স্পেনের প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেজ
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেজ

মুক্তমন রিপোর্টার : দুর্নীতির এক মামলায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের স্ত্রী বেগোনিয়া গোমেজকে বিচারের মুখোমুখি করার নির্দেশ দিয়েছেন দেশটির এক বিচারক। একই সঙ্গে তার পাসপোর্ট জমা দিতে এবং দেশের বাইরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। তাকে মাসে দুইবার আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

শনিবার বিচারক হুয়ান কার্লোস পেইনাদো এই নির্দেশ দেন। এর আগে গোমেজের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, প্রভাব খাটানো, ব্যবসায়িক অনিয়ম এবং তহবিলের অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি মাদ্রিদের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজের পেশাগত অবস্থান এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

তবে গোমেজ ও প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ দুজনই কোনো ধরনের অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সানচেজ এর আগে মামলাটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ‘অশোভন প্রহসন’ বলে সমালোচনা করেছিলেন।

২০২৪ সালে গোমেজের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ডানপন্থী রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন ‘মানোস লিম্পিয়াস’ তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগে মামলা করে। ওই সময় সানচেজ কয়েক দিনের জন্য সরকারি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে ভাবার কথা জানিয়েছিলেন।

বিচারকের সর্বশেষ আদেশের পর স্পেনের বিচারমন্ত্রী ফেলিক্স বোলানোস বলেন, ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী মানুষের জন্য এটি একটি ভয়াবহ দিন। তবে শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে গোমেজের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই পদক্ষেপ অতিরিক্ত কঠোর। কারণ গোমেজ ইতোমধ্যে পুলিশি নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছেন। বিচারক অবশ্য আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, তার নিরাপত্তা দলও তাকে দেশ ছাড়তে সহায়তা করতে পারে।

স্পেনের প্রভাবশালী দৈনিক এল পাইস এক সম্পাদকীয়তে তদন্তের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। পত্রিকাটির মতে, পুরো তদন্তে অতিরিক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণের প্রবণতা রয়েছে। একই সঙ্গে বিচার ব্যবস্থার কাছ থেকে নাগরিকেরা যে নিরপেক্ষতা ও সংযম আশা করেন, তদন্তে তা যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে মন্তব্য করেছে পত্রিকাটি।

গোমেজের মামলাটি প্রধানমন্ত্রী সানচেজের ঘনিষ্ঠ মহলে চলমান একাধিক তদন্তের সর্বশেষ ঘটনা। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন স্প্যানিশ সোশ্যালিস্ট ওয়ার্কার্স পার্টি (PSOE)-এর মাদ্রিদ সদর দপ্তরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করেছে।

সানচেজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাবেক সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী হোসে লুইস রদ্রিগেস সাপাতেরোর বিরুদ্ধেও সংগঠিত অপরাধ, প্রভাব খাটানো ও নথি জালিয়াতির অভিযোগে তদন্ত চলছে। একটি ছোট এয়ারলাইনকে ঋণ দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই তদন্ত শুরু হয়েছে। সাপাতেরো অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

সানচেজের সাবেক ঘনিষ্ঠ সহযোগী হোসে লুইস আবালোসের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় প্রায় ৬ কোটি ডলারের মাস্ক কেনাকাটায় ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে তার বিচার চলছে।

এ ছাড়া সানচেজের ভাই ডেভিড সানচেজও বর্তমানে একটি মামলায় বিচারাধীন। প্রায় নয় বছর আগে একটি পদে তার নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

তবে এসব কোনো মামলাতেই প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজকে অভিযুক্ত করা হয়নি। কিন্তু একের পর এক তদন্ত তার নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু জোট সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে।

দুর্নীতি তদন্তের পাশাপাশি রাজনৈতিকভাবেও চাপে রয়েছেন সানচেজ। প্রধান বিরোধী দল পিপলস পার্টির (PP) নেতা আলবের্তো নুনিয়েস ফেইহো তার পদত্যাগ দাবি করেছেন। তিনি সানচেজ সরকারের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মৃত্যুর শেষ পর্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

স্পেনে পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন আগামী বছরের আগস্টের মধ্যে হওয়ার কথা। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করছেন, তার আগেই সানচেজের জোট সরকার ভেঙে পড়তে পারে।

জোটের একটি ছোট বাস্ক দল ইতোমধ্যে সরকার টিকিয়ে রাখা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে বামপন্থী সুমার দল জানিয়েছে, দলীয় অর্থ অবৈধভাবে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেলে তারা তা মেনে নেবে না।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, এখন নির্বাচন হলে পিপি সবচেয়ে বেশি আসন পেতে পারে এবং উগ্র ডানপন্থী ভক্সের সঙ্গে জোট করে সরকার গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে স্পেনের রাজনৈতিক কাঠামো সানচেজকে কিছুটা সুবিধা দিচ্ছে। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদ বিকল্প প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন না করা পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে সরানো যায় না। দেশটির পার্লামেন্টে বিভিন্ন দলের অবস্থানও বিভক্ত। বিশেষ করে কাতালান ও বাস্ক বিচ্ছিন্নতাবাদী দলগুলোর সঙ্গে পিপির সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরী।

ফলে একের পর এক দুর্নীতি তদন্তের চাপের মধ্যেও সানচেজ সরকার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে এসব মামলার পরবর্তী অগ্রগতি এবং জোটের স্থায়িত্বের ওপর।