এসপিএম প্রকল্প পরিচালনায় ৫ বছরের চুক্তি ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে

 গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্প।
গভীর সমুদ্র থেকে পাইপলাইনে জ্বালানি তেল খালাসের জন্য নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং বা এসপিএম প্রকল্প।

মুক্তমন রিপোর্ট : গভীর সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাসের লক্ষ্যে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেয়েছে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পাঁচ বছরের চুক্তি করেছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ১ হাজার ৯৪৬ কোটি টাকা।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় বিপিসির লিয়াজোঁ অফিসে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিপিসির চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতিও উপস্থিত ছিলেন। বিপিসির পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন পরিচালক (পরিকল্পনা) মুহাম্মদ আসাদুল হক।

অন্যদিকে পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টালের পক্ষে স্বাক্ষর করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ডিরেক্টর হ্যারিস আবদি সেমবিরিং মেলিয়ালা। অনুষ্ঠানে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রতিনিধি এবং বিপিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

চুক্তি অনুযায়ী, আগামী পাঁচ বছর এসপিএম স্থাপনার পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে ইন্দোনেশিয়ার প্রতিষ্ঠানটি। এর আগে গত ২৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রতিষ্ঠানটিকে এ কাজ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করে।

এসপিএম প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য বড় জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল খালাস করা। এত দিন চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তর করে উপকূলে আনতে হতো। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি ব্যয় হতো। বিশেষ করে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে তেল স্থানান্তরের পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে কয়েক দিন লেগে যেত।

প্রকল্পটি চালু হলে বড় তেলবাহী জাহাজ বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে স্থাপিত বিশেষ ভাসমান বয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে। সেখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরাসরি তেল পাঠানো হবে মহেশখালীর কালারমারছড়ায় নির্মিত ট্যাংক ফার্মে। পরে পাইপলাইনে অপরিশোধিত তেল যাবে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। পরিশোধিত ডিজেল পরিবহনের জন্যও পৃথক পাইপলাইনের ব্যবস্থা রয়েছে।

প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রে ভাসমান মুরিং স্থাপনা, পাম্পিং স্টেশন, ট্যাংক ফার্ম এবং প্রায় ২২০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়েছে। অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল পরিবহনের জন্য রয়েছে পৃথক পাইপলাইন।

বিপিসির প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রচলিত পদ্ধতিতে এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল খালাস করতে আট থেকে ১০ দিন সময় লাগে। এসপিএমের মাধ্যমে একই পরিমাণ তেল খালাস করা সম্ভব হবে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায়। আর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন ডিজেল খালাসে সময় লাগবে প্রায় ২৮ ঘণ্টা। এতে জাহাজের অপেক্ষমাণ সময় কমার পাশাপাশি লাইটারেজ জাহাজের ব্যবহার ও পরিবহন ব্যয়ও কমবে। বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বছরে প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হতে পারে।

নির্মাণ শেষ হলেও চালু হতে দেরি

চীনের অর্থায়নে বিপিসি বাস্তবায়িত এসপিএম প্রকল্পের নির্মাণকাজ করেছে চায়না পেট্রোলিয়াম পাইপলাইন ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও পরে তা বেড়ে প্রায় ৮ হাজার ২৯৮ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।

২০২৪ সালের মার্চে প্রকল্পটির নির্মাণ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শেষ হয়। তবে অবকাঠামো নির্মাণের পরও নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিচালনার জন্য অপারেটর নিয়োগ ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে দেরি হয়। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি থেকে প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া যাচ্ছিল না।

পাঁচ বছরের জন্য পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পেতে যাওয়া পিটি পারতামিনা ট্রান্স কন্টিনেন্টাল ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পারতামিনা গ্রুপের সামুদ্রিক পরিবহন ও লজিস্টিকস খাতের প্রতিষ্ঠান। জাহাজ পরিচালনা, সামুদ্রিক পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং সমুদ্রভিত্তিক অবকাঠামোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, এসপিএম চালু হলেও শুরুতেই এর পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। অপরিশোধিত তেল পরিবহনের জন্য নির্মিত পাইপলাইনের বার্ষিক সক্ষমতা প্রায় ৪৫ লাখ টন। অন্যদিকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির বর্তমান বার্ষিক পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ১৫ লাখ টন। ফলে বর্তমান সক্ষমতায় পাইপলাইনটির পুরো ব্যবহার সম্ভব নয়।

ইস্টার্ন রিফাইনারির দ্বিতীয় ইউনিট (ইআরএল-২) চালু হলে অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা আরও ৩০ লাখ টন বাড়বে। তখন এসপিএমের মাধ্যমে আমদানি করা তেল ব্যবহারের সুযোগও বাড়বে। তবে ইআরএল-২ প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে।

Muktomon/TA