চাবি বদলালেই কি দরজা বদলায়?

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সংস্কার: তিন দশকের প্রশ্ন, এবার কি কাঠামোর উত্তর মিলবে?

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সংস্কার: তিন দশকের প্রশ্ন, এবার কি কাঠামোর উত্তর মিলবে?

এম.এইচ. রাশেদ : একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সংস্কার কখনোই কেবল চেয়ার বদলের গল্প নয়। ক্ষমতার হাতবদলে চেয়ার হয়তো এক দিনেই বদলে যায়, কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানের শেকড়ে গেঁথে থাকা সংস্কৃতি বদলাতে প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নিয়ম, কাঠামোগত নজরদারি এবং নিরবচ্ছিন্ন সময়। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে গত তিন দশকের যে দীর্ঘ ঘটনাপ্রবাহ, তা কেবল ধুলোপড়া অতীতের কোনো হিসাব নয়। মূলত এটি একটি পুরোনো প্রশ্নেরই অনিবার্য পুনরাবৃত্তি। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের মালিকানা রাষ্ট্রের হাতেই থাকবে, কিন্তু তার পেশাগত সিদ্ধান্তের সীমারেখাটি ঠিক কোথায় টানা হবে?

ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তৎকালীন সরকার মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌল্লাহর নেতৃত্বে বেতার ও বিটিভির স্বায়ত্তশাসনের নীতিমালা প্রণয়নে একটি কমিশন গঠন করেছিল। ঠিক পরের বছরের জুনে কমিশন তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে একটি স্বাধীন জাতীয় সম্প্রচার কমিশন গঠনের সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল। শুধু তা ই নয়, প্রস্তাবিত নয় সদস্যের সেই কমিশনকে সরাসরি সংসদের সংশ্লিষ্ট স্থায়ী কমিটির কাছে জবাবদিহির আওতায় আনার চমৎকার একটি রূপরেখাও সেখানে দেওয়া হয়েছিল। দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকা এই ইতিহাস এবং সংশ্লিষ্ট আদালতের নথিপত্রের বিস্তারিত তথ্য গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি দৈনিক প্রথম আলো তাদের একটি বিশেষ প্রতিবেদনে নতুন করে জনসমক্ষে তুলে ধরে।

এরপর শুরু হয় অন্তহীন এক অপেক্ষার পালা। ২০০০ সালের আগস্ট মাসে মানবাধিকার সংগঠন 'অধিকার' বিষয়টি নিয়ে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করলে ওই বছরেরই নভেম্বরে আদালত একটি রুল জারি করেন। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেই রুলের শুনানি শুরু হতে সময় লেগে যায় দীর্ঘ পঁচিশটি বছর! গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি অবশেষে সেই আইনি স্থবিরতা ভাঙে। ঠিক এর পরের মাসেই, অর্থাৎ ২৩ মার্চ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন তাদের সরকারি পোর্টালে ১৯৯৭ সালের সেই পুরোনো প্রতিবেদনটি নতুন করে প্রকাশ করে। এই ঘটনাপ্রবাহ অন্তত একটি বিষয় প্রমাণ করে, আমলাতন্ত্রের অন্ধকার আলমারিতে ফাইল হয়তো যুগের পর যুগ বন্দী ছিল, কিন্তু গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সেই মৌলিক প্রশ্নটি কখনোই মরে যায়নি।

এখানেই একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। অনেকেই মনে করেন, স্বায়ত্তশাসন মানেই বুঝি জবাবদিহিহীনতা, যা সম্পূর্ণ ভুল একটি ধারণা। জনগণের করের টাকায় পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠানের বাজেট, নিয়োগ, নিরীক্ষা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব অবশ্যই রাষ্ট্রকে দিতে হবে। কিন্তু প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং প্রতিটি সংবাদ বা অনুষ্ঠানের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত যে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়, তা আমাদের বুঝতে হবে। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজ ও জাতীয় নীতির তথ্য প্রচার করা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের অন্যতম দায়িত্ব হতে পারে। তবে সেই দায়িত্বকে কোনোভাবেই ক্ষমতাসীনদের প্রশ্নহীন প্রশংসার বাধ্যবাধকতা বা সস্তা স্তুতিগানে পরিণত করা যায় না, কারণ এটি স্বাধীন গণমাধ্যমের মূল চেতনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

২০০১ সালের বাংলাদেশ টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ আইন নিয়ে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক বিতর্কেও আইনি ও প্রশাসনিক এই সীমারেখার গুরুত্ব অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গত ৬ আগস্ট সাংবাদিক কাজী জেসিনকে বিটিভির মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে ২০০১ সালের সেই আইনের ১১(২) ধারাটি উদ্ধৃত করা হয়, আর মূলত এখান থেকেই আইনি বিতর্কের সূত্রপাত ঘটে। ঘটনার ঠিক তিন দিন পর, ৯ আগস্ট ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার তাদের একটি প্রতিবেদনে জানায় যে, আইনটি আদৌ কার্যকর আছে কি না সে বিষয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোই কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এমন এক আইনি গোলকধাঁধার মুখে পড়ে ঠিক পরের দিনই মন্ত্রণালয় তাদের প্রজ্ঞাপনে থাকা আইনি ত্রুটির কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয় এবং একটি সংশোধিত প্রজ্ঞাপন জারির সিদ্ধান্তের কথা জানায়। তবে একই সাথে তারা এটিও নিশ্চিত করে যে, আইনি সংশোধন যা ই হোক না কেন, নতুন মহাপরিচালক তার পদেই বহাল থাকবেন।

তবে এই আইনি জটিলতার পর্যালোচনায় আমাদের কিছুটা সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কোনো আইনের কার্যকারিতা নিয়ে নিছক প্রশাসনিক অস্পষ্টতা থাকা এবং আদালতের চূড়ান্ত রায়ে সেটি অকার্যকর ঘোষিত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়। তাই এই বিতর্কে মূল প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ঘিরে না তুলে, বরং আইনি প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা নিয়ে তোলাই অনেক বেশি যৌক্তিক। গত ৭ সেপ্টেম্বর হালনাগাদ করা বিটিভির দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে কাজী জেসিনকে মহাপরিচালক হিসেবেই দেখানো হয়েছে। তবে সংশোধিত প্রজ্ঞাপনের পূর্ণাঙ্গ রূপটি নির্ভরযোগ্য সরকারি মাধ্যমে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো আইনি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। আইনি সংশোধনের ফলাফল যা ই হোক না কেন, আমাদের মনে রাখতে হবে যে মূল সংকটটি কোনো ব্যক্তিকে ঘিরে তৈরি হয়নি, বরং রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা কাঠামোগত ও আইনি অস্বচ্ছতার ভেতরেই এর শেকড় নিহিত।

আইনি এই জটিলতার পাশাপাশি গণমাধ্যম সংস্কারের পরিধিও ইতিমধ্যে বেশ বড় হয়েছে। গত বছরের ২২ মার্চ গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার এবং বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) একীভূত করে একটি একক ও জাতীয় সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান গঠনের সুপারিশ করে। তাদের প্রস্তাবে নতুন এই প্রতিষ্ঠানটিতে টেলিভিশন, বেতার ও সংবাদ নামে তিনটি আলাদা বিভাগ রাখার কথা বলা হয়েছিল। তাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করলে, এই একীভূতকরণের ফলে প্রশাসনিক ব্যয় যেমন কমতে পারে, তেমনি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহারও অনেক বেশি দক্ষ ও সাশ্রয়ী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে এর একটি বিপরীত এবং মারাত্মক ঝুঁকিও রয়েছে। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যদি একটি একক কেন্দ্রেই কুক্ষিগত হয়ে পড়ে, তবে তা প্রশাসনিক দক্ষতার বদলে ক্ষমতার অনাকাঙ্ক্ষিত কেন্দ্রীকরণকেই উসকে দিতে পারে। তাই কেবল কাঠামো বদলালেই যে রাতারাতি সংস্কার সম্পন্ন হয়ে যাবে, এমন ধারণা যেমন অতি সরল, ঠিক তেমনি কেবল পুরনো ঘুণে ধরা কাঠামোটিকে আঁকড়ে ধরে বসে থাকাও কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়।

সংস্কারের এই কাঠামোগত রূপরেখা প্রণয়নের কাজটি অবশ্য একেবারে থেমে নেই। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিতের পথ নির্ধারণ এবং গত পনেরো বছরের গণমাধ্যম নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জন্য গত বছরের জুনে সরকার পাঁচ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছিল। তারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ গত ১৮ জুন, জাতীয় গণমাধ্যম কমিশনের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে অংশীজনদের উপস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। সেই কর্মশালায় সরকার আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, কেবল আমলাতান্ত্রিক সিদ্ধান্তে নয়, বরং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই এই কমিশনের চূড়ান্ত কাঠামো তৈরি করা হবে।

তাই আগামী দিনে সমাধানের পথটি হতে হবে আরও সুনির্দিষ্ট ও তীক্ষ্ণ। শীর্ষ পদগুলোতে নিয়োগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে কীভাবে? মহাপরিচালকের মেয়াদ ও অপসারণের আইনি মাপকাঠি কী হবে? সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ ঠেকানোর প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ কোথায়? সংসদীয় জবাবদিহির প্রক্রিয়াটি ঠিক কীভাবে কার্যকর হবে? এবং সবচেয়ে বড় কথা, আর্থিক স্বাধীনতার সাথে জবাবদিহি ও নিরীক্ষার ভারসাম্যই বা কীভাবে বজায় রাখা হবে? কেবল নতুন কোনো নাম কিংবা নতুন কোনো কমিটি গঠন করা নয়, বরং এসব মৌলিক প্রশ্নের লিখিত ও কার্যকর উত্তর মেলার মধ্যেই লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র সংস্কারের আসল পরীক্ষা।

দীর্ঘ তিন দশক ধরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নামের এই রুদ্ধদ্বার দরজাটির সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল চাবি নিয়েই আলোচনা করে গেছি। এবার আমাদের এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক তালা প্রয়োজন, ব্যক্তি বা সরকার বদলালেও যার ভেতরের নিয়মকাঠামো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত থাকবে। কারণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের কোনো সুবিধা ভোগের হাতিয়ার নয়, বরং এটি সাধারণ জনগণের জানার অধিকার রক্ষার একটি চূড়ান্ত প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্ত।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সময়ের পরিক্রমায় ক্ষমতার চাবি হয়তো বদলাতেই থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্র সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে দরজার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোটি এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে চাবির মালিক বদলালেও ভেতরের নিয়মগুলো আর কখনোই না বদলায়।

লেখক: গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক, পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়