তাইওয়ানের আশপাশে চীনা জাহাজের রেকর্ড উপস্থিতি

তাইওয়ানের উপকূলীয় জলসীমায় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ
তাইওয়ানের উপকূলীয় জলসীমায় নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ

মুক্তমন রিপোর্টার : তাইওয়ানকে ঘিরে সামরিক ও কৌশলগত চাপ আরও বাড়াচ্ছে চীন। গত জুলাই মাসে তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় চীনের সরকারি জাহাজের উপস্থিতি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড।

তাইওয়ানের কোস্ট গার্ডের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে চীনের কোস্ট গার্ড, বৈজ্ঞানিক গবেষণা সংস্থা ও অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের জাহাজ মিলিয়ে মোট ২৪৪টি উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। গত বছরের একই মাসের তুলনায় এই সংখ্যা চার গুণেরও বেশি। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন প্রায় আটটি চীনা সরকারি জাহাজ তাইওয়ানের আশপাশের জলসীমায় দেখা গেছে।

তবে এই হিসাবে তাইওয়ানের উপকূলীয় দ্বীপ কিনমেন, মাতসু ও প্রাতাসের আশপাশের জলসীমায় থাকা চীনা জাহাজগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এসব এলাকাসহ হিসাব করলে জুলাইয়ে চীনা সরকারি জাহাজের উপস্থিতি ৪২৫টিতে দাঁড়ায়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ২৩৩।

তাইওয়ানের আশপাশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজের উপস্থিতি এই হিসাবের মধ্যে রাখা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW) জানিয়েছে, চীন তাইওয়ানকে ঘিরে জলসীমায় ধীরে ধীরে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে চীনা কর্তৃপক্ষ বিতর্কিত জলসীমায় বিদেশি জাহাজগুলো তাদের নির্দেশ মানে কি না, সেটিও পরীক্ষা করতে পারে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাইওয়ানের এক কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, চীনের সাম্প্রতিক তৎপরতা ভবিষ্যতে তাইওয়ানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করার প্রস্তুতির অংশ হতে পারে।

তিনি বলেন, পরিস্থিতি অবরোধের পর্যায়ে গেলে সেটি কার্যত যুদ্ধের কাছাকাছি একটি পরিস্থিতি তৈরি করবে। সে ক্ষেত্রে তাইওয়ানের জীবনরেখা হিসেবে বিবেচিত সমুদ্রপথ সুরক্ষায় নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

তাইওয়ান বর্তমানে স্বশাসিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পরিচালনা করলেও চীন দ্বীপটিকে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে আসছে। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কথাও জানিয়েছে বেইজিং।

চীনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা (MSA)-এর জাহাজগুলোর তৎপরতাও সম্প্রতি নজরে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি সামরিক বাহিনীর অংশ নয়; তবে এর জাহাজগুলো আইন প্রয়োগ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস প্রশান্ত মহাসাগরে তাইওয়ানের পূর্বদিকে এসব জাহাজের চলাচলকে আইনি ও রাজনৈতিক অর্থে ‘সার্বভৌমত্বের ঘোষণা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, চীনা আইন প্রয়োগকারী জাহাজগুলো ওই এলাকায় চলাচলকারী জাহাজকে রেডিও বার্তার মাধ্যমে প্রশ্ন করছে।

তাইওয়ানের এক কর্মকর্তা জানান, চীনা কোস্ট গার্ড এখনো তাইওয়ান ঘিরে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে উঠে তল্লাশি চালায়নি। তবে তারা জাহাজগুলোর কাছে বন্দর থেকে প্রবেশ ও বের হওয়ার তথ্য জানতে চাইছে। এর ফলে ওই জলসীমার ওপর বেইজিংয়ের আইনগত কর্তৃত্ব রয়েছে—এমন একটি ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।

তাইওয়ানের কর্মকর্তার দাবি, এসব রেডিও বার্তা ইতোমধ্যেই বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর চাপ তৈরি করছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো জাহাজকে গতিপথ পরিবর্তন করতে হয়নি।

ISW-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চীন সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়ের পরিস্থিতিকেও ব্যবহার করে MSA-এর মাধ্যমে জাহাজ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা পরীক্ষা করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড চীনের ‘গ্রে-জোন’ কৌশলের অংশ। অর্থাৎ সরাসরি যুদ্ধ শুরু না করেই সামরিক, আইনগত, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

ISW-এর মতে, যুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ানের চারপাশে যতটা সম্ভব কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে চীন। এতে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি দেশটির সম্পদ ও নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

চীনের বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে তাইওয়ানের পার্লামেন্ট বৃহস্পতিবার আগামী ছয় বছরে মানববিহীন প্রযুক্তি ও ড্রোন ব্যবস্থায় ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয়ের একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে।

পরিকল্পনায় আকাশ, সমুদ্র ও পানির নিচে পরিচালনাযোগ্য বিভিন্ন ধরনের মানববিহীন যান বা ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ইউক্রেন ও ইরানের সাম্প্রতিক সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে চীনের সম্ভাব্য হামলা ঠেকাতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশীয় ড্রোন শিল্পকে শক্তিশালী করাই এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

তাইওয়ান ইতোমধ্যে ড্রোন উৎপাদন বাড়াতে দেশব্যাপী উদ্যোগ নিয়েছে এবং বৈশ্বিক ড্রোন উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সরকারি বাণিজ্য পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই তাইওয়ান থেকে রপ্তানি হওয়া ড্রোনের মোট মূল্য ২০২৫ সালের পুরো বছরের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ গুণ বেশি হয়েছে।

চীনের ক্রমবর্ধমান সামুদ্রিক তৎপরতা ও তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে তাইওয়ান প্রণালিকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।