চট্টগ্রাম বন্দরে বিপজ্জনক রাসায়নিক, বিস্ফোরণের শঙ্কা

 চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার
চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার

মুক্তমন রিপোর্ট : দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরে বছরের পর বছর পড়ে আছে ৩২৩ টিইইউ বিপজ্জনক রাসায়নিকবোঝাই কনটেইনার। এর মধ্যে ৪৪টি কনটেইনার জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসায় অগ্নিকাণ্ড, বিস্ফোরণ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

২০২০ সালে লেবাননের বৈরুত বন্দরে বিপুল পরিমাণ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট অনিরাপদভাবে মজুত থাকার কারণে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ঘটনায় তিন বাংলাদেশিসহ ২০০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকার ঘটনায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বন্দর সূত্র জানায়, বিভিন্ন ইয়ার্ড ও জেটিতে পড়ে থাকা এসব কনটেইনারের কোনো কোনোটি ১৫ থেকে ২০ বছরের পুরোনো। এগুলোতে সালফিউরিক অ্যাসিড, নাইট্রিক অ্যাসিড, মিথানল ও থিনারসহ বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক রয়েছে। দীর্ঘদিন যথাযথ নিষ্পত্তি না হওয়ায় কনটেইনারের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার রাসেল আহমেদ বলেন, এসব রাসায়নিকের মধ্যে উচ্চ অগ্নিঝুঁকিসম্পন্ন পদার্থ রয়েছে। ফলে এগুলো দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষের ট্রাফিক ইন্সপেক্টর সাইফুল ইসলাম রনি বলেন, এসব রাসায়নিক থেকে আগুন বা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বন্দরটি একটি বন্ডেড এলাকা হওয়ায় এখানে বিপজ্জনক রাসায়নিকের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যও রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনা ঘটলে তা আশপাশে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আমদানি-রপ্তানি পণ্য ওঠানামা করে। এ অবস্থায় কোনো কনটেইনারে আগুন লাগলে আশপাশের পণ্য, যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ব্যাহত হতে পারে বন্দরের স্বাভাবিক কার্যক্রমও। রাসায়নিকের ধরন অনুযায়ী বিষাক্ত বাষ্প ছড়িয়ে পড়া এবং মাটি ও পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

বন্দর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আমদানিকারকদের পণ্য খালাস না করা, নিলামপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে এসব রাসায়নিক বছরের পর বছর পড়ে আছে। আমদানির ৩০ দিনের মধ্যে পণ্য খালাস না করায় নিলামে বিক্রির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কাস্টমস কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে বিপজ্জনক রাসায়নিকের ক্ষেত্রে শুধু সাধারণ নিলামপ্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। রাসায়নিকের ধরন, ব্যবহারযোগ্যতা, সংরক্ষণের অবস্থা ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।

বন্দরে পড়ে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিক অপসারণে সম্প্রতি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রথম ধাপে নয়টি কনটেইনার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় ধ্বংসের জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। এসব কনটেইনারে মোট ১৫০ দশমিক ৮৯ টন রাসায়নিক ছিল। এর মধ্যে ২৫ দশমিক ৫৫ টন সালফিউরিক অ্যাসিড, ৫০০ কেজি নাইট্রিক অ্যাসিড, ৯২ দশমিক ৫৪ টন মিথানল এবং ৩২ দশমিক ৩০ টন থিনার রয়েছে।

এদিকে রাসায়নিক পরিবহনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন লাগার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাঁচপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়িতে থাকা ড্রামগুলো খালি ছিল এবং প্রাথমিকভাবে ইঞ্জিন থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তাই ঘটনাটিকে রাসায়নিকের বিস্ফোরণ হিসেবে বর্ণনা করার ভিত্তি নেই। তবে বিপজ্জনক পণ্য পরিবহনে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আবারও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ওয়াটা কেমিক্যালস লিমিটেডের কারখানায় পরীক্ষামূলকভাবে আটটি কনটেইনারের রাসায়নিক ধ্বংসের প্রক্রিয়া সফল হয়েছে। তবে বন্দরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক নিরাপদে নিষ্পত্তির জন্য আরও বড় পরিসরের সক্ষমতা ও উপযুক্ত স্থাপনা প্রয়োজন। অবশিষ্ট রাসায়নিকের ধরন ও পরিমাণ নির্ধারণ করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

জরাজীর্ণ কনটেইনারে থাকা বিপজ্জনক রাসায়নিকের কারণে অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে—এমন উদ্বেগ জানিয়ে কাস্টম কমিশনারকে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এসব পণ্য দ্রুত সরিয়ে নেওয়া এবং ঝুঁকি কমানো এখন সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার শরীফ মোহাম্মদ আল আমিন বলেন, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে এসব পণ্য নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় কমিটির পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) অনুসরণ করে নিলামপ্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ব্যবহারযোগ্য রাসায়নিক আইনানুগভাবে নিলামে বিক্রি করা যেতে পারে। অন্যদিকে মেয়াদোত্তীর্ণ, ব্যবহার অনুপযোগী বা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক উপযুক্ত স্থাপনায় নিরাপদে ধ্বংস করতে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জননিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব রাসায়নিকের কারণে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, রাসায়নিকের ধরন ও ঝুঁকি নিরূপণ করে পরিবেশগত আইন ও বিধিবিধান অনুসরণে দ্রুত নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া, সম্ভাব্য দূষণ প্রতিরোধ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিপজ্জনক রাসায়নিকের ঝুঁকি শুধু আগুন বা বিস্ফোরণে সীমাবদ্ধ নয়। ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে অ্যাসিড বা অন্য রাসায়নিক বেরিয়ে এলে আশপাশের মাটি ও পানি দূষিত হতে পারে। কিছু রাসায়নিকের বাষ্প মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার দাহ্য রাসায়নিকের ক্ষেত্রে আগুনের সামান্য উৎস থেকেও বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার শনাক্ত করা, রাসায়নিকের প্রকৃতি নির্ধারণ, নিরাপদ সংরক্ষণ এবং পরিবেশসম্মত উপায়ে ধ্বংসের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বলেন, বন্দরে ৩০০ টিইইউর বেশি বিপজ্জনক পণ্য রয়েছে। এসব পণ্য সরিয়ে নিতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হচ্ছে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তরের চট্টগ্রামের সাবেক সহকারী পরিদর্শক এস এম শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিপজ্জনক রাসায়নিক দীর্ঘদিন ধরে বন্দরে পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনারে সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। রাসায়নিকের ধরন, সংরক্ষণব্যবস্থা ও বর্তমান অবস্থা যাচাই করে সম্ভাব্য ঝুঁকি নিরূপণ করতে হবে। বিশেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার ঘটনা থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে দ্রুত নিরাপদ সংরক্ষণ ও বিধি অনুযায়ী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

চট্টগ্রাম বন্দর দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। সেখানে বছরের পর বছর বিপজ্জনক রাসায়নিক পড়ে থাকা এবং জরাজীর্ণ কনটেইনার থেকে রাসায়নিক বেরিয়ে আসার বিষয়টি এখন শুধু পণ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা নয়; এটি বন্দর নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।

Muktomon/TA