মুক্তমন রিপোর্টার : ভারতে মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের অভিযোগে টানা বিক্ষোভের মুখে শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। শনিবার (২৫ জুলাই) তিনি পদত্যাগের ঘোষণা দেন। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণ আন্দোলন করে আসছিলেন। পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগের পাশাপাশি পরীক্ষাব্যবস্থায় সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবিতে এই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিল তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভারতের মর্যাদাপূর্ণ মেডিকেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করে বিক্রি করা হয়েছিল। এর ফলে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের পর আন্দোলনকারী সংগঠনটি দেশব্যাপী চলমান বিক্ষোভ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, সরকার তাদের কয়েকটি দাবি মেনে নিয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার ফল বাতিলের পর আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা এবং সংগঠনটির প্রস্তাবিত পাঁচ দফা পরীক্ষা সংস্কার পরিকল্পনা পর্যালোচনা। এসব বিষয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার কথাও জানানো হয়েছে।
CJP-এর প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করলেও তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে আরও কাজ বাকি রয়েছে।
এদিকে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) জাতীয় সভাপতি নিতিন নবীন ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের সিদ্ধান্তকে জনজীবনে সততা ও আত্মত্যাগের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি দলীয়ভাবে ধর্মেন্দ্র প্রধানের সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
চলতি বছরের মে মাসে অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে CJP-এর যাত্রা শুরু হলেও পরে এটি বড় ধরনের যুব আন্দোলনে রূপ নেয়। ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির নাম ‘ককরোচ’ রাখা হয় বলে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
পরবর্তীতে প্রশ্নফাঁস, বেকারত্ব ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনটি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদেরও একটি অংশ এতে যুক্ত হয়।
আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য ভর্তি প্রক্রিয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন।
বিক্ষোভ ঘিরে চলতি সপ্তাহে নয়াদিল্লিতে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষও হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে। এতে আন্দোলন নিয়ে দেশজুড়ে আরও আলোচনা তৈরি হয়।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি শুরুতে আন্দোলন নিয়ে প্রকাশ্যে খুব বেশি মন্তব্য না করলেও বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়ীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবর্ষ যাতে নষ্ট না হয়, সেটিই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
ভারতে তরুণদের বেকারত্বও আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি। দেশটিতে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা ৩৬ কোটির বেশি। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ২৫ বছর বা তার কম বয়সী স্নাতকদের একটি বড় অংশের বেকার থাকার তথ্য উঠে এসেছে।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগকে তাই শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভারতের তরুণদের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মুখে সরকারের জন্য একটি বড় রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।