মুক্তমন রিপোর্ট : প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত প্রক্রিয়া এল নিনো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। এর প্রভাবে কোথাও খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে, আবার কোথাও বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ধরনে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চলমান এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং এর প্রভাব ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এল নিনোর নির্দিষ্ট স্থায়িত্ব ও বিভিন্ন অঞ্চলে এর প্রভাব আবহাওয়াবিষয়ক পূর্বাভাসের ওপর নির্ভরশীল।
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। এর ফলে বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালন, বৃষ্টিপাত ও বাতাসের স্বাভাবিক ধরনে পরিবর্তন আসতে পারে।
এল নিনোর প্রভাব বিশ্বজুড়ে এক রকম হয় না। কোনো অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়তে পারে, আবার অন্য অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। ঘূর্ণিঝড়ের ওপরও এর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্দোনেশিয়ায় শুষ্ক ও উত্তপ্ত আবহাওয়ার কারণে এ বছর দাবানলে ব্যাপক ভূমি পুড়েছে। প্রতিবেদনে জানুয়ারি থেকে ওই সময় পর্যন্ত অন্তত ৮ লাখ ৯৫ হাজার ৬৫৭ হেক্টর জমি পুড়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা বৃহত্তর লন্ডনের আয়তনের প্রায় ছয় গুণ।
দাবানলের ধোঁয়ায় দেশটির বিভিন্ন এলাকায় জনস্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সুমাত্রা ও কালিমান্তান অঞ্চলের বাসিন্দাদের বিষাক্ত ধোঁয়াশার মুখে পড়তে হয়েছে। এতে শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে দাবানলের মোট ক্ষয়ক্ষতি, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা এবং এল নিনোর সঙ্গে এসব ঘটনার সম্পর্ক নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে চলতি মৌসুমে একাধিক শক্তিশালী ঝড় তৈরি হওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হ্যারিকেন পলো ঘণ্টায় ২৮৫ কিলোমিটার বেগে বাতাস সৃষ্টি করেছিল। একই সময়ে ওদালিস ও নোলো নামে আরও দুটি হ্যারিকেনের উপস্থিতির কথাও বলা হয়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে একই সময়ে তিনটি করে হ্যারিকেন তৈরির ঘটনা দুবার ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মেসাক ও দুজিয়ানের মতো ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে পূর্ব চীন ও জাপানের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। জাপানের আবহাওয়া সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে চলতি বছরে ওই অঞ্চলে ১০টি ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় তৈরির কথা বলা হয়েছে।
এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের কিছু অংশে অনুকূল তাপীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় পরিস্থিতি ঘূর্ণিঝড়ের গতিপথ ও তীব্রতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঝড়ের সৃষ্টি বা তীব্রতার জন্য শুধু এল নিনোকেই দায়ী করা যায় না; সমুদ্রের তাপমাত্রা, বাতাসের গতিপ্রকৃতি ও অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবেদনটিতে উত্তর আটলান্টিকে ঘূর্ণিঝড় তৈরির পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে দুর্বল থাকার কথা বলা হয়েছে। এতে ইসায়াস নামে একটি হ্যারিকেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও অ্যালাবামায় আঘাত হানার উল্লেখ রয়েছে।
তবে আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের সংখ্যা ও মৌসুমের রেকর্ডসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট আবহাওয়া সংস্থার হালনাগাদ উপাত্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। এল নিনো সাধারণত আটলান্টিক অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের অনুকূল পরিবেশ কমাতে পারে, কিন্তু এর প্রভাব প্রতি মৌসুমে একই রকম হয় না।
বিবিসির প্রতিবেদনে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কম হওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এতে দেশটিতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ১৩ শতাংশ কম হওয়ার দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্য ভারতে বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্বাভাবিক থাকলেও পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টির ঘাটতি ছিল প্রায় ২৬ শতাংশ। দক্ষিণ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বৃষ্টিপাত কমার হার ছিল ২৪ শতাংশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃষ্টিপাতের এমন তারতম্য কৃষি উৎপাদনে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ার পর হঠাৎ অতিবৃষ্টির ঘটনাও ফসলের ক্ষতি ও কৃষিকাজে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
এল নিনো বৈশ্বিক আবহাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হলেও দাবানল, বন্যা, খরা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। তাই এর প্রভাব মূল্যায়নে হালনাগাদ আবহাওয়ার পূর্বাভাস, দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি পরিসংখ্যান বিবেচনা করা জরুরি।
Muktomon/TA