বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কী প্রভাব ফেলবে?

বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক কী প্রভাব ফেলবে?

অর্থনীতি ডেস্ক : জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্য যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (কার্যকর হওয়ার দিন) রাত ১২টা থেকে এই শুল্ক কার্যকর হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে আলোচনা।

বাংলাদেশ সরকার বলছে, নতুন এই শুল্কে দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে বাজার, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কাঁচামাল আমদানিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।

সরকারের আশাবাদ

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশ চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকায় মার্কিন বাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী হতে পারে বলে সরকারের ধারণা।

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরও বলেছেন, এটি নতুন কোনো অতিরিক্ত শুল্ক নয়; বরং আগের শুল্ক ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে একই হার কার্যকর হয়েছে। ফলে বাস্তবে শুল্ক পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা

যদিও সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে পুরোপুরি একমত নন অর্থনীতিবিদরা।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, আপাতদৃষ্টিতে শুল্কের হার অপরিবর্তিত থাকলেও বাস্তবে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে শ্রমমান, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বাণিজ্যিক শর্তের উন্নতি না হলে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা কিছুটা কমতে পারে এবং বিদ্যমান দুর্বলতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

কোন দেশ কত শুল্ক দিচ্ছে?

বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানিকৃত পণ্যের প্রায় ৮৫ শতাংশই তৈরি পোশাক।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশসহ ১৭টি দেশের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। এই তালিকায় রয়েছে ভারত, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, কানাডা, যুক্তরাজ্যসহ আরও কয়েকটি দেশ।

অন্যদিকে চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক, ব্রাজিল, মিসরসহ ৩৮টি দেশের ওপর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করা হয়েছে।

রপ্তানিকারকদের মতামত

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, বাস্তবে বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ট্যারিফে কোনো পরিবর্তন হয়নি।

তার ভাষ্য, এতদিন ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর ছিল। এখন সেই মেয়াদ শেষ হওয়ায় সেকশন ৩০১-এর অধীনে একই ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়েছে। ফলে শতাংশের হিসেবে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।

কাঁচামাল আমদানিতে নতুন চ্যালেঞ্জ

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের কারখানায় জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ না থাকলেও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বড় অংশের কাঁচামাল চীন থেকে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতিতে যদি জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ থাকা উৎস থেকে আমদানি করা কাঁচামালের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।

বিজিএমইএও স্বীকার করেছে, কাঁচামাল আমদানির বিষয়টি ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

কীভাবে এলো নতুন শুল্ক?

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে এমন দেশগুলোর ওপর শুল্ক বাড়ানোর উদ্যোগ নেন।

২০২৫ সালে প্রথমে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক ঘোষণা করা হয়। পরে তা ধাপে ধাপে কমিয়ে ২০ শতাংশে আনা হয়।

এরপর বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)' স্বাক্ষরের পর শুল্ক ১৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হলেও পরে তা আদালতের সিদ্ধান্তে বাতিল হয়।

এরপর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রেড অ্যাক্টের সেকশন ১২২-এর আওতায় ১০ শতাংশ অস্থায়ী শুল্ক আরোপ করেন। সেই মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এখন সেকশন ৩০১-এর আওতায় একই হারে নতুন শুল্ক কার্যকর হয়েছে।

মোট শুল্ক কত দাঁড়াচ্ছে?

ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে আগে থেকেই গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ শুল্ক ছিল। এর সঙ্গে নতুন ১০ শতাংশ যোগ হওয়ায় এখন মোট কার্যকর শুল্ক দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৫ শতাংশ।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, ডিউটি ও ট্যারিফ মিলিয়ে অনেক বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের ক্ষেত্রে মোট শুল্কের পরিমাণ ২৬ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

সামনে কী?

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বড় ধাক্কা না লাগলেও দীর্ঘমেয়াদে শ্রমমান উন্নয়ন, সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং চীনের ওপর কাঁচামাল নির্ভরতা কমানো জরুরি হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি নতুন রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।