পাকিস্তানে মানবাধিকার সুরক্ষার আহ্বান অ্যামনেস্টির

পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা ও সেনা মোতায়েন নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ
পাকিস্তানে জরুরি অবস্থা ও সেনা মোতায়েন নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের উদ্বেগ

মুক্তমন রিপোর্ট : পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা, গভর্নরের শাসন জারি ও সেনাবাহিনী মোতায়েনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটি বলেছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার নামে মানবাধিকার লঙ্ঘন, ভিন্নমত দমন কিংবা ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ তৈরি করা উচিত নয়।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক উপপরিচালক বাবু রাম পান্ত বলেন, খাইবার পাখতুনখোয়ার মুখ্যমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নির্বিচারে আটকের অভিযোগ এবং ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার খবর জরুরি অবস্থা জারির যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

তিনি বলেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে রাষ্ট্র জরুরি পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা বা ভিন্নমত দমনের সুযোগ দেওয়া যাবে না।

প্রদেশটিতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটির মতে, অতীতে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থাকায় সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাবু রাম পান্তের মতে, সাধারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করা থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরত থাকা উচিত। একই সঙ্গে সেনাবাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মানদণ্ড অনুসরণ করা জরুরি।

অ্যামনেস্টি আরও বলেছে, জরুরি অবস্থার আওতায় নেওয়া পদক্ষেপগুলোর স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় গৃহীত ব্যবস্থা যেন প্রয়োজনের অতিরিক্ত না হয় এবং পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি গত ১১ অক্টোবর ফেডারেল মন্ত্রিসভার সুপারিশে খাইবার পাখতুনখোয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির অনুমোদন দেন। দেশটির সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাকিস্তান সরকারের দাবি, প্রদেশটিতে সন্ত্রাসী হামলা বেড়ে যাওয়া, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে প্রাদেশিক সরকারের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি সাংবিধানিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে ফেডারেল সরকার।

জরুরি অবস্থার ফলে প্রদেশটির বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা ফেডারেল সংসদের হাতে ন্যস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে সংবিধান অনুযায়ী সমাবেশ, সংগঠন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মতো কিছু মৌলিক অধিকার স্থগিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

প্রেসিডেন্টের ঘোষণায় প্রাদেশিক সরকারের ক্ষমতা ফেডারেল কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলা হয়েছে। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রীসহ প্রাদেশিক মন্ত্রিসভার সদস্য, উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও অ্যাডভোকেট জেনারেলের পদ হারানোর কথা রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রদেশটিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

পিটিআইয়ের বিরোধিতা, বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনা

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ২০১৩ সাল থেকে খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ক্ষমতায় রয়েছে। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর দলটি প্রাদেশিক পরিষদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে।

জরুরি অবস্থা জারির সিদ্ধান্তে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। পিটিআই এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। অন্যদিকে, ফেডারেল সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ও সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রমে সমন্বয়ের ঘাটতিকে এ পদক্ষেপের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলার পাশাপাশি মানবাধিকার সুরক্ষা, জবাবদিহি এবং জরুরি পদক্ষেপের স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। সংস্থাটির মতে, যেকোনো জরুরি ব্যবস্থা পরিস্থিতির জন্য প্রয়োজনীয় ও আনুপাতিক হওয়া জরুরি।