এভাবে আর কোনো পুলককে গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা
পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত অনিশ্চয়তা নিয়ে আলোচনা

আহমেদ আবু জাফর : এভাবে আর কোনো পুলককে আমরা গণমাধ্যম অঙ্গন থেকে হারাতে চাই না। দেশের অরক্ষিত গণমাধ্যম, অনিশ্চিত সাংবাদিকতা এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রযন্ত্রের দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

একজন সাংবাদিক যখন আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, তখন সত্যিই অনেক কিছু বলার ভাষা হারিয়ে যায়। তবু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং একজন সাংবাদিকের এমন করুণ মৃত্যু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের ভেতরে জমে থাকা অদৃশ্য সংকটগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে।

রাষ্ট্র কি পারবে গণমাধ্যম অঙ্গনের এসব অসঙ্গতির পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে? সাংবাদিক সমাজ কি পারবে পুলক চ্যাটার্জির আত্মাহুতির পেছনে থাকা অনুভূতিগুলো উপলব্ধি করতে? তিনি যে চিরকুট রেখে গেছেন, সেখানে হয়তো তার মনের কিছু কথা উঠে এসেছে। এখন প্রয়োজন সেই কথাগুলো নিয়ে আলোচনা করা এবং সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।

বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু আমাদের এমনই এক কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি দৈনিক সমকালের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বরিশালের ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ন্যাশনাল ডেইলিজ ব্যুরো চিফ অ্যাসোসিয়েশন (এনডিবিএ)-এর স্থানীয় সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি ছিলেন সাহসী, স্পষ্টবাদী ও দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী।

শুক্রবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডে দৈনিক সমকালের বরিশাল ব্যুরো কার্যালয় থেকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে ধারণা করা হলেও এর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। ঘটনাস্থলের ছবি, মরদেহের অবস্থান এবং তার রেখে যাওয়া চিরকুটকে ঘিরে যেসব প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। কোনো ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য কিংবা প্রাথমিক ধারণার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তে নির্ধারিত হবে—এটি যেমন সত্য, তেমনি এই মৃত্যু আমাদের সামনে যে বৃহত্তর প্রশ্নগুলো রেখে গেছে, সেগুলো নিয়েও গণমাধ্যম অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের কথা বলা জরুরি।

একজন সাংবাদিকের চাকরি কি শুধু একটি পদ, একটি বেতন কিংবা একটি কর্মসংস্থান?

দীর্ঘদিন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারানো একজন পেশাজীবীর জীবনে কী ধরনের আর্থিক, সামাজিক ও মানসিক সংকট তৈরি হতে পারে, পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটি নির্মমভাবে সামনে এনেছে।

একজন সাংবাদিকের চাকরি তার পেশাগত পরিচয়ের সঙ্গে যেমন যুক্ত, তেমনি পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক মর্যাদার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে বছরের পর বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ কর্মহীন হয়ে পড়া শুধু একটি চাকরি হারানোর ঘটনা নয়; অনেক সময় এটি একজন মানুষের পুরো জীবনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

চাকরি দেওয়া বা চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক এখতিয়ার হতে পারে। কিন্তু সেই এখতিয়ারের সঙ্গে কি কোনো মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকবে না?

কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান একজন সাংবাদিককে চাকরিচ্যুত করার আগে কি একবারও ভাববে না—এই সিদ্ধান্তের পর তার পরিবার কীভাবে চলবে? সন্তানের পড়াশোনা কীভাবে হবে? বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, ঋণ কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে?

সাংবাদিকদের চাকরি হারানোর বিষয়টি যেন অনেক ক্ষেত্রেই কচুপাতার পানির মতো অনিশ্চিত। এখানে অনেক সময় মানবিকতা বা দরদের পরিবর্তে কাজ করে শুধু ব্যবস্থাপনার কঠোর সিদ্ধান্ত।

আমাদের দেশের সাংবাদিকরা সবচেয়ে অরক্ষিত যোদ্ধাদের অন্যতম। গণমাধ্যমের ভেতরে যেমন তাদের নিরাপত্তার সংকট রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাইরের নানা ঝুঁকি। অনেকটা উভয় সংকটে থাকা একটি পেশা।

দেশের গণমাধ্যমের বড় একটি অংশের সংবাদ সংগ্রহ হয় মফস্বল থেকে। অথচ মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকদের একটি বড় অংশ সবচেয়ে বেশি আর্থিক ও পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাজ করেন।

অনেক সাংবাদিক নিয়মিত বেতন-ভাতা পান না। নেই রেশন, পেনশন বা চাকরির নিশ্চয়তা—আছে শুধু টেনশন। ওয়েজবোর্ড যেন অনেকের কাছে অধরা এক সোনার হরিণ।

একজন সাংবাদিক প্রতিদিন নিজের খরচে সংবাদ সংগ্রহে বের হন। মোবাইল বিল, ইন্টারনেট বিল, যাতায়াত খরচ—সবই তার। কখনো ইউনিয়ন পরিষদ, কখনো উপজেলা, কখনো জেলা শহর, কখনো আদালত, হাসপাতাল কিংবা দুর্গম কোনো এলাকায় ছুটতে হয় তাকে।

তার নিজের সংসার আছে। সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ আছে। চিকিৎসা, বাড়িভাড়া, খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই সাংবাদিকের আয় কোথা থেকে আসবে?

অনেক ক্ষেত্রেই মফস্বল সাংবাদিকরা নিয়মিত ন্যূনতম সম্মানী পর্যন্ত পান না। অথচ প্রত্যাশার যেন শেষ নেই—সংবাদ দাও, বিজ্ঞাপন দাও, প্রচার বাড়াও।

একজন সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য কত? তার মাসিক আয় কত? তার কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা কী? অসুস্থ হলে কী হবে? চাকরি চলে গেলে কী হবে? দীর্ঘদিন কাজ করার পর অব্যাহতি পেলে তার পাওনা কীভাবে পরিশোধ হবে?

এই প্রশ্নগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর কি আমাদের গণমাধ্যম ব্যবস্থার কাছে আছে?

পত্রিকার ব্যবসা থাকবে, সাংবাদিকের অধিকারও থাকতে হবে। গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করবে, বিনিয়োগ করবে, লাভ করবে—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাংবাদিক ও কর্মীদের অধিকার কেন অনিশ্চিত থাকবে?

কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের ব্যবসা ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। গণমাধ্যমের পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন আর্থিক সুবিধা বা ঋণ পাওয়ার বিষয়েও সমাজে নানা আলোচনা ও অভিযোগ রয়েছে। এসব বিষয়ে অবশ্যই সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কথা বলা উচিত।

তবে বিপরীত চিত্রটি আরও বেদনাদায়ক। একদিকে কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে, অন্যদিকে সেই প্রতিষ্ঠানের মাঠপর্যায়ের একজন সাংবাদিক নিজের মোবাইল বিল কিংবা যাতায়াত খরচ মেটাতে হিমশিম খান।

এই বৈপরীত্য কি আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে না?

সাংবাদিকতা কি শুধু দায়িত্ব, নাকি পেশাও?

সাংবাদিকতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ অবশ্যই জড়িত। কিন্তু সাংবাদিকতা একই সঙ্গে একটি পেশা। আর কোনো পেশাজীবীকে তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য ছাড়া দীর্ঘদিন কাজ করিয়ে নেওয়া হলে সেখানে পেশাগত ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠবেই।

আমাদের দেশে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত মানুষের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু কতজনের হাতে বৈধ নিয়োগপত্র আছে? কতজন নিয়মিত বেতন পান? কতজনের চাকরির সুনির্দিষ্ট শর্ত রয়েছে? কতজন চাকরি হারালে ন্যায্য পাওনা পান? কতজন অবসরের পর কোনো নিরাপত্তা পান?

এসব প্রশ্নের একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও সর্বজনগ্রাহ্য কাঠামো এখনই প্রয়োজন।

এজন্য প্রয়োজন একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন এবং সাংবাদিক সুরক্ষার কার্যকর জাতীয় নীতিমালা। গণমাধ্যম স্বাধীন হবে—এটি যেমন জরুরি, তেমনি গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক যেন নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ পরিবেশে কাজ করতে পারেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র সাংবাদিকের হয়ে সংবাদ লিখবে না, সম্পাদকীয় নীতিতে হস্তক্ষেপ করবে না এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করবে না। কিন্তু রাষ্ট্র এমন একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করতে পারে, যেখানে সাংবাদিকের শ্রমের মূল্য, চাকরির ন্যায্যতা, পাওনা পরিশোধ, বৈষম্যহীনতা এবং ন্যূনতম পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

একজন সাংবাদিককে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত করা হলে তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। দীর্ঘদিন কাজ করা একজন সাংবাদিক হঠাৎ চাকরি হারালে তার পাওনা, নোটিশ, ক্ষতিপূরণ বা প্রয়োজনে পুনর্বাসনের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

পাশাপাশি প্রতিটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মানবসম্পদ নীতিও শক্তিশালী হওয়া দরকার। নিয়োগপত্র, নির্ধারিত বেতন-ভাতা, ছুটি, কর্মঘণ্টা, চাকরিচ্যুতির স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ন্যায্য পাওনা, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি ও বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সংকটকালে সহায়তার ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মানসিক স্বাস্থ্যকে আর অবহেলার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না।

চাকরি হারানো, দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়া, আর্থিক সংকট, কর্মস্থলের চাপ কিংবা পেশাগত অবমূল্যায়ন একজন মানুষের ওপর গভীর মানসিক প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং ও সংকটকালীন সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত। একজন কর্মী যখন গভীর সংকটে থাকেন, তখন শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, মানবিক সহায়তার হাতও তার প্রয়োজন হতে পারে।

পুলক চ্যাটার্জির চলে যাওয়া নিয়ে আবেগ থাকবে, শোক থাকবে, সহকর্মীদের চোখে পানি থাকবে। কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে লেখা হবে। তারপর হয়তো আমরা আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে পড়ব।

কিন্তু পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে গণমাধ্যম অঙ্গনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

তার শোক আর শেষকৃত্যেই বিষয়টি শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। তার মৃত্যু আমাদের গণমাধ্যমের জন্য একটি সতর্কবার্তা।

মিডিয়ায় কাজ করা এমন হাজারো ‘পুলক’ হয়তো আজ নীরবে-নিভৃতে দগ্ধ হচ্ছেন। কেউ চাকরি হারানোর আতঙ্কে, কেউ বেতন-সম্মানীর অনিশ্চয়তায়, কেউ পারিবারিক সংকটে, কেউ পেশাগত অবমূল্যায়নে, আবার কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন।

আমরা তাদের কতজনের খবর রাখি?

প্রতিনিয়ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিকদের নানা কষ্টগাথা শুনতে হয়। কারও বেতন নেই, কারও চাকরি নেই, কাউকে ডেস্ক থেকে চাকরিচ্যুতির ভয় দেখানো হচ্ছে—সংকট যেন চারদিকে।

তৃণমূলের সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা না দিয়ে কোনো কোনো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় ডেস্কে অপ্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করে তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা থাকলে তা অবশ্যই তদন্ত ও জবাবদিহির আওতায় আসা উচিত।

একজন সাংবাদিককে শুধু সংবাদ সংগ্রহের সময় প্রয়োজন হয় না। তার প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ, ন্যায্য পারিশ্রমিক, সম্মান, চাকরির নিশ্চয়তা এবং বিপদের সময়ে সহায়তার হাত।

আমরা কি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে সাংবাদিক প্রয়োজনের সময় গুরুত্বপূর্ণ, আর প্রয়োজন শেষ হলে পরিত্যক্ত?

নাকি এমন একটি গণমাধ্যম চাই, যেখানে মালিক ও সাংবাদিকের মধ্যে পেশাগত সম্পর্কের পাশাপাশি মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতাও থাকবে?

সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার।

আমি জানি, এই লেখা অনেক গণমাধ্যমের কাছে অস্বস্তিকর মনে হতে পারে। কারও গাত্রদাহও হতে পারে। হয়তো কেউ এটি প্রকাশ করতে চাইবেন না। তবু না-বলা কথাগুলো বলা প্রয়োজন। কারণ সত্যিকার অর্থে গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করতে হলে গণমাধ্যমের ভেতরের সংকট নিয়েও কথা বলতে হবে।

তবে সবচেয়ে আগে প্রয়োজন পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা। সত্য যা-ই হোক, তা জাতির সামনে স্বচ্ছভাবে প্রকাশিত হওয়া উচিত।

একই সঙ্গে তার মৃত্যু যে প্রশ্নগুলো সামনে এনেছে, সেগুলোও জাতীয় আলোচনার বিষয় হওয়া প্রয়োজন।

কীভাবে আমাদের অরক্ষিত গণমাধ্যম অঙ্গনকে সুরক্ষিত করা যায়? কীভাবে সাংবাদিকতার কর্মপরিবেশ ও এই পেশাটিকে রক্ষা করা যায়? কীভাবে একজন সাংবাদিকের শ্রমের ন্যায্য মূল্য ও পেশাগত মর্যাদা নিশ্চিত করা যায়?

এখনই সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।

রাষ্ট্রকে নীতিমালা করতে হবে। গণমাধ্যম মালিকদের দায়িত্বশীল হতে হবে। সম্পাদকদের মানবিক হতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে শুধু প্রতিবাদ-বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সাংবাদিকদের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাবলয় গড়ে তুলতে হবে। সাংবাদিক সংগঠনের নামে শুধু স্বার্থসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; সংকটে থাকা সাংবাদিকের পাশে বাস্তব অর্থে দাঁড়াতে হবে।

কারণ আর কোনো সাংবাদিক যেন পেশাগত অনিশ্চয়তা, আর্থিক সংকট, চাকরি হারানোর ভয় কিংবা একাকিত্বের অন্ধকারে হারিয়ে না যান।

আর কোনো পুলক চ্যাটার্জিকে আমরা হারাতে চাই না।

মনে রাখা উচিত—সাংবাদিক বাঁচলে সাংবাদিকতা বাঁচবে। সাংবাদিকতা বাঁচলে গণমাধ্যম বাঁচবে। আর গণমাধ্যম বাঁচলে মানুষের কথা বলার শক্তিটুকুও বেঁচে থাকবে। গণতন্ত্রও সুরক্ষিত থাকবে।

লেখক : বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম ও সভাপতি