চীনের নতুন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র, ঝুঁকিতে দূরপাল্লার মার্কিন বিমান

চীনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রতীকী ছবি।
চীনের হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার সামরিক প্রযুক্তি নিয়ে প্রতীকী ছবি।

মুক্তমন রিপোর্টার : চীন এমন একটি নতুন হাইপারসনিক অস্ত্র তৈরি করেছে, যা দেশটির উৎক্ষেপণস্থল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা উচ্চমূল্যের সামরিক উড়োজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হতে পারে। মঙ্গলবার চীনা সূত্রের বরাত দিয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ এ তথ্য জানিয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনের নতুন প্রযুক্তির মধ্যে এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (HGV) রয়েছে, যা আকাশে থাকা কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান, আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার এবং আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণকারী উড়োজাহাজের মতো গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, চীনা সামরিক বাহিনী কয়েকটি হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে আকাশ থেকে আকাশে লক্ষ্যভেদের প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। পাশাপাশি কিছু নতুন ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও সংযোজন করা হয়েছে।

হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল এমন একটি ওয়ারহেড, যা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উৎক্ষেপণের পর বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত উচ্চ গতিতে চলতে পারে এবং উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে সক্ষম। এই কৌশলের কারণে প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অস্ত্রটিকে শনাক্ত ও প্রতিহত করা তুলনামূলকভাবে কঠিন হতে পারে।

চীনের DF-17 ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য একটি HGV-এর পাল্লা প্রায় ২,৪০০ কিলোমিটার বলে বিভিন্ন সামরিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে DF-27-এর সম্ভাব্য পাল্লা প্রায় ৮,০০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। এসব সক্ষমতা পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও সম্পদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।

তবে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে চলমান উড়োজাহাজকে আঘাত করা অত্যন্ত জটিল। লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান ও গতিপথ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ করে তা ক্ষেপণাস্ত্রের কাছে পৌঁছে দিতে হয়। সামরিক পরিভাষায় এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে ‘কিল চেইন’ বলা হয়। দীর্ঘ কিল চেইন প্রতিপক্ষের বাধা বা ইলেকট্রনিক হস্তক্ষেপের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অস্ত্রের ব্যবহার ঘিরে আরেকটি উদ্বেগ হলো ভুল সংকেত বা ভুল ব্যাখ্যার সম্ভাবনা। বিশেষ করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের সময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ প্রতিপক্ষের কাছে ভিন্ন ধরনের হামলার ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

মার্কিন সামরিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার সামরিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়িয়েছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ চীনের কাছে ৩ হাজারের বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং কয়েকশ স্থলভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।

চীনের সামরিক আধুনিকায়নের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে প্রতিপক্ষের সামরিক অবকাঠামোর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে একই সময়ে চাপ সৃষ্টি করার সক্ষমতা অর্জনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে বলে মার্কিন সামরিক গবেষণায় উঠে এসেছে।

চীনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রও আকাশ প্রতিরক্ষা ও দূরপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নে জোর দিচ্ছে।

মার্কিন অস্ত্রভাণ্ডারে SM-6-ভিত্তিক AIM-174B-এর মতো ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের দীর্ঘপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র নিয়েও কাজ চলছে। AIM-260-এর মতো প্রকল্পগুলোও ভবিষ্যতের বিমানযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও দূরপাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা উন্নয়ন করা হচ্ছে। ফলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের সামরিক কৌশল ও আকাশযুদ্ধের ধরনকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে।