বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট চরমে, শিশু বিশেষজ্ঞও নেই

চিকিৎসক সংকটে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা
চিকিৎসক সংকটে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা

মুক্তমন রিপোর্ট : বরগুনার সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। জেলার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালসহ ছয়টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য কার্যালয়ে মোট ২৯৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭৭ জন। শূন্য রয়েছে ২১৬টি পদ।

চিকিৎসক সংকটের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। বিশেষ করে হাসপাতালটির শিশু ওয়ার্ডে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ৮৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৮ জন। সদর উপজেলা স্বাস্থ্য অফিসে ১৩টির মধ্যে ৫ জন, আমতলী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪১টির মধ্যে ১৭ জন, তালতলীতে ৩৪টির মধ্যে ৮ জন, বামনায় ৩৮টির মধ্যে ৬ জন, বেতাগীতে ৪১টির মধ্যে ১২ জন এবং পাথরঘাটায় ৪০টি পদের বিপরীতে ৯ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৩টি পদের বিপরীতে রয়েছেন ২ জন চিকিৎসক।

জেলার প্রায় ১২ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল। সেখানে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকায় ভর্তি রোগী ও জরুরি চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে নানা ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।

বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে বর্তমানে কোনো শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হামের উপসর্গ, জ্বর, সর্দি-কাশি ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।

শিশু ওয়ার্ডে নির্ধারিত শয্যা রয়েছে ৫০টি। এর বিপরীতে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ শিশু রোগী ভর্তি থাকছে। শিশু বিশেষজ্ঞ না থাকায় একজন মেডিকেল অফিসারকে দিয়েই ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা চালাতে হচ্ছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের অভিভাবকদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে। গুরুতর অসুস্থ শিশুদের বরিশালে রেফার করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়ছে যাতায়াত ও অন্যান্য ব্যয়।

২৮ দিন বয়সী মেয়ে মরিয়মকে নিয়ে হাসপাতালে আসা মো. মিজান অভিযোগ করেন, রোগীর তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অনেক কম। ফলে চিকিৎসকেরা রোগীদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না।

মরিয়মের মা মোসা. কুলসুম বলেন, সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করার পরও যদি শিশুকে বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে হয়, তাহলে এতে রোগীর পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। হাসপাতালে শিশু বিশেষজ্ঞ থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই সহজ হতো বলে মনে করেন তিনি।

আরেক শিশু রোগীর স্বজন মোসা. জান্নাতুল বাকিয়াও চিকিৎসক সংকটের কারণে বাইরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার কথা জানান।

শিশু বিশেষজ্ঞ না থাকায় শিশু ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করছেন মেডিকেল অফিসার ডা. শায়লা আক্তার। তিনি জানান, প্রতিদিন ১০০ থেকে ১৫০ শিশু রোগী ভর্তি থাকায় একজন চিকিৎসকের পক্ষে এত রোগীকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. মেহেদী পারভেজ রোগী দেখতেন এবং অন্য চিকিৎসকরাও তার সঙ্গে কাজ করতেন। তিনি সহকারী অধ্যাপক হয়ে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে যাওয়ার পর শিশু বিশেষজ্ঞের পদটি শূন্য হয়েছে।

ডা. শায়লা আক্তার বলেন, একজন শিশু বিশেষজ্ঞসহ আরও কয়েকজন মেডিকেল অফিসার পদায়ন করা হলে শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা সহজ হবে।

বরগুনা জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মনির হোসেন কামাল বলেন, চিকিৎসক সংকটের কারণে বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে পারছে না। তার দাবি, পদায়ন করা চিকিৎসকদের কেউ কেউ নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় সংকট আরও প্রকট হচ্ছে।

তিনি বলেন, রোগীর অবস্থা কিছুটা জটিল হলেই অনেক সময় তাদের বরিশাল বা ঢাকায় রেফার করা হচ্ছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় ও ভোগান্তি—দুটিই বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালটির দিকে সরকার ও প্রশাসনের বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ বলেন, জেলার ২৯৩টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে বর্তমানে ৭৭ জন চিকিৎসক কর্মরত রয়েছেন। এই স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক দিয়েই বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবপ্রবণ এলাকায় সেবা দিতে হচ্ছে।

কর্মস্থলে অনিয়মিত বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ১৩ জন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়েছে।

চিকিৎসক সংকট নিরসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে নিয়মিত অবহিত করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, ২০২৫ সালে ডেঙ্গুর হটস্পট হওয়ার পর একসঙ্গে ১০ জন চিকিৎসক বরগুনায় পদায়ন করা হয়েছিল। পরে তারা অন্যত্র চলে যান।

সিভিল সার্জন আরও জানান, জেনারেল হাসপাতালে কর্মরত শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক হিসেবে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগ দেওয়ায় শিশু বিশেষজ্ঞের পদটি বর্তমানে শূন্য রয়েছে। এ সংকট সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।