধু সিদ্ধান্ত

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন কোনো আইন তৈরি না করেও অনেকটা পথ এগোনো সম্ভব। ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তের আইন আছে। ঋণগ্রহীতার বক্তব্য দেওয়ার বিধান আছে। যাচাইয়ের পদ্ধতি আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে তথ্য আছে। প্রতি তিন মাসে তথ্য হালনাগাদ হয়। সংসদ ইতোমধ্যে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির নাম প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তথ্যের ঘাটতি নেই। আইনগত কাঠামোরও বড় অংশ ইতোমধ্যে তৈরি। যা প্রয়োজন, তা হলো একটি সিদ্ধান্ত—পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের সিদ্ধান্ত।

এই তালিকায় নামের সঙ্গে বকেয়া ঋণের অঙ্ক থাকলে নাগরিকরা বুঝতে পারবেন, ব্যাংক খাতের বিপুল খেলাপি ঋণের পেছনে কারা রয়েছেন, কোন প্রতিষ্ঠানের কত দায়, কত টাকা অবলোপন হয়েছে, কত টাকা আদালতে আটকে আছে এবং কতটা আদায় হয়েছে।

স্বচ্ছতা মানেই কাউকে আগেভাগে অপরাধী বানানো নয়। বরং আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে শনাক্ত হওয়া ঋণখেলাপিদের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরা।

কারণ জনগণের আমানত, ব্যাংকের মূলধন এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অর্থের সঙ্গে এই হিসাবের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।

সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে। নামও সরকারের কাছে আছে। দুই তথ্যের উৎসও অজানা নয়। শুধু নামের পাশে অঙ্ক বসিয়ে পুরো তালিকাটি প্রকাশ করা হয়নি। সুতরাং প্রশ্নটি এখন আর তথ্যের নয়। প্রশ্নটি সিদ্ধান্তের। আর সেই সিদ্ধান্ত এখনো ‘উদ্যোগ’ পর্যায়েই আটকে আছে।