অভিবাসী ও কমিউনিস্টদের দায়ী করে বক্তব্য মার্কিন প্রেসিডেন্টের, ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা হিসেবে ফ্রান্সের বিক্ষোভকে তুলে ধরছেন রিপাবলিকান নেতারাও
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতাকে যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ব্যবহার করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, অভিবাসননীতি ও বামপন্থী রাজনীতির কারণে ফ্রান্স অস্থিরতার মুখে পড়েছে। আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যে এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, একসময়ের শক্তিশালী ফ্রান্স এখন অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের হাতে ‘বিজিত, লুণ্ঠিত ও পুড়িয়ে ধ্বংস’ হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে কী ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তা বুঝতে ফ্রান্সের পরিস্থিতির দিকে তাকালেই চলবে।
তবে ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে নয়; বরং বিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকসংকট, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়কে কেন্দ্র করে। পরে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, মজুরি ও ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়গুলোও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে পরিণত হয়। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিক্ষোভের একাংশে সহিংসতা ও ভাঙচুর ছড়িয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, শনিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভের পর কয়েকটি শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ঐতিহাসিক লিমোজ শহরের সিটি হল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার ফ্রান্সের কয়েকটি শহর এবং প্যারিসের কিছু এলাকায় রাতের কারফিউ জারি করা হয়।
অভিবাসননীতিকে ঘিরে ট্রাম্পের বক্তব্য
কানসাসে সমাবেশের আগে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁকে সতর্ক করেছিলেন যে তিনি ‘বড় ভুল’ করছেন। ট্রাম্পের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে, কিন্তু ফ্রান্স তা করেনি।
একই দিন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ফ্রান্সের নেতাদের দ্রুত সীমান্ত বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর এসব বক্তব্যে ফ্রান্সের অস্থিরতার জন্য অভিবাসননীতিকে দায়ী করা হলেও, প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী বিক্ষোভের প্রাথমিক কারণ ছিল শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয়সংক্রান্ত অসন্তোষ।
কানসাসের সমাবেশস্থলে ট্রাম্প মঞ্চে ওঠার আগে বড় পর্দায় ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ফক্স নিউজের প্রায় ১০ মিনিটের প্রতিবেদন দেখানো হয়। ওই প্রতিবেদনের আলোচনায় ফ্রান্স সরকারের অভিবাসননীতিকে সহিংসতার কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।
রিপাবলিকান নেতাদের একই সুর
ট্রাম্পের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং কয়েকজন শীর্ষ রিপাবলিকান নেতাও ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে অভিবাসন ও বামপন্থী রাজনীতির বিরুদ্ধে যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
ভ্যান্স সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লেখেন, পশ্চিমা উদারপন্থীরা ফ্রান্সে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী এনেছেন এবং আত্মীকরণ ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যের মৌলিক প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করেছেন।
প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন দাবি করেন, উন্মুক্ত সীমান্তনীতির কারণে ফ্রান্স বিশৃঙ্খলার দিকে যাচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসননীতির সঙ্গে ফ্রান্সের পরিস্থিতির তুলনা করা হয়। সিনেটর এরিক স্মিটও ফ্রান্সের অস্থিরতাকে বামপন্থী রাজনীতির ফল হিসেবে বর্ণনা করেন।
হোয়াইট হাউসের সরকারি এক্স অ্যাকাউন্টেও অভিবাসনকে কেন্দ্র করে একই ধরনের বার্তা প্রকাশ করা হয়।
ইউরোপের অন্য দেশেও বিক্ষোভ
ফ্রান্সের বাইরে স্পেন, পর্তুগাল ও ইতালিতেও শিক্ষা, আবাসনব্যয় এবং জীবনযাত্রার মান নিয়ে বিক্ষোভ হয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে তরুণদের অসন্তোষের পেছনে বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব, বাড়িভাড়া বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো বিষয় রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনায় রিপাবলিকান নেতারা মূলত ফ্রান্সের অস্থিরতার ওপরই গুরুত্ব দিচ্ছেন। এতে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় পরিচয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের সীমান্তনীতির পক্ষে সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে প্রচার
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে ট্রাম্পের কানসাস সফর অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শাল ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটনের কাছ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে রয়েছেন।
ট্রাম্পের বক্তব্য, ফ্রান্সের মতো পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে হতে দেওয়া হবে না। ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সও মার্কিন ভোটারদের ফ্রান্সের ঘটনাপ্রবাহের দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে ফ্রান্সের বিক্ষোভের কারণ নিয়ে ট্রাম্প ও তাঁর দলের বক্তব্যের সঙ্গে বিক্ষোভের প্রাথমিক দাবিগুলোর পার্থক্য রয়েছে। আন্দোলন শুরু হয়েছিল শিক্ষা খাতের সমস্যা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে; পরে এর বিস্তার ঘটে এবং কিছু এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিতর্কে অভিবাসন ও জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে রাজনৈতিক যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন ট্রাম্প ও রিপাবলিকান নেতারা।
-দ্য গার্ডিয়ান