বন্যায় বিপর্যস্ত ১১ লাখের বেশি মানুষ, জরুরি সহায়তা বাড়াচ্ছে অক্সফাম

Photo : Oxfam
Photo : Oxfam

নিজস্ব প্রতিবেদক: টানা মৌসুমি বৃষ্টি, উজানের ঢল, জলাবদ্ধতা ও ভূমিধসের কারণে সৃষ্ট বন্যায় বাংলাদেশে ১১ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম অঞ্চল। একই সঙ্গে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলোতেও বন্যা ও ভূমিধসের কারণে মানবিক সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম ইন বাংলাদেশ এ তথ্য জানায়।

অক্সফামের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর অনিল পান্ত বলেন, এটি একই সঙ্গে দুটি ভিন্ন প্রেক্ষাপটে চলমান একটি মানবিক সংকট। চট্টগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে মানুষ ঘরবাড়ি, জীবিকা, নিরাপদ খাবার পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা হারিয়েছে। অন্যদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পাহাড়ি ঢালে বসবাসকারী মানুষের জন্য ভূমিধস ও বন্যার ঝুঁকি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ জুলাই থেকে শুরু হওয়া বন্যায় এখন পর্যন্ত ১০টি জেলার ১১ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব জেলার মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। দুর্যোগে এ পর্যন্ত ৫৩ জনের মৃত্যু এবং ৩৯ জন আহত হয়েছেন।

বন্যায় হাজারো ঘরবাড়ি, সড়ক, বাঁধ, কৃষিজমি, মাছের ঘের, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নিরাপদ পানির উৎস ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্তত ৩ হাজার ৫০০টি পানির উৎস এবং ১২ হাজার ৪০০টি ল্যাট্রিন নষ্ট হওয়ায় পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বেড়েছে। অনেক পরিবার এখনও পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে এবং শুকনো জায়গা ও জ্বালানির অভাবে রান্না করতে পারছে না।

চট্টগ্রামের সাতকানিয়ার বন্যাকবলিত বাসিন্দা আক্কাস আলী বলেন, আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খাদ্য, বিছানাপত্র ও রান্নার সামগ্রী রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে নিরাপদ খাবার পানি, খাদ্য এবং ঘর মেরামতের সহায়তা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

অন্যদিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে ১৬৪টি ভূমিধস ও ৪২টি বন্যার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৫ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। প্রায় ৯ হাজার ৭০০ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং প্রায় ৪৩ হাজার মানুষ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যার পানিতে আশ্রয়কেন্দ্র ও ওয়াশ (WASH) সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে।

অক্সফাম জানায়, নারী, শিশু, প্রবীণ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, গর্ভবতী ও দুগ্ধদানকারী মা এবং নারীপ্রধান পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সীমিত পুনর্বাসন স্থান, ক্ষতিগ্রস্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত জনঘনত্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সংস্থাটি ইতোমধ্যে চট্টগ্রামে জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু করেছে এবং এ জন্য প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ৬৫ হাজার টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। স্থানীয় অংশীদারদের মাধ্যমে জরুরি চাহিদা নিরূপণ, লিঙ্গভিত্তিক মূল্যায়ন এবং সরকারি সংস্থা, জাতিসংঘ ও অন্যান্য মানবিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

ত্রাণ কার্যক্রমের আওতায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে জরুরি খাদ্য, নিরাপদ পানীয় জল, স্বাস্থ্যবিধি ও নারীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীসমৃদ্ধ কিট, শাড়ি-লুঙ্গি এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য ৮ হাজার টাকা করে বহুমুখী নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এই অর্থ দিয়ে পরিবারগুলো খাদ্য, চিকিৎসা, আশ্রয় মেরামত, যাতায়াত ও জীবিকা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে পারবে।

কক্সবাজারে অক্সফাম ও তাদের সহযোগী সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত ও ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নের পাশাপাশি জরুরি সাড়া কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করা ১০০ জন রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবককে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) সরবরাহ করা হয়েছে।

অনিল পান্ত বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজনগুলো পূরণে তারা ইতোমধ্যে মাঠে কাজ শুরু করেছেন। তবে বর্তমান বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। তিনি দাতা সংস্থা, উন্নয়ন অংশীদার, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এবং সচেতন নাগরিকদের মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

অক্সফাম জানিয়েছে, স্থানীয়ভাবে পরিচালিত, লিঙ্গ-সংবেদনশীল এই কর্মসূচির মাধ্যমে তাৎক্ষণিক ত্রাণ, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং জলবায়ু সহনশীল পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষের কাছে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য সংস্থাটির প্রায় ৩০ লাখ ইউরো তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।