মুক্তমন রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পেশায় কর্মরত মানুষের মধ্যে বিবাহ বিচ্ছেদের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গেছে। প্রায় ৫০০ ধরনের পেশার তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত এক গবেষণা-ভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কিছু পেশায় বিচ্ছেদের হার ৪৫ শতাংশের ওপরে, আবার কিছু উচ্চদক্ষ পেশায় তা ২০ শতাংশের নিচে।
FlowingData ও Visual Capitalist-এ প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই বিশ্লেষণে পেশার ধরন, কাজের সময়সূচি, কর্মপরিবেশ, প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা, আয় ও কাজ-জীবনের ভারসাম্যের মতো বিষয়গুলোকে সম্ভাব্য প্রভাবক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব পরিসংখ্যান কোনো নির্দিষ্ট পেশা বিবাহবিচ্ছেদের কারণ—এমন সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণ করে না। বরং পেশাভেদে কর্মপরিবেশ ও জীবনযাপনের পার্থক্যের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের হারের একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক দেখা গেছে।
উচ্চশিক্ষা ও দক্ষ পেশায় বিচ্ছেদের হার কম
বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষা ও বিশেষায়িত দক্ষতার প্রয়োজন হয়—এমন পেশাগুলোতে বিবাহবিচ্ছেদের হার তুলনামূলক কম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদের মধ্যে বিচ্ছেদের হার ২৫ দশমিক ৯ শতাংশ। অ্যাসোসিয়েট ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে এ হার ৩০ দশমিক ১ শতাংশ এবং শুধু হাইস্কুল ডিপ্লোমাধারীদের ক্ষেত্রে ৩৮ দশমিক ৮ শতাংশ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অ্যাকচুয়ারিদের হার সবচেয়ে কম
তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বিবাহবিচ্ছেদের সবচেয়ে কম হার দেখা গেছে অ্যাকচুয়ারিদের মধ্যে—১৪ দশমিক ২ শতাংশ।
অ্যাকচুয়ারি পেশাজীবীরা গণিত, পরিসংখ্যান ও সম্ভাব্যতার মডেল ব্যবহার করে আর্থিক ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা মূল্যায়ন করেন।
কম বিচ্ছেদের হারের পেশার তালিকায় আরও রয়েছে ফিজিক্যাল সায়েন্টিস্ট (১৭ দশমিক ২ শতাংশ), কম্পিউটার সায়েন্টিস্ট (১৮ দশমিক ৭ শতাংশ), সফটওয়্যার ডেভেলপার (১৮ দশমিক ৯ শতাংশ), ফিজিওথেরাপিস্ট (১৯ শতাংশ), চিকিৎসক (২০ দশমিক ১ শতাংশ), ফার্মাসিস্ট (২০ দশমিক ৩ শতাংশ), পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার (২০ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং অ্যাটমসফেরিক সায়েন্টিস্ট (২০ দশমিক ৪ শতাংশ)।
ধর্মীয় পেশার কিছু ক্ষেত্রেও তুলনামূলক কম হার দেখা গেছে। প্রতিবেদনে প্রোটেস্ট্যান্ট বা ইভানজেলিক্যাল ধর্মীয় নেতাদের ক্ষেত্রে হার প্রায় ২০ দশমিক ২ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
কোন পেশায় হার ৪৫ শতাংশের বেশি?
অন্যদিকে, বেশি বিবাহবিচ্ছেদের হারের তালিকায় রয়েছে এমন অনেক পেশা যেখানে শিফট ডিউটি, অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, বেশি কর্মচাপ এবং নিয়মিত গ্রাহকসেবার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রতিবেদনে সবচেয়ে বেশি হারের পেশাগুলোর মধ্যে টেলিমার্কেটারদের হার ৪৮ শতাংশ, বাসচালকদের ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ, প্রেস মেশিন অপারেটরদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ, কেয়ার সার্ভিস সুপারভাইজারদের ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ এবং কারাগার-সংশ্লিষ্ট সুপারভাইজারদের ৪৭ দশমিক ৫ শতাংশ উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতের কিছু পেশাতেও তুলনামূলক বেশি হার দেখা গেছে। যেমন—ট্রেইনি নার্স ৪৭ দশমিক ১ শতাংশ, সাইকিয়াট্রিক অ্যাসিস্ট্যান্ট ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ও সহকারী ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ম্যাসাজ থেরাপিস্ট ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
একই খাতেও কেন এত পার্থক্য?
স্বাস্থ্যসেবা খাতের বিভিন্ন পেশার মধ্যে এই বড় পার্থক্য বিশেষভাবে লক্ষণীয়। চিকিৎসক, সার্জন, ডেন্টিস্ট, ফিজিওথেরাপিস্ট, অপটোমেট্রিস্ট ও মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্টদের মতো পেশার সঙ্গে কিছু সহায়ক বা শিফটভিত্তিক পেশার বিবাহবিচ্ছেদের হারের পার্থক্য অনেক বেশি।
বিশ্লেষণে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে কাজের সময়সূচি, প্রশিক্ষণের মাত্রা, দায়িত্বের ধরন, কর্মক্ষেত্রে স্বাধীনতা, কাজের চাপ এবং বেতনের পার্থক্যের কথা বলা হয়েছে।
অনিয়মিত কর্মঘণ্টার প্রভাব
কাজের সময়সূচিকে এই সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক Harriet B. Presser-এর নেতৃত্বে ৩ হাজার ৪০০-এর বেশি বিবাহিত দম্পতিকে নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, নিয়মিত দিনের কর্মঘণ্টার তুলনায় অনিয়মিত কর্মসূচি দাম্পত্য জীবনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে রাতের শিফটের ক্ষেত্রে কাজ ও ব্যক্তিজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। সন্তান জন্মের পর এই চাপ আরও বাড়তে পারে, কারণ অনিয়মিত কর্মঘণ্টার কারণে পরিবারের দৈনন্দিন দায়িত্ব ভাগাভাগিতে সমস্যা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
দুই প্রান্তের ব্যবধান ২৬ শতাংশ পয়েন্টের বেশি
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি বিবাহবিচ্ছেদের হারের ২০টি পেশার গড় হার প্রায় ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ। বিপরীত দিকে সবচেয়ে কম হারের ২০টি পেশায় গড় হার প্রায় ২০ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থাৎ দুই গ্রুপের গড়ের মধ্যে ব্যবধান ২৬ শতাংশ পয়েন্টের বেশি।
তবে এই পার্থক্যকে সরাসরি ‘পেশার কারণে বিবাহবিচ্ছেদ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না। বয়স, আয়, শিক্ষা, কর্মঘণ্টা, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতিসহ আরও অনেক বিষয় দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষণটি মূলত দেখায়, মানুষের কর্মজীবনের ধরন ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকতে পারে। বিশেষ করে অনিয়মিত কর্মঘণ্টা, রাতের শিফট এবং অতিরিক্ত কর্মচাপের মতো বিষয়গুলো পরিবার ও কাজের ভারসাম্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।