এআই যুগে ইন্টারনেট শাসন: নারী সংসদ সদস্যদের কণ্ঠ কেন গুরুত্বপূর্ণ

এআই যুগে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও নারী সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ
এআই যুগে ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ও নারী সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণ

এ এইচ এম বজলুর রহমান :  দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর

ইন্টারনেট এখন আর শুধু যোগাযোগের প্রযুক্তি নয়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, ব্যাংকিং, সরকারি সেবা, সংবাদ, মতপ্রকাশ, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে শুরু করে একজন মানুষের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা পর্যন্ত জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এর প্রভাব রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এই পরিবর্তনকে আরও গভীর ও দ্রুত করছে।

ফলে আজকের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কেবল ‘কে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে’ নয়। প্রশ্ন হলো, ইন্টারনেট ও এআই কীভাবে পরিচালিত হবে, কার স্বার্থ ও অধিকার নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলে কারা উপস্থিত থাকবে।

এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১৪ থেকে ১৮ ডিসেম্বর ২০২৬ কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের ২১তম Internet Governance Forum বা IGF। এবারের মূল প্রতিপাদ্য, “Governing the Internet in the Age of Intelligence: Our Shared Responsibility”। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ IGF-কে স্থায়ী জাতিসংঘ ফোরামের মর্যাদা দেওয়ার পর এটিই প্রথম বার্ষিক IGF।

IGF-এর বিশেষত্ব হলো, এটি শুধু সরকারের সম্মেলন নয়। সরকার, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজ, প্রযুক্তি কোম্পানি, গবেষক, গণমাধ্যম, প্রযুক্তিবিদ ও তরুণেরা এখানে একই পরিসরে ইন্টারনেট-সম্পর্কিত জননীতির প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করেন। এর সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল নীতির ধারণা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে এটি কাজ করে।

নারীর কণ্ঠ কেন আলাদা গুরুত্ব বহন করে
ইন্টারনেটের নীতি যদি নারী-পুরুষসহ সবার জন্য হয়, তবে সেই নীতি তৈরির আলোচনাতেও নারীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির কার্যকর উপস্থিতি প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বর্তমানে নারী সদস্যের হার ১৬.৩৮ শতাংশ। Inter-Parliamentary Union বা IPU-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনের পর সাধারণ আসনে নারী সদস্য ছিলেন ৭ জন; পরবর্তী সময়ে সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের অন্তর্ভুক্তির পর মোট নারী সংসদ সদস্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৫৭।

এই সংখ্যা শুধু রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের বিষয় নয়। ডিজিটাল নীতি তৈরির ক্ষেত্রেও এর তাৎপর্য আছে। কারণ প্রযুক্তি নারী ও পুরুষকে সব সময় একইভাবে প্রভাবিত করে না।

ডিজিটাল বৈষম্য এখনো বাস্তব
আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে ৭৭ শতাংশ পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, নারীদের ক্ষেত্রে তা ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে পুরুষ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা নারীর তুলনায় প্রায় ২৮ কোটি বেশি। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে নারী-পুরুষ ডিজিটাল সমতাও এখনো অর্জিত হয়নি।

বাংলাদেশে সমস্যা আরও বহুস্তরীয়।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ICT Access and Use by Households and Individuals Survey 2024-25 দেখাচ্ছে, নারীর ডিজিটাল প্রবেশাধিকারে অঞ্চলভেদে বড় পার্থক্য রয়েছে। নারীদের মোবাইল ফোন মালিকানা ঢাকায় প্রায় ৬৬ শতাংশ, চট্টগ্রামে ৬৪ শতাংশ, খুলনায় ৬০ শতাংশ হলেও ময়মনসিংহে তা প্রায় ৫১ শতাংশ। স্মার্টফোন মালিকানার ক্ষেত্রেও বড় ব্যবধান রয়েছে।

তাই ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তিকে শুধু মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সংযোগের হিসাবে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। নিজস্ব ডিভাইস, সাশ্রয়ী সংযোগ, ডিজিটাল দক্ষতা, নিরাপত্তা এবং নিজের সিদ্ধান্তে প্রযুক্তি ব্যবহারের সক্ষমতা, সবকিছুকেই বিবেচনায় নিতে হবে।

এআই যুগে নারীর জন্য নতুন ঝুঁকি
এআই নতুন সুযোগ তৈরি করছে, কিন্তু একই সঙ্গে নতুন ধরনের ঝুঁকিও সামনে আনছে।

ডিপফেক, সম্মতি ছাড়া ছবি পরিবর্তন, পরিচয় জালিয়াতি, অনলাইন হয়রানি, অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত, ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার এবং প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা এখন ইন্টারনেট গভর্ন্যান্সের কেন্দ্রীয় বিষয়।

এই সমস্যা কেবল প্রযুক্তিগত নয়। এটি মানবাধিকার, নারীর নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণের প্রশ্ন।

অনলাইন সহিংসতার কারণে একজন নারী সাংবাদিক যদি নিজের মত প্রকাশ থেকে সরে আসেন, একজন তরুণী যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধ করেন কিংবা একজন নারী জনপ্রতিনিধি যদি সংগঠিত ডিজিটাল হয়রানির কারণে জনপরিসরে কথা বলতে দ্বিধাবোধ করেন, তখন ডিজিটাল প্রযুক্তির সুযোগ সবার জন্য সমান থাকে না।

নাইরোবিতে বাংলাদেশের নারী সংসদ সদস্যদের সামনে পাঁচটি প্রশ্ন
বাংলাদেশের নারী সংসদ সদস্যদের IGF-এ অংশগ্রহণ তাই শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে প্রতিনিধিত্বের বিষয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা শেখা এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা বিশ্বপরিসরে তুলে ধরার সুযোগ।

বিশেষ করে পাঁচটি বিষয় আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।

প্রথমত, নারীর সাশ্রয়ী ও স্বাধীন ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের সুযোগ কীভাবে বাড়ানো যায়।

দ্বিতীয়ত , Technology-Facilitated Gender-Based Violence বা প্রযুক্তি-সহায়ক লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে সরকার, প্রযুক্তি কোম্পানি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও নাগরিক সমাজের দায়িত্ব কী হবে।

তৃতীয়ত , এআই ও অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থায় নারীর প্রতি বৈষম্য ঠেকাতে কী ধরনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।

চতুর্থত , ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার অধিকার কীভাবে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত করা যায়।

পঞ্চমত , গ্রামীণ নারী, তরুণী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতি ও এআই-নির্ভর সমাজে অংশগ্রহণের জন্য কীভাবে প্রস্তুত করা যায়।

IGF থেকে সংসদে
আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করে সেখানে অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশে ফিরে কতটা কাজে লাগানো যায় তার ওপর।

IGF-এ অংশ নেওয়া সংসদ সদস্যরা দেশে ফিরে সংসদীয় কমিটি, সরকারি প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রযুক্তি খাত, গণমাধ্যম, নারী সংগঠন ও তরুণদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগ করতে পারেন। নিয়মিত জাতীয় Internet Governance সংলাপ এবং সংসদীয় পর্যায়ে ডিজিটাল ও এআই নীতি নিয়ে আরও কাঠামোবদ্ধ আলোচনা এই সংযোগকে শক্তিশালী করতে পারে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, মানুষের।
“Our Shared Responsibility” আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইন্টারনেট ও এআইয়ের ভবিষ্যৎ শুধু প্রযুক্তিবিদ কিংবা প্রযুক্তি কোম্পানির হাতে ছেড়ে দেওয়ার বিষয় নয়। রাষ্ট্র, সংসদ, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং নাগরিক সবারই এখানে দায়িত্ব রয়েছে।

আর একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে নারীদের শুধু প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে দেখলে চলবে না। ইন্টারনেট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে শাসিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের টেবিলেও নারীদের অর্থবহ ও কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।

Muktomon/TA