ডুমুরিয়ায় রঙিন তরমুজ চাষে চমক, স্বাবলম্বী কৃষাণি মিতালী

১০ শতক জমিতে রঙিন তরমুজ চাষ করে সফল কৃষাণি মিতালী মণ্ডল
১০ শতক জমিতে রঙিন তরমুজ চাষ করে সফল কৃষাণি মিতালী মণ্ডল

মুক্তমন রিপোর্ট : খুলনার ডুমুরিয়ায় মাত্র ১০ শতক জমিতে বিদেশি জাতের রঙিন তরমুজ চাষ করে সাড়া ফেলেছেন কৃষাণি মিতালী মণ্ডল। অল্প খরচে উচ্চমূল্যের এ তরমুজ চাষ করে ইতোমধ্যে ৩৫ হাজার টাকার বেশি বিক্রি করেছেন তিনি। ক্ষেতে থাকা অবশিষ্ট তরমুজ বিক্রি করে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা আয়ের আশা করছেন এই নারী উদ্যোক্তা।

ডুমুরিয়া উপজেলার সাহস ইউনিয়নের ছোটবন্দ গ্রামের ফসলি জমিতে এখন চোখে পড়ছে সোনালি রঙের তরমুজ। কৃষক পরিবার মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল ও তাঁর স্ত্রী মিতালী মণ্ডলের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে।

কৃষাণি মিতালী মণ্ডল জানান, ১০ শতক জমিতে রঙিন তরমুজ চাষে বীজ, জমি প্রস্তুত, সার-কীটনাশক ও পরিচর্যাসহ তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ টাকা। এরই মধ্যে তিনি ৩৫ হাজার টাকার বেশি তরমুজ বিক্রি করেছেন। ক্ষেতে থাকা অবশিষ্ট তরমুজ থেকে আরও প্রায় ১০ হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে আশা করছেন তিনি।

বাজারে সাধারণ তরমুজের তুলনায় রঙিন তরমুজের চাহিদা বেশি। বর্তমানে প্রতি কেজি প্রায় ৭০ টাকা দরে তরমুজ বিক্রি করছেন মিতালী, যা সাধারণ তরমুজের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দাম বলে জানান তিনি।

মিতালী মণ্ডল বলেন, প্রথম দিকে বাজারে কেমন দাম পাওয়া যাবে তা নিয়ে কিছুটা শঙ্কা ছিল। তবে ফলন আসার পর বাজারে ভালো সাড়া পাওয়া গেছে। দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ার পাশাপাশি এ তরমুজ খেতেও মিষ্টি ও সুস্বাদু।

তিনি জানান, এবার তাঁরা মূলত ‘তৃপ্তি’ জাতের রঙিন তরমুজ চাষ করেছেন। এ জাতের তরমুজে বৈচিত্র্য রয়েছে—কোনোটির বাইরের অংশ সোনালি হলুদ হলেও ভেতরে লাল, আবার কোনোটি বাইরে ও ভেতরে দুদিকেই হলুদ।

নিজের উদ্যোগে স্বাবলম্বী হতে পেরে আনন্দিত মিতালী বলেন, পরিশ্রম করে ভালো ফলন ও আয় করতে পারায় তাঁর আত্মবিশ্বাস বেড়েছে।

মিতালীর স্বামী মৃত্যুঞ্জয় মণ্ডল বলেন, তাঁর স্ত্রী অত্যন্ত পরিশ্রম করে ক্ষেতটির পরিচর্যা করেছেন। অল্প খরচে অল্প সময়ে এত ভালো লাভ এর আগে তাঁরা দেখেননি।

তিনি বলেন, স্থানীয় অনেক কৃষক প্রতিদিন তাঁদের ক্ষেত দেখতে আসছেন এবং আগামী মৌসুমে রঙিন তরমুজ চাষের বিষয়ে পরামর্শ নিচ্ছেন। সরকারি সহায়তা ও সহজলভ্য বীজ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চলে রঙিন তরমুজের চাষ আরও বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

ডুমুরিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. নাজমুল হুদা বলেন, মিতালী মণ্ডলের উদ্যোগ ডুমুরিয়ার কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। রঙিন তরমুজ একটি উচ্চমূল্যের ফসল। সাধারণ তরমুজের মৌসুম শেষ হওয়ার পর অফ-সিজনে এটি বাজারজাত করা সম্ভব হওয়ায় কৃষকরা তুলনামূলক বেশি দাম পান।

তিনি জানান, উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে মিতালী মণ্ডলকে কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে এলাকার আরও কৃষককে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

খুলনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দানাদার শস্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফল ও সবজি চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

খুলনার মাটিতে রঙিন তরমুজের ভালো ফলন প্রমাণ করে এ অঞ্চলের মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, এ ধরনের ফসল কৃষকের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ ও ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তিনি জানান, জেলাজুড়ে এ ধরনের প্রদর্শনী ও চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

ডুমুরিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিজ সবিতা সরকার বলেন, ছোটবন্দ গ্রামের মিতালী মণ্ডলের সাফল্য অত্যন্ত অনুপ্রেরণাদায়ক। একজন নারী কৃষক হিসেবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের ফসল চাষের মাধ্যমে তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন।

উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের উদ্যমী নারী কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করার কথা জানান তিনি।

মিতালী মণ্ডলের সফলতা দেখে ছোটবন্দ গ্রামসহ ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকার কৃষকদের মধ্যে রঙিন তরমুজ চাষের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক বাজারজাতকরণ ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ডুমুরিয়ায় রঙিন তরমুজের চাষ আরও সম্প্রসারিত হতে পারে।

শেখ মাহতাব হোসেন

ডুমুরিয়া (খুলনা)