বাংলাদেশের তৃতীয় FSRU: ৩৫-৩৭% বেশি রিগ্যাসিফিকেশন ফি

মহেশখালীতে প্রস্তাবিত তৃতীয় LNG টার্মিনালের FSRU
মহেশখালীতে প্রস্তাবিত তৃতীয় LNG টার্মিনালের FSRU

মুক্তমন রিপোর্ট : তৃতীয় এলএনজি টার্মিনালের জন্য চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি কোম্পানিকে বর্তমানের তুলনায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি রিগ্যাসিফিকেশন ফি দিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে প্রস্তাবিত বাড়তি অর্থের কতটা যৌক্তিক, তা নির্ধারণ করতে পারেনি সরকারের গঠিত সাত সদস্যের দর-কষাকষি কমিটি।

চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (CNEE) গত ১৯ জুন মহেশখালীর কুতুবজোমে বিল্ড-ওন-অপারেট (BOO) মডেলে একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। টার্মিনালটির বেস রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা হবে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট (mmcfd) এবং সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৭৫০ mmcfd।

১৫ বছরের চুক্তিতে ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (FSRU) পরিচালনার জন্য CNEE প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার চেয়েছে।

বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির FSRU-এর দৈনিক ফি ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের ফি ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার।

এমনকি ২০২৪ সালের মার্চে পেট্রোবাংলা সামিটের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় FSRU-এর জন্য যে দৈনিক ৩ লাখ ডলার ফি নির্ধারণ করেছিল, CNEE-এর প্রস্তাবিত ফি তার চেয়েও বেশি। ওই চুক্তিটি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে বাতিল করা হয়। সামিট এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যায় এবং বিষয়টি এখনো বিচারাধীন।

এদিকে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের (RPGCL) ২০২৫ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় তৃতীয় FSRU-এর জন্য দৈনিক ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৩ ডলার ফি সুপারিশ করা হয়েছিল।

উচ্চ ফি সত্ত্বেও গত ৩০ আগস্ট সরকারের সাত সদস্যের দর-কষাকষি কমিটি দুটি বিকল্পের সুপারিশ করেছে—১৫ বছরের জন্য প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার অথবা ২০ বছরের জন্য প্রতিদিন ৩ লাখ ২৯ হাজার ডলার।

১৫ বছরের চুক্তিতে দৈনিক ফিটির মধ্যে ২ লাখ ৪৬ হাজার ডলার নির্ধারিত ফি, ৫৯ হাজার ডলার পরিচালন ব্যয় এবং ৩৭ হাজার ডলার বন্দরসেবা ফি হিসেবে ধরা হয়েছে।

CNEE জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর বাজার পরিস্থিতির পরিবর্তন, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা, জাহাজ নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় বৃদ্ধি, বিশ্বব্যাপী FSRU-এর চাহিদা বৃদ্ধি এবং চুক্তি স্বাক্ষরের ১৮ মাসের মধ্যে টার্মিনাল চালুর বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের ব্যয় বেড়েছে।

তবে দর-কষাকষি কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কারণে বর্তমানের তুলনায় কিছুটা বেশি ফি যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু বিস্তারিত মূল্যায়ন বা সমীক্ষা ছাড়া কতটা বেশি ফি যৌক্তিক, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

CNEE-এর প্রস্তাব অনুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এর মধ্যে লেটার অব ইনটেন্ট দেওয়া এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রকল্প চুক্তি স্বাক্ষর করা হলে ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে FSRU চালু করা সম্ভব হবে।

এর আগে ২৮ জুলাই মন্ত্রিসভা কমিটি অন ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স নীতিগতভাবে CNEE-এর প্রস্তাব অনুমোদন করে। কোম্পানিটি বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহের আগ্রহও প্রকাশ করেছে।

পরদিন সাত সদস্যের দর-কষাকষি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, RPGCL, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET), বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) এবং আইন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আবদুল মান্নান।

CNEE-এর চূড়ান্ত প্রস্তাব গ্রহণের সুপারিশ নিয়ে জানতে চাইলে আবদুল মান্নান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রস্তাবিত সরকার-টু-সরকার (G2G) ব্যবস্থা সরকারি ক্রয় আইন, ২০০৬-এর ৬৮ ধারা এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা, ২০২৫-এর ৯৯(২) ও ১০৭(২) বিধির আওতায় প্রক্রিয়াধীন।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ তামিম প্রস্তাবিত রিগ্যাসিফিকেশন ফি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মূল্য এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা—দুটিই ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আগের FSRU-গুলো যদি কম খরচে পাওয়া যায়, তাহলে নতুন একটি FSRU-এর জন্য বেশি অর্থ দেওয়ার যৌক্তিকতা কী, তা স্পষ্ট নয়।

দর-কষাকষির প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচনার বিভিন্ন পর্যায়ে CNEE তাদের প্রস্তাবিত ফি কমিয়েছে। শুরুতে ১৫ বছরের চুক্তিতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার FSRU-এর জন্য প্রতিদিন ৩ লাখ ৫৪ হাজার ১৭৪ ডলার চেয়েছিল তারা।

কোম্পানিটি দুটি FSRU-এর বিকল্প দেয়—২০১৬ সালে নির্মিত ১ লাখ ৭৪ হাজার ঘনমিটারের একটি জাহাজ এবং ২০০৮ সালে নির্মিত ১ লাখ ৬৫ হাজার ঘনমিটারের আরেকটি জাহাজ।

কমিটি বড় জাহাজটির পক্ষে সুবিধা দেখতে পেয়েছে। বেশি ধারণক্ষমতার কারণে বড় এলএনজি কার্গো এবং বিভিন্ন ধরনের এলএনজি ক্যারিয়ার গ্রহণ করা সম্ভব হবে। এতে পেট্রোবাংলার পরিচালনাগত নমনীয়তা বাড়বে।

কমিটির মতে, বড় কার্গো ব্যবহারের ফলে অর্থনীতির সুবিধা পাওয়া যেতে পারে এবং প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (MMBtu) এলএনজি আমদানিতে প্রায় ০.০৫ থেকে ০.১০ ডলার পর্যন্ত খরচ কমতে পারে।

তবে CNEE-এর FSRU উন্নয়নের পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই বলে কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে। তামিমের মতে, জাহাজ প্রস্তুত থাকলেও ১৮ মাসের মধ্যে রূপান্তর করে FSRU চালু করা কঠিন। সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পে ২৪ মাস বা তারও বেশি সময় প্রয়োজন হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, শুধু জাহাজ প্রস্তুত করলেই হবে না; টার্মিনাল স্থাপনের স্থান, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, ঢেউয়ের গতিবিধি বিশ্লেষণসহ বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করতে হবে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের বড় অঙ্কের ব্যয়ের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বাধীন কোনো পরামর্শক বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিয়েছেন তামিম। পাশাপাশি প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়া CNEE-এর সঙ্গে আলোচনা হওয়ায়ও তিনি প্রশ্ন তুলেছেন।

এদিকে, এলএনজি সরবরাহ সংকট আরও গভীর হওয়ায় নতুন FSRU যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এলএনজি সরবরাহকারী কাতারএনার্জি ২০২৬ সালের নির্ধারিত সরবরাহ অর্ধেকে নামিয়ে দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে এলএনজি পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর কাতারের রাস লাফান টার্মিনাল থেকে বাংলাদেশ কোনো এলএনজি কার্গো পায়নি। ফলে উচ্চমূল্যের স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে হচ্ছে।

এতে আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতা এবং সরকারের আর্থিক চাপ দুটিই বাড়ছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির পরিমাণ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। গত অর্থবছরে এই ব্যয় ছিল ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

এর পাশাপাশি গত ২১ জুলাই একটি দুর্ঘটনার পর এক্সিলারেট এনার্জির FSRU বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ অর্ধেকে নেমে যায়।