বৃহত্তর উত্তরা

তুরাগের খালপাড় লেকে পঁচা ও নোংরা পানি; রাতে মশা দিনে মাছি, এ নিয়েই বেঁচে আছি

নগরীতে মশা আর মাছি (পর্ব- ০১)

  • ★★ রাতে মশা দিনে মাছি, দুই মিলে কষ্টে আছি
  • ★★ ডিএনসিসির ওষুধ কি অকার্যকর
  • ★★ মশার কামড়ে অতিষ্ঠ ঢাকা -১৮ আসনের জনগণ
  • ★★ মশার কামড়ে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাই

মনির হোসেন জীবন, তুরাগ: কি আর কমু গো বাজান; যেই দিন থেকে গরম পররা শুরু হইলো, সেদিন থেকেই মশার ভনভনানি আর মাছির প্যানপ্যানানি সহ্য করার মতো নয়! ব্যবসা-বানিজ্য, চা বানানী বাদ দিয়ে মশা তাড়াতেই বেশির ভাগ সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। কথাগুলো বলছিলেন তুরাগের খালপাড় এলাকার চা দোকানদার হাসান, মিজান ও সুরুজ মিয়া। শুধু তুরাগ কিংবা উত্তরা নয়, ঢাকা -১৮ আসনের সাবেক হরিরামপুর ইউনিয়ন, দক্ষিণখান, উত্তরখান এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) আওতাভুক্ত প্রতিটি ওয়ার্ডে মশার উপদ্রবের কারণে সাধারণ মানুষ গত কয়েক মাস ধরে চরম ভোগান্তিতে পোহাচ্ছে । বিকাল হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে মশা হাত পা কামড়ে ধরে। মশার কয়েল, মশারী ও ওষুধে কোনো কাজ হচ্ছে না। ফলে দিনকে দিন বেড়েই চলছে এই নাগরিক সমস্যা। খবর এলাকাবাসী, ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট একাধিক বিশ্বস্ত তথ্য সূত্রের।

জানা গেছে, রাজধানী তুরাগের জনবহুল এলাকা চণ্ডাল ভোগ, নলভোগ, তারারটেক, ডিয়াবাড়ি, রানাভোলা, ফুলবাড়িয়া, কামারপাড়া, নয়ানগর, ধউর, বামনারটেক, খায়েরটেক, ভাটুলিয়া, নয়ানিচালা, পুরানকালিয়া, দলিপাড়া, আহালিয়া, বাউনিয়া, পাকুরিয়া, খানটেকসহ উত্তরা বিভিন্ন সেক্টর এবং সাবেক হরিরামপুর ইউনিয়ন দক্ষিণখান ও উত্তরখান ইউনিয়ন বর্তমানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ থানা এলাকাগুলো অন্যতম। দক্ষিণখানের আজমপুর, কসাইবাড়ি, মোল্লারটেক, দক্ষিণখান বাজার, মোল্লাবাড়ি, ফায়দাবাদ, গাওয়াইর, চালাবন, মাটির মসজিদ, আশকোনা, কোটবাড়ি, মৌশাইর, আটিপাড়া, আশকোনা সিটি ও উত্তরখানের মাজার, মাজার চৌরাস্তা, মাস্টারবাড়ি, বালুরমাঠ, কলাবাগান, উত্তরখান সরকারি ও উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা, উজামপুর ও সোনারখোলাসহ বিভিন্ন এলাকায় বসবাসরত বাসিন্দাররা অভিযোগ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা শুধু সর্বক্ষেত্রেই অবহেলিত। এখানে বছরের পর বছর হয়না কোনো উন্নয়মূলক কাজ। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না। মশার কামড়ে অতিষ্ঠ হয়ে ঢাকা -১৮ আসনের প্রায় ৬ লাখের অধিক ভোটারসহ কয়েক লাখ মানুষ ডিএসসিসি প্রশাসক, সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাদের কাছে কোন প্রতিকার পাচ্ছেন না বলেও অভিযোগ উঠেছে।

বিশেষ করে উত্তরা লেকের পঁচা ও নোংরা দুর্গন্ধযুক্ত পানির সমস্যার সমাধান হয়নি বিগত ২৫/৩০ বছরেও। তুরাগের চন্ডাল ভোগ, ফুলবাড়িয়া, টেকপাড়া ও নলভোগ তুরাগ নদীর খিদির খালের উপর নির্মিত ক্ষুদ্র ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দুই যুগেরও বেশি সময়। সরকার আসে সরকার যায় কিন্ত নেই কোনো সংস্করণ। এসব যেন কারো নজরেই পড়ে না। তবে, গেল এয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির পক্ষ থেকে উত্তরা লেকের পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা হয়েছিল কিন্তু বর্তমানে কিছুটা থমকে গেছে। এরপর মশা তাড়ানোর জন্য একফোঁটা ওষুধওন ছিটানো হয়নি, এমনি বলছে সাধারণ মানুষ। তবে, বিগত সরকারের আমলে এসব এলাকাগুলোতে ডিএসসিসি ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের মাধ্যমে এলাকা ভিত্তিক প্রতিদিন মশা মারার ওষুধ ছিটানো হতো বলে জানিয়েছে স্থানীয় এলাকাবাসি। তাইতো দুঃখ করে ভুক্তভোগী জনগন (তারা) বলেন, কপালে আছে ভোগান্তি, শীতের ভরা মৌসুম চলে গেলেও মশায় অতিষ্টে ভুগছে ঢাকা -১৮ আসনের সাধারণ মানুষ। সন্ধ্যা নামলে মশার উৎপাত কয়েকগুণ বেড়ে যায় এবং দিনের বেলাতেও রেহাই মেলে না। ফ্যান কিংবা কয়েল জ্বালিয়ে ঘরের ভেতর বন্দী থাকতে হয় মানুষকে। মশার ওষুধ দিলেও কাজে আসছে না। শীতের তীব্রতা কমার সাথে সাথে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রতিটি অঞ্চলেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। তুরাগের চণ্ডাল ভোগ, নলভোগ ও ডিয়াবাড়ি এলাকার গৃহিনী নাজনীন সুলতানা, শাকিলা, আইরিন সুলতানা অভিযোগ করে এ প্রতিবেদককে বলেন, ছেলে-মেয়েরা পড়তে বসলে মশার কামড়ে হাত-পা, মুখে রক্ত বিন্দু জমে থাকে। রান্নাঘরে কাজ করতে গেলে কানের মধ্যে ভোঁ ভোঁ করে মশা। মশা মারতে কয়েল, স্প্রে, বৈদ্যুতিক ব্যাট কোন কিছু ব্যবহার করে রক্ষা পাচ্ছে না এসব এলাকার মানুষ। বিষাক্ত কয়েল জ্বালিয়ে, ধূপ পুড়িয়ে, অ্যারোসল স্প্রে করে কিংবা মশা মারার বৈদ্যুতিক ব্যাট ব্যবহার করেও মশার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাচ্ছে না মানুষ। তুরাগের নলভোগ কাঁচাবাজার, কামারপাড়া, নয়ানগর, রানাভোলা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, ও উত্তরার বাসিন্দা এবং মশার কয়েল বিক্রেতা একাধিক দোকানদাররা এ প্রতিবেদককে জানান, পবিত্র রমজান মাসে এবং ঈদের পর কয়েল ভালই বেচাকেনা হচ্ছে। জানি কয়েলের ধোঁয়ায় মানুষের ক্ষতি হয়। তবুও সবায় বিক্রি করছে তাই আমিও বিক্রি করছি।

গত মঙ্গলবার, বুধবার ও আজ বৃহস্পতিবার (তিনদিন) তথ্য অনুসন্ধান ও ঢাকা-১৮ আসনের বিভিন্ন এলাকাবাসীদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় তুলনামূলক ভাবে মশার উপদ্রব বেড়েছে। রাতে তো বটেই; দিনেও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই মিলছে না তাদের। পুরো ঢাকা -১৮ আসন যেন মশার দখলে! শীত শেষে আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে ওঠায় অত্র আসনের ৬টি থানা এলাকার জলাশয় ও জমে থাকা ময়লার স্তূপে মশার প্রজনন বেড়ে গেছে। ফলে এলাকাবাসীর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। কাঁচা বাজার ও ফুটপাত গুলোতেও মশার উৎপাত ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে অর্ধশতাধিক ছোট বড় কাঁচা বাজার, আড়ং ও এর আশপাশ এবং উত্তরা লেক, খাল, ডোবা- নালা, খিদির খাল, জলাশয় এবং সেক্টর গুলোর ড্রেনগুলো অপরিষ্কার থাকায় স্থানগুলো মশার চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে। এছাড়া বাজার সংলগ্ন রাস্তার পাশে, মহসড়কের পাশে, খেলার মাঠ, খালের পাড়ে, নদীর তীরে, পুকুরপাড়সহ বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ময়লার স্তূপ। সেগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় মশা তৈরির কারখানায় পরিনত হয়েছে । উত্তরা ১২ নম্বর সেক্টর গনকবরস্থানের দক্ষিণ পাশে বড় একটা ময়লা আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন , উত্তরা আজমপুর, আব্দুল্লাহপুর কাঁচাবাজারসহ কয়েকটি জায়গায় ডাস্টবিন থাকলেও তার যথাযথ ব্যবহার নেই। মূলত এসব কারণেই মশার উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া যত্রতত্র ময়লা ও আবর্জনার স্তূপ থেকে মশার প্রকোপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে। মশা আর মাছির উপদ্রব অনেকাংশে বেড়ে যাওয়ার কারণে জনগণ অনেকটাই ক্ষুব্ধ। অনেকে মনে করেন, তুরাগ নদী কিংবা উত্তরা লেকের পানি শোধনের ব্যবস্থা করলে, তিন দিন পরপর ড্রেনগুলোতে ওষুধ ছিটানোসহ স্প্রে করতে পারলে হয়তো মশা উপদ্রব কমে যাবে। মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য ডিএনসিসির প্রশাসনের কিংবা স্থানীয় জনপ্রতিনিধির আলাদা একটা বাজেট থাকা উচিত।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উত্তরা এলাকার একাধিক চিকিৎসক এ প্রতিবেদককে বলেন, এডিস মশাই ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও জিকা এ তিনটি রোগ ছড়ায়। এতে হাত-পা বা শরীরের অন্য যে কোনো অঙ্গ ফুলে যায়। কারণ, এসব দাহ্য পদার্থের ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে ক্যান্সারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে যা জনস্বাস্থ্যকে হুমকিতে ফেলে। তাই এসব রোগ ছড়ানোর আগেই দ্রুত মশা নিধনে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

তুরাগের ডিয়াবাড়ি আদর্শ মডেল স্কুল, ডিয়াবাড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, উত্তরা হাইস্কুল ও মাইলস্টোন কলেজের শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে এ প্রতিবেদককে জানান, রাতে নয়, দিনের বেলাতেই মশারি লাগে। রাতে তো আরো বেশি লাগে। পড়ার টেবিলে বসেও ঠিকমত পড়তে পারছে না তারা। গরম শুরু হতে না হতেই মশার প্রকোপ অনেকাংশে বেড়ে গেছে।

এদিকে তুরাগের দলিপাড়া, পাকুরিয়া, বাউনিয়া এলাকার একাধিক বাসিন্দারা এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা ভাড়া বাসায় থাকি। প্রতিদিন বিকালে অফিস শেষে বাসায় এসে কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হয়। এই বাসার পাশে পানি জমে থাকায় মশা এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে সন্ধ্যার পর বারান্দায় দাঁড়ানোই মুশকিল। তার ওপর গত বছর চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গু যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে তাতে এ বছর আমরা বেশ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। বাড়ীওয়ালাকে অনেকবার বলার পরও বাসার পাশের জলাবদ্ধতা দূর করেননি।
বাউনিয়া মাদবর বাড়ি এলাকার একজন বাড়ির মালিক ও ব্যবসায়ীরা এ প্রতিবেদককে জানান, দিনের বেলায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানে কয়েল জ্বালিয়েও মশার দংশন থেকে পরিত্রাণ মিলছে না। দিনের বেলায় তার নিজ ঘরে মশারি টানিয়ে রাখতে হয়। তারা বলেন, দিন কিংবা রাত কখনই মশার হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছি না। অ্যারোসল, ইলেকট্রিক ব্যাট, কয়েলে কাজ হচ্ছে না। দুপুরের পর থেকে ঘরে মশার কয়েল জ্বালিয়ে রাখতে হচ্ছে। তাতেও ঠিকমতো মশা যায় না।

এব্যাপারে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) উত্তরা অঞ্চল -৬ এর এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেন, এখন মৌসুম পরিবর্তন হচ্ছে বলে একটু মশা বাড়ছে। যদি নিজেরা সচেতন হন এবং বাড়ির আঙিনা পরিচ্ছন্ন ও ড্রেনে ময়লা- আবর্জনা ফেলা থেকে বিরত থাকে তাহলে মশার উপদ্রব অনেকটা কমে আসবে।

এব্যাপারে অচিরেই মশার হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ঢাকা -১৮ আসনের সংসদ সদস্য এস,এম জাহাঙ্গীর হোসেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) প্রশাসকসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ঢাকা -১৮ আসনের সর্বস্তরের জনগণ।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button