আন্তর্জাতিক ডেস্ক : দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। প্রায় এক মাস ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিল্লির যন্তর মন্তরে 'ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)'-এর নেতৃত্বে আন্দোলন চলছিল।
চিকিৎসা ভর্তি পরীক্ষা NEET-এর প্রশ্নফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দিল্লি, কলকাতাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, প্রশ্নফাঁসের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নিশ্চিত করা।
সরকার একাধিকবার আন্দোলন প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও আন্দোলনকারীরা অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। কংগ্রেসসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলও ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে।
শিক্ষাবিদ ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশন শুরু করেন। টানা ২৬ দিন অনশনের পর বৃহস্পতিবার রাতে তিনি তা ভঙ্গ করেন।
অবশেষে শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ প্রকাশিত এক বার্তায় ধর্মেন্দ্র প্রধান নিজের পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, যন্তর মন্তর ও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় নিয়ে, যাতে কোনো রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, দেশের ঐক্য অটুট থাকে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ আইনি জটিলতায় না পড়ে—সে লক্ষ্যেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর আন্দোলনের অন্যতম নেতা অভিজিৎ দীপক দাবি করেন, এটি আন্দোলনের বিজয় এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শক্তির প্রমাণ।
পদত্যাগপত্রে যা লিখেছেন ধর্মেন্দ্র প্রধান
এক্সে প্রকাশিত পদত্যাগপত্রে ধর্মেন্দ্র প্রধান বলেন, NEET প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পর প্রথম দিন থেকেই তিনি নৈতিক দায়িত্ব স্বীকার করেছেন এবং কখনও দায় এড়িয়ে যাননি।
তিনি দাবি করেন, মেধাবী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং পরীক্ষা মাফিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই ছিল তার অঙ্গীকার। তবে এ সময় কিছু দায়িত্বশীল ব্যক্তি পরিস্থিতি বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
রাহুল গান্ধীর বক্তব্য
পদত্যাগের আগে লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দাবি করেছিলেন, সরকার শিক্ষামন্ত্রীকে অন্য মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তরের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
তিনি বলেন, ভারতের শিক্ষার্থীরা শুধু মন্ত্রণালয় পরিবর্তন নয়, বরং ধর্মেন্দ্র প্রধানের অপসারণ চায়। শিক্ষার্থীরাই ভারতের ভবিষ্যৎ এবং সেই ভবিষ্যতের দাবিকে উপেক্ষা করা যাবে না।
নতুন কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
সরকারের সঙ্গে তৃতীয় দফা বৈঠকের আগেই আন্দোলনকারীরা জানিয়ে দেন, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ তাদের অ-আলোচনাযোগ্য (Non-negotiable) দাবি।
তারা সতর্ক করে বলেন, দাবি পূরণ না হলে দেশব্যাপী আরও বড় আন্দোলনের ডাক দেওয়া হবে।
কীভাবে আন্দোলন তীব্র হয়
গত ১৮ জুলাই আন্দোলন নতুন মোড় নেয়, যখন অনশনরত সোনম ওয়াংচুককে দিল্লি পুলিশ সরিয়ে সফদরজং হাসপাতালে ভর্তি করে।
এরপর যন্তর মন্তরে শিক্ষার্থী ও তরুণদের সমাগম বাড়তে থাকে। ২০ জুলাই সংসদ অভিমুখে মিছিলের সময় পুলিশের বাধা ও লাঠিচার্জের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
এরপর শুধু শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ নয়, আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগের ঘটনায় দায়ী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হয়।
ধর্মেন্দ্র প্রধান কে?
ধর্মেন্দ্র প্রধান ২০২১ সালে ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি)-এর মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
পরবর্তীতে তিনি ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার সভাপতি, বিজেপির জাতীয় সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৪ সালে প্রথমবার লোকসভায় নির্বাচিত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। ২০২৪ সালে ওডিশার সম্বলপুর লোকসভা আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত হয়ে লোকসভায় ফিরে আসেন।