কর্ণফুলীর তীরে অনুমোদনহীন ইটভাটা নির্মাণ, বন্ধের উদ্যোগ

কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে নির্মাণাধীন ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকস ইটভাটা।
কর্ণফুলী নদীর তীরে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীতে নির্মাণাধীন ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকস ইটভাটা।

মুক্তমন রিপোর্ট : চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরখিজিরপুর এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকস নামে একটি ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, ইটভাটা নির্মাণের জন্য নদীর পাড়ের মাটিও কেটে নেওয়া হচ্ছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে ইট পোড়ানোর কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ইটভাটাটি চালু হলে এর কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে কর্ণফুলী নদীর পানি দূষিত হতে পারে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এদিকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ ইটভাটায় আগুন না দেওয়া এবং ইট পোড়াতে জ্বালানি কাঠ ও কৃষিজমির উপরিভাগের মাটি (টপসয়েল) ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে চট্টগ্রাম জেলা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ইটভাটায় লিফলেট বিতরণ করা হয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, চরখিজিরপুর এলাকায় কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকসের নির্মাণকাজ প্রায় ৯০ শতাংশ শেষ হয়েছে। দুই শতাধিক শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। চলতি মাসেই ইট পোড়ানোর কার্যক্রম শুরুর প্রস্তুতি চলছে। ইট তৈরির জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা মাটি ভাটার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া বর্জ্য ও ইটের আধলা ফেলে জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। শ্রমিকদের থাকার জন্যও নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর। ইটভাটার কাছেই রয়েছে খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী একটি প্রতিষ্ঠান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, এ ধরনের ইটভাটার কালো ধোঁয়া ও বর্জ্যে কর্ণফুলী নদী দূষিত হচ্ছে। নদীর পাড়ে ভাটার বর্জ্য, ইটের আধলা ও মাটি ফেলে জায়গা ভরাট করে দখল করা হলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে নদীর বিপরীত পাড়ে ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বনভূমি ও বসতভিটা বিলীন হতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দা সাকিব বলেন, ইটভাটাটির কোনো অনুমোদন নেই বলে তাঁরা জানেন। বিষয়টি জানিয়ে প্রশাসনকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তাঁর আশঙ্কা, ইটভাটা চালু হলে এলাকার বায়ুর মান খারাপ হওয়ার পাশাপাশি নদীর পানি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আশপাশে মাটি কাটার কারণে জমির উর্বরতাও নষ্ট হতে পারে। পাশের একটি লবণ কারখানার উৎপাদিত পণ্যের গুণগত মানেও দূষণের প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ চান তিনি।

তবে ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকসের উৎপাদন কার্যক্রম দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা জানে আলম বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ২৬ বছরের পুরোনো। মাঝে তিন বছর উৎপাদন বন্ধ ছিল। সে সময় প্রশাসন ইটভাটাটি ভেঙে দিয়েছিল। তখন চিমনির উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট, বর্তমানে তা ৫০ ফুট করা হয়েছে। নতুন করে সব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে এবং শিগগিরই ইট পোড়ানো শুরু হবে।

জানে আলম আরও বলেন, ইট পোড়াতে কয়লা ব্যবহার করা হবে, কাঠ নয়। প্রতি মাসে সাত থেকে আট লাখ ইট উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ইট ১২ টাকা দরে বিক্রি করা হবে।

জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, বোয়ালখালীর চরখিজিরপুর এলাকায় নদীর পাড়ে ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকসের কোনো অনুমোদন নেই। এটি সম্পূর্ণ অবৈধ। দ্রুত অভিযান চালিয়ে ইটভাটাটি বন্ধ করা হবে। অবৈধ ইটভাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অবস্থান জিরো টলারেন্স।

ইটভাটার অনুমোদনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিঅ্যান্ডসি ব্রিকসের স্বত্বাধিকারী শাহজাহান বলেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র নেই। তবে ছাড়পত্র বা অনুমোদন নিয়ে ইটভাটা ও এর কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।

বোয়ালখালীর ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) কানিস ফাতেমা বলেন, উপজেলায় মাত্র একটি ইটভাটার অনুমোদন রয়েছে। বাকি ইটভাটাগুলোর কোনো অনুমোদন নেই, সেগুলো অবৈধ। পরিবেশ অধিদপ্তর অভিযান পরিচালনা করতে এলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহযোগিতা করা হবে।

Muktomon/TA