প্রাথমিক শিক্ষায় শিখন ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ

হবিগঞ্জের বাহুবলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।
হবিগঞ্জের বাহুবলে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি ও প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

মুফিজুর রহমান নাহিদ : প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শুধু বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি শিশু বিদ্যালয়ে এসে কী শিখছে, তার মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি কতটা মজবুত হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে শিখনফল, পুষ্টি, শিক্ষক উন্নয়ন, কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহিতাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে সরকার।

বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) হবিগঞ্জের বাহুবলে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন এবং প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে স্থানীয় সংসদ সদস্য ড. রেজা কিবরিয়া সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে আমরা শিশুদের কাঙ্ক্ষিত ও যথাযথ শিক্ষা দিতে পারছি কি না, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, এখনো সেই লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে শিক্ষকরা চেষ্টা করছেন না বা দায়িত্ব পালনে ঘাটতি রয়েছে। কোথায় কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সম্মিলিতভাবে সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। এ সময় শিক্ষকদের নিজ নিজ বিদ্যালয়ের সমস্যা, প্রয়োজন ও উন্নয়নসংক্রান্ত প্রস্তাব সরাসরি তুলে ধরার আহ্বান জানান তিনি।

শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, প্রাথমিক পর্যায়েই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ছে। মাধ্যমিকে যাওয়ার পথে এ সংখ্যা আরও বাড়ছে। কোনো শিশু যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদ্যালয়ে তাদের ধরে রাখা এবং নিয়মিত শিখন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত রাখাও এ কর্মসূচির লক্ষ্য।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) সহযোগিতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের বয়স অনুযায়ী আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পুষ্টিমান বিবেচনায় রেখে খাবারের মান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির আওতায় বিদ্যালয়ে খাবার সংরক্ষণের জন্য স্টোরেজ সুবিধা গড়ে তোলার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

খাবারের গুণগত মান নিয়ে কোনো সমস্যা দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার জন্য নমুনা পরীক্ষাগারে পাঠানোর নির্দেশনা দেন প্রতিমন্ত্রী। এ ক্ষেত্রে গুজব বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে নয়, বরং যথাযথ পরীক্ষা ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

প্রাথমিক উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৫) অনুমোদনের কথা জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এর মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় উন্নয়নে নতুন উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে। তবে উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পেতে নির্মাণকাজের প্রতিটি পর্যায়ে যথাযথ তদারকি ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার কিংবা অনিয়মের কারণে নতুন অবকাঠামো যেন দ্রুত নষ্ট না হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

বিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ববি হাজ্জাজ বলেন, একটি বিদ্যালয়কে সুরক্ষিত ও কার্যকর রাখতে এলাকাবাসীর অংশগ্রহণ জরুরি। প্রধান শিক্ষকদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, মসজিদ ও মন্দির কমিটি এবং অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। বিদ্যালয়ের প্রতি স্থানীয় মানুষের মালিকানাবোধ তৈরি হলে অবকাঠামো রক্ষা, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করা সহজ হবে।

স্কুল ফিডিং কর্মসূচিতে মা সমিতির অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে মায়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে খাবার প্রস্তুত ও বিতরণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। প্রশিক্ষিত মায়েরা নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে ডিম সিদ্ধ, সংরক্ষণ ও বিদ্যালয়ে সরবরাহের কাজে অংশ নিতে পারেন। এতে খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের অংশগ্রহণও বাড়বে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষকদের মতামত ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাব চান তিনি।

প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ৩১ লাখ শিক্ষার্থী স্কুল ফিডিং কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। ভবিষ্যতে এ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করে ২০২৭ সালে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিক্ষার্থীকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এত বড় পরিসরে কর্মসূচি বাস্তবায়নে কার্যকর ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় অংশগ্রহণ ও যথাযথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মীর আব্দুল আউয়াল আল মেহেদী, প্রাথমিক শিক্ষার সিলেট বিভাগীয় উপপরিচালক এ.কে.এম. সাইফুল হাসান এবং বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা উজ্জ্বল রায়। এ সময় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির কান্ট্রি ডিরেক্টর জেসি উড, বাহুবল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরে প্রতিমন্ত্রী বাহুবল উপজেলার বিষ্ণুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি বিদ্যালয়ে চলমান স্কুল ফিডিং কার্যক্রম সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে খাবার বিতরণ এবং খাবারের গুণগত মান, সংরক্ষণ ও পরিবেশনব্যবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন।

Muktomon/TA