হিমালয়ে অবকাঠামো নির্মাণ বাড়ছে, বাড়ছে দুর্যোগের ঝুঁকি

 নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও কাদায় ঢেকে যাওয়া এলাকা
নেপালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও কাদায় ঢেকে যাওয়া এলাকা

মুক্তমন রিপোর্টার : হিমালয় অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। এর মধ্যেই চীন, ভারত ও নেপালসহ আশপাশের দেশগুলো পাহাড়ি এই এলাকায় দ্রুতগতিতে বাঁধ, সড়ক, সেতু, সুড়ঙ্গ, রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ করছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে এই উন্নয়ন কতটা নিরাপদ ও টেকসই?

চীন-নেপাল সীমান্তবর্তী এলাকায় সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় ৬০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। বুধবার একটি হিমবাহের অংশ ভেঙে পাহাড়ধসের সৃষ্টি হলে প্রবল পানির স্রোত নেমে আসে। এতে বসতবাড়ি, সড়ক, সেতু, গ্রাম এবং জলবিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তবে সর্বশেষ এই দুর্যোগ সরাসরি মানবসৃষ্ট অবকাঠামো নির্মাণের কারণে ঘটেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ঘটনাটি হিমালয়ের মতো ভূমিকম্পপ্রবণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নতুন করে সতর্ক হওয়ার বার্তা দিচ্ছে।

হিমালয় অঞ্চল ভূমিকম্প, ভূমিধস, আকস্মিক বন্যা ও হিমবাহসংক্রান্ত দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অঞ্চলের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর নির্ভর করে ভারতীয় উপমহাদেশের কোটি কোটি মানুষের জীবন ও জীবিকা।

তারপরও বিপুল জলবিদ্যুৎ সম্ভাবনার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের নদীগুলোকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে আসছে বিভিন্ন দেশ।

চীন বর্তমানে হিমালয়ে অবকাঠামো নির্মাণে সবচেয়ে বড় উদ্যোগ নিয়েছে। তিব্বত ও হিমালয়সংলগ্ন এলাকাকে দেশটির জ্বালানি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে বেইজিং। সেখানে বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, সড়ক ও সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে।

তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর ওপর চীন যে বিশাল বাঁধ নির্মাণ করছে, সেটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হতে যাচ্ছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।

চীনের পাশাপাশি ভারতও হিমালয়ে বড় ধরনের জলবিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামো নির্মাণ করছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একটি বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রতিষ্ঠান চীনের প্রকল্পের ভাটিতে প্রায় ১১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারত পাহাড়ি এলাকায় নতুন সুড়ঙ্গ ও রেলপথ নির্মাণও বাড়িয়েছে। এসব অবকাঠামো বাণিজ্যিক যোগাযোগের পাশাপাশি দুর্গম সীমান্তে সেনা ও অন্যান্য সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছাতেও সহায়ক হতে পারে।

নেপালও হিমালয়ের নদীগুলোকে কেন্দ্র করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়াচ্ছে। এ ক্ষেত্রে চীন ও ভারতের অর্থায়ন ও সহযোগিতাও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। পাহাড় কেটে সড়ক বা সুড়ঙ্গ নির্মাণ, বিস্ফোরক ব্যবহার, প্রাকৃতিক ভূমির ওপর কংক্রিটের কাঠামো তৈরি এবং বিশাল জলাধারে পানি সংরক্ষণের মতো কর্মকাণ্ডের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরি হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ গলে যাওয়া, হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা, ভূমিধস ও পাথর-মাটির প্রবাহের মতো ঘটনা আরও অনিয়মিত ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

যুক্তরাষ্ট্রের স্টিমসন সেন্টারের জ্বালানি, পানি ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ ফেলো অস্টিন লর্ড বলেন, একসময় যেসব বন্যাকে ‘শতাব্দীর বন্যা’ বলা হতো, সেগুলো এখন পাঁচ থেকে দশ বছর পরপর দেখা যাচ্ছে। তার মতে, জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মানুষের নিরাপত্তার প্রচলিত ধারণা পরিবর্তনের সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। দেশটির জ্বালানি, পানি সম্পদ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার পানির ঢলে ১২টি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ৪৩০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বন্ধ হয়ে গেছে। নির্মাণাধীন আরও কয়েকটি প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যেগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৪৭০ মেগাওয়াট।

সাম্প্রতিক দুর্যোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চীনের একটি বাঁধ ভেঙে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে—এমন দাবি ছড়িয়ে পড়ে। তবে এ দাবির কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। নেপালে চীনা দূতাবাস এ ধরনের বক্তব্যকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উল্লেখ করেছে।

চীন ও নেপাল ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকায় তৈরি হওয়া একটি প্রতিবন্ধক হ্রদ পর্যবেক্ষণে যোগাযোগ করছে। ওই হ্রদ ভেঙে গেলে নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। দুর্গম অবস্থানের কারণে নেপাল সরাসরি সেখানে গিয়ে তাৎক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে পারছে না। দুই দেশের কর্তৃপক্ষ ও গবেষকদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান চলছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমালয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় ও যৌথ দুর্যোগ পর্যবেক্ষণব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর পানি প্রবাহ, হিমবাহের পরিবর্তন, হিমবাহ হ্রদ এবং ভূমিধসের ঝুঁকি সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য বিনিময় হলে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা আরও কার্যকর হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জলবায়ু ইতিহাসবিদ রুথ গ্যাম্বল মনে করেন, ভবিষ্যৎও বর্তমানের মতোই থাকবে—এমন ধারণা বিপজ্জনক। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছে, যার প্রকৃতি সম্পর্কে এখনো নিশ্চিতভাবে জানা সম্ভব নয়।

ফলে হিমালয়ে উন্নয়ন থামানোর পরিবর্তে প্রকৃতির পরিবর্তনশীল ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পের আকার, অবস্থান, নকশা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নতুন করে নির্ধারণ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।