মুক্তমন রিপোর্ট : সীমান্তের কাছে গেলেই আতঙ্ক। কৃষিকাজ, ঘাস কাটা, মাছ ধরা কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে যাওয়ার মতো দৈনন্দিন কাজেও সীমান্তবর্তী মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। গত এক যুগে ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে অন্তত ২৬ বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে জানা গেছে। আহত হয়েছেন আরও অনেকে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ২৪ বাংলাদেশি নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে পীরগঞ্জের চান্দেরহাট সীমান্তে গুলিতে আরও দুজন নিহত হন। সর্বশেষ এ ঘটনা সীমান্তে প্রাণহানির বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে।
গত ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে পীরগঞ্জ উপজেলার চান্দেরহাট সীমান্তের ৩৩৩ নম্বর সীমান্ত পিলারের কাছে বিএসএফের গুলিতে আহত হন তিন বাংলাদেশি। তারা হলেন দক্ষিণ ইন্দ্রইল গ্রামের আবদুল ওয়াজেদের ছেলে আসাদুল হক (৩৮), উত্তর ইন্দ্রইল গ্রামের আহেদ আলীর ছেলে মোস্তাকিম এবং একই এলাকার মুনষা নারায়ণের ছেলে শ্রী উদা রায়।
গুলিবিদ্ধ তিনজনকে ভারতের রায়গঞ্জের কালিয়াগঞ্জ স্টেট জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসাদুল হক ও মোস্তাকিম মারা যান। শ্রী উদা রায়কে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটক করে। ঘটনার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আসাদুল হকের মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত আনা হয়। মোস্তাকিম ও শ্রী উদা রায় তখনো ভারতের হেফাজতে ছিলেন।
ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির আওতায় হরিপুর, রাণীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও আংশিক পীরগঞ্জ উপজেলার বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা রয়েছে। এ এলাকায় ১৯টি সীমান্ত ফাঁড়ি বা বিওপি রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি ঠাকুরগাঁওয়ে এবং তিনটি পঞ্চগড়ে।
বেউরঝাড়ী, কান্তিভিটা, রত্নাই, বজরুক, মুন্ডুমালা, জগদল, চাপসার, নাগরভিটা ও কান্দালসহ বিভিন্ন সীমান্তে বিভিন্ন সময়ে গুলিতে বাংলাদেশি নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কখনো সীমান্তের কাছ থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আবার কখনো ভারতের ভেতর থেকে মরদেহ ফেরত আনা হয়েছে। কোনো কোনো ঘটনায় গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ আটক করেছে।
২০১৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ ঘাস কাটতে কিংবা মাছ ধরতে সীমান্ত এলাকায় গিয়েছিলেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন। আবার কিছু ঘটনায় বিজিবি ও বিএসএফের পক্ষ থেকে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা বা চোরাচালানের অভিযোগ করা হয়েছে। তবে নিহতদের পরিবারের অনেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে হরিপুরের চাপসার সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন রাসেল। তাঁর মা সেলিনা বেগম বলেন, ছেলেকে হারানোর শোক এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তাঁর ভাষ্য, কোনো অভিযোগ থাকলেও গুলি করে হত্যা করা উচিত ছিল না।
সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়েছেন। কারও সন্তান পিতৃহারা হয়েছে, আবার কোনো পরিবার হারিয়েছে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। ফলে স্বজন হারানোর পাশাপাশি চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো নিয়েও সংকটে পড়েছেন অনেক পরিবার।
রাণীশংকৈলের ধর্মগড় সীমান্তে গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিএসএফের গুলিতে ১৫ বছর বয়সী জয়ন্ত নিহত হয়। পরিবারের সদস্যদের দাবি, নানার বাড়িতে যাওয়ার পথে সে গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে উদ্ধারে গিয়ে তার বাবা মহাদেবও গুলিবিদ্ধ হন।
বালিয়াডাঙ্গীর মুন্ডুমালা সীমান্তে নিহত শাহ আলমের পরিবারেও নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে তাঁর মা-বাবা অসহায় হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
বেউরঝাড়ী সীমান্তে নিহত নুরুজ্জামানের স্ত্রী আলেফা বেগম বলেন, স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে সংসার চালাতে তাঁর কষ্ট হচ্ছে। নুরুজ্জামানকে চোরাকারবারি বলা হলেও তাঁর পরিবার এ অভিযোগ মানতে নারাজ।
সীমান্তবর্তী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সীমান্তের কাছাকাছি কৃষিকাজ, ঘাস কাটা কিংবা গবাদিপশুর জন্য ঘাস সংগ্রহের সময়ও তাঁরা অনেক ক্ষেত্রে আতঙ্কে থাকেন। স্থানীয়দের কেউ কেউ সীমান্তে আরও কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও স্পষ্ট সীমারেখার দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মানিক বলেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি কমতে পারে। তাঁর মতে, এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে চোরাচালানের অভিযোগ ওঠার ঘটনাও কমবে।
সাংস্কৃতিক কর্মী মাসুদ আহম্মেদ সূবর্ণ সীমান্তে প্রাণহানি বন্ধে দুই দেশের মধ্যে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
তেল-গ্যাস রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব মাহাবুব আলম রুবেল বলেন, সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, সীমান্তে প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের স্বজনদের আইনি সহায়তার আওতায় আনা উচিত।
ঠাকুরগাঁও লিগ্যাল এইড অফিসার ও সিনিয়র সহকারী জজ মজনু মিয়া বলেন, সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের কেউ এখনো ন্যায়বিচারের জন্য লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করেননি। তবে কোনো ভুক্তভোগী পরিবার যোগাযোগ করলে বিনা খরচে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
তিনি বলেন, বিচার চাওয়া একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। মামলা করার প্রয়োজন হলে ভুক্তভোগী পরিবারকে সে ক্ষেত্রেও সহযোগিতা করা হবে।
অন্যদিকে ঠাকুরগাঁও ৫০ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আখলাকুর রহমান বলেন, সীমান্তে প্রাণহানির অন্যতম কারণ হলো সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা। মানুষ সীমান্ত না পেরোলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার ঝুঁকি কমে।
তিনি জানান, সীমান্তসংলগ্ন বাসিন্দাদের নিয়মিত সচেতন করা হচ্ছে। স্থানীয় ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদেরও সচেতনতামূলক কার্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছে। মানুষ আইন মেনে চললে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করলে সীমান্ত পরিস্থিতি আরও শান্ত রাখা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিজিবির এই কর্মকর্তা জানান, রংপুর রিজিয়নের অধীনে চারটি সেক্টর ও ১৫টি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বে প্রায় ১ হাজার ৬৬০ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ঠাকুরগাঁও সীমান্তের দৈর্ঘ্য ১০৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার। মানব পাচার ও মাদক প্রতিরোধের পাশাপাশি সীমান্তে প্রাণহানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে বিজিবি কাজ করছে বলে জানান তিনি।
Muktomon/TA