মুক্তমন রিপোর্ট : ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্ক ও হুড়োহুড়ির মধ্যে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে চারজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজনরা। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগুন বা পদদলিত হয়ে কেউ মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের নথিতে চারজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে তারা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় বিভিন্ন তলা থেকে অনেকে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করেন। এতে কয়েকজন আহত হন।
মৃতদের মধ্যে রয়েছেন ফুলবাড়িয়া উপজেলার বিষ্ণুরামপুর গ্রামের পল্লিচিকিৎসক শাহজাহান মনির (৪৫), একই উপজেলার বিদ্যানন্দ গ্রামের সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক রমজান আলী (৩৮), তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং পূর্বধলা উপজেলার হাজেরা বেগম (৫০)। তবে হাজেরা বেগমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শাহজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনে যক্ষ্মার চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার মেরুদণ্ডের হাড়ে যক্ষ্মা শনাক্ত হয়েছিল।
পরিবারের সদস্যদের দাবি, সোমবার সন্ধ্যায় আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে শাহজাহান মারা যান। সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে তার মৃত্যু হয়। রাতেই মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হয় এবং মঙ্গলবার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
শাহজাহানের স্ত্রী হারিসা বেগম জানান, আগুনের খবর পেয়ে তিনি, তার বোন ও স্বামী একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। কয়েক ধাপ নামার পর তারা পড়ে যান। একপর্যায়ে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। পরে জ্ঞান ফিরলে স্বামীকে পাশে দেখতে পাননি। পরে জানতে পারেন, ভিড়ের মধ্যে পড়ে গিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
শাহজাহানের মা হাওয়া খাতুন ছেলের মৃত্যুতে আহাজারি করছেন। তিনি জানান, মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগেও ছেলে ফোন করে তার জন্য দোয়া চেয়েছিলেন।
তারাকান্দার কুলসুম আক্তারও প্রায় ১২ দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তার ১২ বছর বয়সী ছেলে স্বাধীন জন্ডিসের চিকিৎসার জন্য ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। তার সঙ্গে ছিলেন ১৮ বছর বয়সী মেয়ে মিম আক্তার।
পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক কুলসুমকে মৃত ঘোষণা করেন। মঙ্গলবার সকালে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
মিম আক্তার বলেন, আগুনের খবর পেয়ে তিনি, তার মা ও ভাই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন। এ সময় ভিড়ের মধ্যে তারা পড়ে যান। তিনি উঠে ভাইকে টেনে তুলতে পারলেও মাকে তুলতে গেলে মানুষের চাপে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
মিমের অভিযোগ, দ্রুত ও যথাযথ চিকিৎসা পাওয়া গেলে তার মা হয়তো বেঁচে যেতে পারতেন।
কুলসুমের ননদ নাজমা আক্তার দাবি করেন, আগুন লাগার সময় কুলসুম হাসপাতালের ভেতরেই ছিলেন। তাই তাকে বাইরে থেকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়েছিল—কর্তৃপক্ষের এমন বক্তব্য সঠিক নয়।
রমজান আলী বুকে ব্যথা নিয়ে সোমবার সকালে ফুলবাড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখান থেকে তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দুপুরে তাকে হৃদরোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়।
হাসপাতালের নথিতে তার মৃত্যুর সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিট উল্লেখ রয়েছে। স্বজনদের দাবি, আগুন লাগার পর সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়ে গিয়ে রমজানের মৃত্যু হয়।
তার স্ত্রী খাদিজা আক্তার বলেন, আগুন লাগার পর সবাই আতঙ্কিত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করেন। তিনিও সিঁড়িতে পড়ে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানানো হলেও পরিস্থিতির কারণে তারা আটকা পড়ে ছিলেন।
রমজানের ছোট ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, তার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত ছিলেন। আগুনের পর সিঁড়িতে ধাক্কাধাক্কির মধ্যে পড়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। পরে তাকে জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়।
সাইফুলের দাবি, হাসপাতাল থেকে রাতেই রমজানের ডেথ সার্টিফিকেট ও গেট পাস দেওয়া হয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সোমবার বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের অংশ পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন।
আগুন লাগার পর বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনরা আতঙ্কে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকেন। এ সময় কয়েকজন আহত হন।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের রেজিস্টার অনুযায়ী, আগুন লাগার পর চারজনকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া রেজিস্টারের পাতার ছবির সত্যতাও নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।
তিনি জানান, একজন নার্স তাৎক্ষণিকভাবে ওই রেজিস্টারে তথ্য লিপিবদ্ধ করেন। তবে চারজন পদদলিত হয়ে মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান আরও বলেন, মৃতদের শরীরেও পদদলিত হওয়ার কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
ফলে চারজনের মৃত্যুর কারণ নিয়ে স্বজনদের দাবি ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আরও যাচাই ও তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে।
Muktomon/TA