ম্যানসিটি ছাড়ার পথে গার্দিওলার কঠিন সময়

ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা; তার বিদায়ের নেপথ্যের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সংকট
ম্যানচেস্টার সিটির কোচ পেপ গার্দিওলা; তার বিদায়ের নেপথ্যের ব্যক্তিগত ও পেশাগত সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক : ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে পেপ গার্দিওলার শেষ সময়টা শুধু মাঠের পারফরম্যান্স কিংবা ট্রফির হিসাবেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন, দলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা, গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের চোট ও বিদায়—সব মিলিয়ে কঠিন এক সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল স্প্যানিশ এই কোচকে।

অ্যামাজন প্রাইমের প্রযোজনায় প্রকাশিত একটি প্রামাণ্যচিত্র সিরিজে গার্দিওলার সিটির শেষ বছরগুলোর নানা অপ্রকাশিত ঘটনা উঠে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, ব্যক্তিগত ও পেশাগত নানা সংকটের কারণে একাধিকবার ক্লাব ছাড়ার কথা ভেবেছিলেন তিনি।

গার্দিওলা ২০২৪ সালের নভেম্বরে ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে নতুন চুক্তি করেছিলেন। তবে প্রামাণ্যচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, চুক্তির আগে ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্তের খুব কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন তিনি।

২০২৪ সালে টানা চার ম্যাচ হারের পর সিটির পরিচালক কেভিন ম্যাকডোনাল্ডের সঙ্গে কথোপকথনে গার্দিওলা জানিয়েছিলেন, তিনি ক্লাবের পরিচালনা পর্ষদকে বলেছিলেন—হয়তো এখানেই তার সময় শেষ।

সিটির চেয়ারম্যান খালদুন আল মুবারকও স্বীকার করেছেন, গার্দিওলাকে ধরে রাখার ব্যাপারে তিনি নিজেও একসময় সংশয়ে পড়ে গিয়েছিলেন।

গার্দিওলাকে বোঝানোর প্রসঙ্গে তিনি ‘রাখাল ছেলে ও নেকড়ে’র গল্পের উদাহরণ দিয়ে বলেন, আগের বছরগুলোতে গার্দিওলা যখন ক্লান্তি বা বিদায়ের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তখন তাকে বোঝানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু একপর্যায়ে আল মুবারকের মনে হয়, এবার গার্দিওলা সত্যিই ‘নেকড়ে’ দেখতে পেয়েছেন।

গার্দিওলার কঠিন সময়টি আসে সিটির জন্যও এক অস্থির মৌসুমে। প্রিমিয়ার লিগের আর্থিক নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে ক্লাবের বিরুদ্ধে ১১৫টি অভিযোগ ছিল। একই সময়ে ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রির দীর্ঘমেয়াদি চোটও দলের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।

এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও কঠিন সময় পার করছিলেন গার্দিওলা। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তার মানসিক অবস্থার পরিবর্তন নিয়ে দলের ভেতরেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল বলে প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে।

দীর্ঘদিনের কোচিং স্টাফের সদস্য মানেল এস্তিয়ার্তে জানান, খেলোয়াড়েরা গার্দিওলার আচরণে পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গার্দিওলা তখন দুঃখী ও মানসিক চাপে ছিলেন এবং খেলোয়াড়দের বিষয়টি বোঝানোর প্রয়োজন হয়েছিল।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চ্যাম্পিয়নস লিগে জুভেন্টাসের কাছে হারের পর গার্দিওলা খেলোয়াড়দের সামনে নিজের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন।

তিনি জানান, স্ত্রীকে ভালোবাসলেও তাদের সম্পর্কের মধ্যে আগের সেই টান আর নেই। নিজের ব্যক্তিগত জীবনের এই অভিজ্ঞতার সঙ্গে ফুটবলের আবেগ ও পারফরম্যান্সের সম্পর্কও তুলে ধরেন তিনি।

গার্দিওলার বক্তব্য ছিল, তিনি শুধু প্রতিভাবান খেলোয়াড় চান না; তিনি এমন খেলোয়াড় চান, যাদের ভেতরে জেদ, আবেগ ও লড়াই করার মানসিকতা রয়েছে।

প্রামাণ্যচিত্রের কিছু দৃশ্যে গার্দিওলাকে খেলোয়াড়দের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কথা বলতে দেখা যায়। একটি খারাপ পারফরম্যান্সের পর তিনি জানান, দলের জন্য নিজের ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও অন্যান্য বিষয় একপাশে রেখে কাজ করছেন। কিন্তু দলের কাছ থেকে প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তিনি হতাশ ও নিঃসঙ্গ বোধ করছেন।

এমনকি খেলোয়াড়দের সতর্ক করে তিনি বলেন, পারফরম্যান্সের উন্নতি না হলে তাদের নতুন কোচের অধীনে খেলতে হতে পারে।

সিটির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে স্কোয়াডে পরিবর্তন আনা হয়। এই সময় দলে যোগ দেন ফরাসি তারকা রায়ান শেরকি। অন্যদিকে এক দশকে ১৬টি ট্রফি জেতা কেভিন ডি ব্রুইনা সিটি ছাড়েন।

ডি ব্রুইনার বিদায় গার্দিওলার জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, ক্লাব ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ডি ব্রুইনা নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন।

গার্দিওলা বলেন, ডি ব্রুইনার সঙ্গে আলাদা হওয়া তার জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত। সিটির ‘স্বর্ণযুগ’ ডি ব্রুইনাকে ছাড়া কল্পনা করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে দল পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আবেগের পাশাপাশি কঠিন ও যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন ছিল বলে জানান গার্দিওলা।

ডি ব্রুইনার জায়গা পূরণের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের জুনে প্রায় ৩০ মিলিয়ন পাউন্ডে রায়ান শেরকিকে দলে আনে ম্যানচেস্টার সিটি।

সিটির স্পোর্টিং ডিরেক্টর উগো ভিয়ানা জানান, শেরকির প্রতিভা নিয়ে কোনো সংশয় ছিল না। তবে তার আচরণ নিয়ে কিছু নেতিবাচক ধারণা ছিল এবং তাকে কিছুটা ‘বিশৃঙ্খল’ খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

তবে মাঠের পারফরম্যান্স দিয়ে দ্রুতই সেই সংশয় দূর করেন শেরকি। গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে ৩৩ ম্যাচে চার গোল ও ১২টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। অ্যাসিস্টের হিসাবে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন এই ফরাসি তারকা।

সব মিলিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটি ম্যানচেস্টার সিটিতে গার্দিওলার শেষ সময়ের এমন এক চিত্র তুলে ধরেছে, যেখানে ফুটবলের সাফল্য ও ব্যর্থতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত আবেগ, পারিবারিক সংকট এবং কঠিন সিদ্ধান্তও তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছিল।