মুক্তমন রিপোর্ট : ভোরের আলো ফুটতেই বেলুয়া নদীতে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়তে শুরু করে। কোনো নৌকায় শাকসবজি ও কৃষিপণ্য, আবার কোনোটি যেন ভাসমান দোকান। নৌকা থেকে নৌকায় চলে দরদাম ও কেনাবেচা। কয়েক ঘণ্টার জন্য নদীর বুকজুড়ে গড়ে ওঠে জমজমাট এক ব্যতিক্রমী বাজার।
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারের চিত্র এটি। বৈঠাকাটা বাজারসংলগ্ন বেলুয়া নদীতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দুই দিন বসে এই হাট। নদী ও নৌকাকেন্দ্রিক জীবনযাত্রার কারণে স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিত ‘বাংলার ভেনিস’ নামে।
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় ভাসমান বাজার হিসেবে পরিচিত বৈঠাকাটা হাটটি নাজিরপুর, নেছারাবাদ ও বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার মানুষের বাণিজ্যিক যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। নাজিরপুর উপজেলার অংশে বেলুয়া নদীর প্রায় এক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বাজারটি বিস্তৃত।
নাজিরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের এই বাজারে ভোর থেকেই আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকাররা নৌকা নিয়ে আসেন। শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে শুরু হয় কেনাবেচা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে বাজার। তবে সকাল ১১টার মধ্যে অধিকাংশ নৌকা ফিরে যেতে শুরু করলে নদীর বুক আবার শান্ত হয়ে আসে।
নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া, মুগারঝোর, মনোহরপুর, পদ্মডুবি, বিলডুমুরিয়া, সোনাপুর, গাওখালী, চাঁদকাঠি, সাচিয়া, লড়া ও পেনাখালীসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকেরা নৌকায় করে তাঁদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আসেন। নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া, গগন, মলুহার, কাঁটাখালী, ইলুহার ও জনতা এবং বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বিশারকান্দি, উমারেরপাড়, উদয়কাঠী, কদমবাড়ি ও চৌমোহনাসহ আশপাশের এলাকার কৃষকেরাও এখানে পণ্য বিক্রি করেন।
বাজারে বরবটি, কুমড়া, পুঁইশাক, করলা, পটল, কাঁকরোল, কাঁচকলা, টমেটো, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শালগম, কচু, চালকুমড়া, নারিকেল, কলা, শাপলা, সবজির চারা ও বিভিন্ন কৃষিপণ্যের সমারোহ দেখা যায়। কাকডাকা ভোরে ডিঙি নৌকায় পণ্য সাজিয়ে বাজারে আসেন কৃষকেরা। একই সঙ্গে ক্রেতা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও নৌকা নিয়ে জড়ো হন।
শুধু কৃষিপণ্য নয়, বাজারে রয়েছে ভাসমান চায়ের দোকান, পিঠা ও নানা খাবারের দোকানও। নৌকার ওপরই সাজানো হয় এসব দোকানের পসরা। ফলে কয়েক ঘণ্টার জন্য বেলুয়া নদী পরিণত হয় মানুষের কোলাহল ও বেচাকেনায় মুখর এক ব্যতিক্রমী বাজারে।
স্থানীয় কৃষকের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও পাইকাররা বৈঠাকাটা বাজারে আসেন। তাঁরা কৃষিপণ্য কিনে বিভিন্ন জেলা ও অঞ্চলের বাজারে নিয়ে যান। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, এখানকার কৃষিপণ্যের একটি অংশ দেশের বাইরেও যায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ইউনুস ব্যাপারী বলেন, গ্রাম থেকে পণ্য কিনে এনে তিনি এই বাজারে বিক্রি করেন। তাঁর প্রধান পণ্য কাঁকরোল। বাজারে ভালো বেচাকেনা হওয়ায় এখানকার আয় দিয়েই তাঁর সংসার চলে।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি হাটে প্রায় ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার পণ্য কেনাবেচা হয়। তবে মৌসুমভেদে বেচাকেনার পরিমাণে পরিবর্তন আসে। বিশেষ করে তরমুজের মৌসুমে নদীর বুকজুড়ে তরমুজবোঝাই নৌকার সারি দেখা যায়। সে সময় প্রতি হাটে বেচাকেনা এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার শুরু হয়ে সকাল ১০টা পর্যন্ত জমজমাট থাকে। কাঁচা সবজি, নারিকেল ও তরমুজ এখানকার প্রধান পণ্য। বর্তমানে প্রতি হাটে ৫০ থেকে ৭০ লাখ টাকার মতো বেচাকেনা হলেও তরমুজের মৌসুমে তা এক থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে।
বৈঠাকাটা বাজারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভাসমান কৃষির উপকরণের বেচাকেনা। এখানে শাকসবজি ও ফলমূলের পাশাপাশি বিক্রি হয় বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও আগাছা। এসব উপকরণ ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করেন স্থানীয় কৃষকেরা। পরে সেই বেডে শীতকালীন সবজি ও বিভিন্ন ধরনের চারা উৎপাদন করা হয়।
দক্ষিণাঞ্চলের খাল-বিল ও ছোট নদীবেষ্টিত এলাকায় পানির ওপর ভাসমান বেডে সবজি চাষের প্রচলন দীর্ঘদিনের। কচুরিপানা, তেঁপাপোনা, দুলালিলতা ও ফেনাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ দিয়ে এসব বেড তৈরি করা হয়। আগে যেসব উদ্ভিদকে অনেকটা অপ্রয়োজনীয় মনে করা হতো, এখন সেগুলোই কৃষকদের কাছে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাজারে শ্যাওলা বিক্রি করতে আসা ইব্রাহিম জানান, তিনি মোল্লারহাট থেকে শ্যাওলা নিয়ে আসেন। কুড়ি হিসেবে ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেন। ভালো দিনে আট-নয় হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয় বলে জানান তিনি।
শ্যাওলা কিনতে আসা এক ক্রেতা জানান, ভাসমান বেডে চারা উৎপাদনের জন্য তিনি শ্যাওলা কিনতে এসেছেন। এই শ্যাওলা ব্যবহার করে ভাসমান বেড তৈরি করে বিভিন্ন ধরনের সবজি ও চারা উৎপাদন করা হয়।
অর্থাৎ এ অঞ্চলের ভাসমান কৃষি ও বৈঠাকাটা বাজার একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। পানিতে ডুবে থাকা জমিতে ভাসমান বেড তৈরি করে কৃষকেরা সবজি ও চারা উৎপাদন করেন। পরে নৌপথে এসব পণ্য বৈঠাকাটা বাজারে আসে। উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ—পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে নদী ও নৌকা।
বৈঠাকাটা বাজার ঠিক কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য স্থানীয়দের কাছেও নেই। তবে প্রবীণ ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের দাবি, বাজারটি বহু দশক ধরে চলছে। কেউ কেউ এর বয়স এক শতাব্দীর কাছাকাছি বললেও এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।
৪৫ বছর ধরে বৈঠাকাটা বাজারে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৯৭১ সালে তাঁর জন্ম। তাঁর জন্মের আগেও এই হাট ছিল। তাঁর ধারণা, হাটটির বয়স ৭০ থেকে ৭৫ বছর হতে পারে।
স্থানীয় কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম খান বলেন, তাঁর বাবা-দাদার আমল থেকেই এখানে কৃষিপণ্যের বেচাকেনা দেখে আসছেন। দূর-দূরান্তের ব্যবসায়ীরাও এই বাজারে পণ্য কিনতে আসেন।
বাজারটির বয়স নিয়ে মতভেদ থাকলেও স্থানীয়দের কাছে এটি দীর্ঘদিনের কৃষি ও বাণিজ্যিক ঐতিহ্যের অংশ।
বাজারের দিনে বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই ব্যতিক্রমী হাট দেখতে আসেন। নদীতে সারিবদ্ধ নৌকা, নৌকার ওপর সাজানো রকমারি সবজি এবং কয়েক ঘণ্টার ব্যস্ত বেচাকেনা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে।
স্থানীয়দের মতে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি বৈঠাকাটা বাজারের পর্যটন সম্ভাবনাও রয়েছে। নদীর বুকজুড়ে শত শত নৌকা, কৃষিপণ্যের বেচাকেনা, নদীকেন্দ্রিক জীবনযাত্রা ও স্থানীয় সংস্কৃতির সমন্বয়ে এটি একটি আকর্ষণীয় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি বৈঠাকাটা ভাসমান বাজারকে ঘিরে ভেলা বাইচের মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও হয়েছে। এতে বাজার ও নদীর দুই পাড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর মৃধা বলেন, বৈঠাকাটা ‘বাংলার ভেনিস’খ্যাত একটি বাজার এবং বিদেশি পর্যটকরাও এখানে আসেন। তবে সড়ক যোগাযোগ ও থাকার ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। এসব অবকাঠামো উন্নত করা হলে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে তাঁর ধারণা।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, বৈঠাকাটা বাজারে নৌকার ওপর শাকসবজি, ফলমূল, সবজির চারা ও চারা উৎপাদনের বিভিন্ন উপকরণ বিক্রি হয়। শনিবার ও মঙ্গলবার ভোরে বাজার বসে এবং বিভিন্ন এলাকার কৃষক ও পাইকাররা এখানে আসেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার বেচাকেনা হয়ে থাকে।
বেলুয়া নদীর বুকে গড়ে ওঠা বৈঠাকাটা ভাসমান বাজার এখন শুধু কৃষিপণ্য কেনাবেচার স্থান নয়; এটি কৃষক, পাইকার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নৌযানচালকসহ বহু মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। তবে যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবহন ব্যয় ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়ন হলে বাজারটির সম্ভাবনা আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
Muktomon/TA