বাংলাদেশের বন্যা, ইউরোপের দাবদাহ—এল নিনোর প্রভাবে চরম আবহাওয়ার কবলে বিশ্ব

বাংলাদেশের বন্যা, ইউরোপের দাবদাহ—এল নিনোর প্রভাবে চরম আবহাওয়ার কবলে বিশ্ব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কোথাও টানা ভারী বৃষ্টিতে বন্যা ও ভূমিধস, কোথাও শক্তিশালী টাইফুন, আবার কোথাও রেকর্ড তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত জনজীবন। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ—একাধিক অঞ্চলে একই সময়ে দেখা দেওয়া এসব চরম আবহাওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে এল নিনো

জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) সতর্ক করেছে, চলমান এল নিনোর প্রভাব আগামী মাসগুলোতে আরও তীব্র হতে পারে। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, অতিবৃষ্টি, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশে বন্যা ও ভূমিধসে ৪৪ জনের মৃত্যু

বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১১ জুলাই পর্যন্ত দেশের সাতটি জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ—বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।

এসব জেলার ৫৮টি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসে এখন পর্যন্ত ৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ৩৯ জন। প্রায় ২ লাখ ৬৮ হাজার পরিবার পানিবন্দি এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে।

গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে, যা পরে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

ভারতে বৃষ্টি, ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যা

ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, জম্মু-কাশ্মীর, ত্রিপুরা, মিজোরাম ও পশ্চিমবঙ্গে ভারী বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

হিমাচল প্রদেশে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে, বহু এলাকায় ভূমিধস দেখা দিয়েছে। উত্তরাখণ্ডে শতাধিক সড়ক বন্ধ রয়েছে এবং গঙ্গা-যমুনাসহ বিভিন্ন নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। জম্মু-কাশ্মীরে আকস্মিক বন্যায় বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

ত্রিপুরায় বন্যায় চার হাজারের বেশি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায় ১১ হাজার মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। ভারতের আবহাওয়া বিভাগ আগামী কয়েক দিন উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আরও ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।

চীন, জাপান ও তাইওয়ানে টাইফুনের তাণ্ডব

শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’ জাপান ও তাইওয়ান অতিক্রম করে চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশে আঘাত হেনেছে।

ঝড়ের আগে চীনে ১৭ লাখের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাইওয়ানে ভূমিধসের আশঙ্কায় ১০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে। বাতিল হয়েছে এক হাজারের বেশি ফ্লাইট এবং দেড় লাখের বেশি পরিবার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

জাপানের ওকিনাওয়াতেও হাজারো পরিবার বিদ্যুৎহীন রয়েছে এবং শত শত ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এর আগে ফিলিপাইনে টাইফুনের প্রভাবে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পাকিস্তানে জারি সতর্কতা

ভারী মৌসুমি বৃষ্টির কারণে পাকিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে বন্যা, আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের সতর্কতা জারি করেছে।

পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধস এবং নিচু এলাকায় নগর বন্যার আশঙ্কা থাকায় প্রশাসনকে উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ইউরোপে রেকর্ড তাপপ্রবাহ

অন্যদিকে ইউরোপে তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থা কোপার্নিকাস জানিয়েছে, চলতি বছরের জুন মাস ছিল পশ্চিম ইউরোপের ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ জুন।

ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে তাপপ্রবাহে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। জার্মানির রবার্ট কখ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে তাপজনিত কারণে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘হিট ডোম’ বা শক্তিশালী উচ্চচাপ বলয়ের কারণে এবারের তাপপ্রবাহ আরও তীব্র হয়েছে।

এল নিনো নিয়ে ডব্লিউএমওর সতর্কতা

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো বলেছেন, এল নিনো পরিস্থিতি ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এর প্রভাব সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।

তিনি বলেন, আগাম আবহাওয়ার পূর্বাভাস, কার্যকর সতর্কতা ব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এল নিনোর প্রভাব এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মিলিত প্রভাবে আগামী কয়েক মাসেও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি অব্যাহত থাকতে পারে। তাই জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগাম প্রস্তুতি এবং জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।