ছবির জিয়া, শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও রাজনীতির দখলদারত্ব

ছবির জিয়া, শ্রেণির আকাঙ্ক্ষা ও রাজনীতির দখলদারত্ব
পিনাকী ভট্টাচার্য : ছবিটা একবার ভালো কইরা দেখেন। সামনে মাইক। মাইকের সামনে একজন মানুষ কথা বলতেসেন, এভিয়েটর সানগ্লাস পরা, চোয়াল শক্ত, চোখ সামনের দিকে। আর তাঁর পাশে দাঁড়ায়া আছে আরেকজন মানুষ। খালি গা। বুকের পাঁজরগুলা গোনা যায়, কাঁধের হাড় উঁচা হইয়া আছে, গলার চামড়া ঝুলতেসে। লোকটা মাইকের দিকে তাকায়া নাই, সে তাকায়া আছে ভিড়ের দিকে।
দুইজন মানুষ। আমরা একজনের নাম জানি। আরেকজনের নাম এই দেশে কেউ জানে না, কোনোদিন জানব না। তার কবর চিহ্নিত নাই, জন্মতারিখ কোথাও লেখা নাই। তার ছেলেমেয়েরাও হয়তো জানে না যে তাদের বাপের একটা ছবি একদিন এই দেশের ইতিহাসে ঢুইকা গেসিল।
কিন্তু লোকটা ওইখানে দাঁড়ায়া ছিল কেন? তার তো ক্ষেতে কাজ ছিল। পেটে যে ভাত ছিল না, ওইটা শরীর দেইখাই বোঝা যায়। ক্ষুধা পেটে মানুষ কাজ ফেলে না, কারণ কাজ ফেললে কালকেও ভাত নাই। তবু সে কাজ ফেইলা মাইকের কাছে আইসা দাঁড়াইসিল। কারণ সে শুনতে আসছিল। কী শুনতে আসছিল, ওইখানেই আমাদের পূর্বপুরুষের পুরা ইতিহাসটা।
এই পূর্ববঙ্গের মানুষ দুইশ বছর ধইরা একটাই জিনিস চাইসে। নিজের জমি, নিজের ফসল, নিজের হাতে নিজের ভাগ্য। ফকির বিদ্রোহ, তিতুমীর, হাজী শরিয়তউল্লাহ, নীল বিদ্রোহ, সবগুলার গোড়ায় ওই এক কথা, জমিদারের খাজনা আর না। আর প্রতিবার ক্ষমতায় যারা ছিল, তারা ওইটারে একটাই নাম দিসে। বিশৃঙ্খলা। ওই জমির আকাঙ্ক্ষা থেকেই মুসলিম লীগ, আর ওই আকাঙ্ক্ষা থেকেই একটা আলাদা রাষ্ট্র।
ইতিহাসের একটা পুরানো প্রশ্ন আছে। একটা কৃষিপ্রধান দেশ আধুনিক হওয়ার সময় কোন পথে যাবে, ওইটা ঠিক করে একটা জিনিস। জমির উপর কার দখল, আর ওই দখলটা ভাঙে কীভাবে। ফ্রান্সে জমিদার শ্রেণিটা ভাঙসিল বিপ্লবের ভিতর দিয়া, আর ওই ভাঙনের ভিতর দিয়াই ওইখানে পুঁজি দাঁড়াইসে। এই পূর্ববঙ্গে জমিদারি উচ্ছেদ হইল ঠিকই, কিন্তু খালি জায়গাটায় পুঁজি দাঁড়াইল না। দাঁড়াইল রাষ্ট্র।
পাকিস্তান আমলে উদ্বৃত্ত চইলা যাইতে লাগল পশ্চিমে, আর আমরা জিগাইলাম, সোনার বাংলা শ্মশান কেন। তারপর ছয় দফা, তারপর যুদ্ধ। ছয় দফার ভিতরে ওই একই কথা লেখা ছিল, এই ভূখণ্ডের সম্পদ এই ভূখণ্ডে থাকবে। আমার দাদারা ওই কথার উপর বিশ্বাস কইরা ছেলেরে যুদ্ধে পাঠাইসে।
দেশ স্বাধীন হইল। আর তারপর যা হইল, ওইটা ঠিক উল্টা। বাহাত্তরের ছাব্বিশে মার্চ কলকারখানা, ব্যাংক, বিমা সব জাতীয়করণ হইল। কেউ নিজে একটা মাঝারি বা ছোট শিল্প দিতে চাইলে তার সীমা বাইন্ধা দেওয়া হইল পঁচিশ লাখ টাকায়। পঁচিশ লাখ টাকায় ক্যাপিটালিজম করবেন? পরে চাপে পইড়া সীমা বাড়ল তিন কোটি, কিন্তু সর্বোচ্চ সীমা রইল। দুইশ বছরের লড়াইটা জিতল একদল মানুষ, ফলটা নিয়া গেল আরেকদল। জমিদার গেল, ওই চেয়ারে বসল রাষ্ট্র। নতুন জমিদার, যার কাছে খাজনা দিতে হয়, কিন্তু জবাব চাওয়া যায় না।
আর ছবির ওই লোকটা ততদিনে ওই শরীরটা নিয়া দাঁড়ায়া আছে। যুদ্ধ গেল, স্বাধীনতা গেল, দুর্ভিক্ষ গেল, তার পাঁজর গোনা যায় আগের মতোই। সে শুনতে আসছিল যে এইবার তার পালা।
ওই দুইজন পাশাপাশি দাঁড়ানো কোনো দুর্ঘটনা না। একজনের কথা বলার জায়গা ছিল না, মাইকটা ছিল আরেকজনের হাতে। একজনের শরীর, আরেকজনের গলা। দুইশ বছরের এসপিরেশন ওইদিন একটা সানগ্লাস পরা মুখ পাইল।
রাজনীতির এইটা একটা পুরানো সমস্যা। যার কথা বলার জায়গা নাই, তার হইয়া অন্য কেউ বলে। ওইটা তার মুক্তির শুরু, আবার ওইটাই তার বন্দিত্বেরও শুরু। কারণ যে আপনার হইয়া বলে, একদিন সে ঠিক করা শুরু করে আপনি আসলে কী চান। আর ধার করা গলা ফেরত দেওয়ার কোনো নিয়ম এই দেশে নাই।
তাইলে ওইদিন কি লোকটার গলাটা ধার নেওয়া হইসিল? না। ধার করা গলায় মানুষ নিজের শ্রেণির কথা বলে। এভিয়েটর পরা মানুষটা নিজের শ্রেণির কথা বলে নাই, বলসে পাশের মানুষটার শ্রেণির কথা। আর তার পরে তিনি যা যা করসেন, তার একটাও ঢাকার শিক্ষিত মধ্যবিত্তের দরকার ছিল না।
ছিয়াত্তর সালের পহেলা নভেম্বর যশোরের শার্শায় উলশী থেকে যদুনাথপুর পর্যন্ত চার কিলোমিটার খাল কাটা শুরু হইল। কোনো ঠিকাদার না, কোনো টেন্ডার না। দলে দলে গ্রামের মানুষ নামসে কোদাল নিয়া, বিনা পয়সায়। ছয় মাসে কাজ শেষ, আর সাতাত্তরে খাল কাটা ছড়াইল সারা দেশে দাবানলের মতো। আমার মনে আছে, খাল কাটতে গিয়া গায়ে কাদা লাগানোটাই তখন তরুণদের ফ্যাশন হইয়া উঠসিল। এই খালে কোনো সচিবের লাভ ছিল না, ঢাকার এলিটের লাভ ছিল না। লাভ ছিল তার, যার ক্ষেতে পানি যায়।
আর আটাত্তরে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ সীমা তুইলা দেওয়া হইলো। এইটা শুনলে মনে হয় শহরের ব্যবসায়ীর লাভ হইসে। কথা সত্য। কিন্তু বাংলাদেশে এই কাজের মধ্যে দিয়াই ক্যাপিটালিজম দাড়াইসে। আর পুঁজি যখন দাঁড়ায়, শুধু মালিক উঠে না, সবচেয়ে নিচের মানুষটার জন্যও একটা সিঁড়ি নামে।
তাই ওই একই বছর দক্ষিণ কোরিয়ার দাইয়ুর সাথে দেশ গার্মেন্টসের চুক্তি সই হইল, দেশের প্রথম পুরাপুরি রপ্তানিমুখী কাপড়ের কারখানা। ওই বছরই রিয়াজউদ্দিন নামে এক দর্জি দশ হাজার শার্ট পাঠাইলেন ফ্রান্সে। তাঁর কারখানায় প্রথম শ্রমিক ছিলেন পাঁচজন মেয়ে। জমিদারের ছেলে জমিদার থাকে। কিন্তু একটা কারখানা দাঁড়াইলে খালি গায়ের লোকটার মেয়ের সামনে একটা দরজা খোলে। গরিবের মেয়ে মাসে মাসে বেতন পাবে, এই কথা তখন কেউ বিশ্বাস করত না। অথচ ওই মেয়েটাই একদিন নিজের টাকায় চাল কিইন্যা বাড়ি ফিরসে, আর যেই বাপের পেটে কোনোদিন ভাত ছিল না, তার পাতে ভাত তুইলা দিসে।
আর যেই দলটা তিনি বানাইলেন, ওইটার ভিতরে কোনো জমিদারি বংশ ছিল না। কথাগুলা ছিল ওই শরীরটার, শুধু গলাটা আরেকজনের। ওইটা ধার না। ওইটা প্রতিনিধিত্ব। ওই দলটার জন্ম কোনো সভাঘরে হয় নাই, হইসে একটা অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়া, একটা বিপ্লবের ভিতর দিয়া। দলটার দরকার ছিল, কারণ ওই বিপ্লব যেই ভাষা আর আকাঙ্ক্ষা তৈরি করসিল, সেইটা ধারণ করার মতো কোনো দল এই দেশে ছিল না। আর যেই লোকটা দলটা বানাইসিলেন, তিনি একাত্তরে একটা বৈধ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরসিলেন। ওই রাষ্ট্রের আইনে ওইটার একটাই নাম ছিল, বিদ্রোহ। আজকের অভিধানে তাঁরও একটা নাম হইত। নৈরাজ্যবাদী।
মানুষ নিজের ইতিহাস নিজেই বানায়, কিন্তু নিজের পছন্দের পরিস্থিতিতে না। জিয়া ইতিহাস বানাইসেন, কিন্তু তার আগে ইতিহাস তাঁরে বানাইসে। পরিস্থিতিটা ছিল ওই খালি গায়ের মানুষটার দুইশ বছরের না-পাওয়া, যেইটা একটা মুখ খুঁজতেসিল।
এভিয়েটর পরা লোকটার রাজনীতিটা একটা বিপ্লবই ছিল। দুইশ বছর জমির নিচে চাপা পড়া একটা শ্রেণির বুকের উপর থিকা পাথর সরানোর নামই বিপ্লব। ওইটা মঞ্চে হয় নাই, হইসিল খালের কাদায়, কারখানার দরজায়, অর্থনীতির নিয়ম বদলানোর ভিতর দিয়া। আর যারা আজ ওই শব্দটা শুনলে চমকান, তাঁরা নিজেদের সাত নভেম্বরের নামটা একবার পড়েন। জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বছরে একদিন শব্দটা ব্যানারে লেখেন, আর বাকি তিনশ চৌষট্টি দিন ওইটা আরেকজনের মুখে শুনলে ভয় পান।
আজকে জিয়ার নাম শুনলে মানুষ ভাবে একটা দল, একটা প্রতীক, একটা মিছিল। জিয়া মানে বিএনপি।
ছবিটার দিকে আরেকবার তাকান। ওইখানে কোনো পতাকা নাই, কোনো প্রতীক নাই। আছে একটা মাইক আর একটা শুকনা শরীর। ওই শরীরটা আমার দাদার, আপনার নানার, ওই লক্ষ লক্ষ মানুষের যারা দুইশ বছর অন্যের জমিতে ফসল ফলাইসে আর নিজের ছেলেমেয়েরে ভাত দিতে পারে নাই। ওই শরীরটার জন্য যেই রাজনীতি, ওইটা কোনো দলের সম্পত্তি হইতে পারে না।
এই বছর এপ্রিলে উলশীর ওই খালে আবার কোদাল পড়সে। এইবার কোদাল হাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, পাশে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা, সামনে ক্যামেরা। খালপাড়ে এখন দুইটা নামফলক পাশাপাশি, বাপের আর ছেলের। বাপের ফলকে লেখা, স্বেচ্ছাশ্রম ভিত্তিক সামাজিক আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ। ছেলের খাল কাটতেসে পানি উন্নয়ন বোর্ড। হাসিনাও খাল কাটাইসে পানি উন্নয়ন বোর্ডরে দিয়া। চার হাজার কিলোমিটারের বেশি, পাঁচশ একষট্টিটা প্যাকেজে। তারেক রহমানের ঘোষণা বিশ হাজার কিলোমিটার, আর দুইজনেরই খাল কাটে ওই একই বোর্ড। জিয়ার খাল কাটসিল গ্রামের মানুষ, নিজের হাতে, বিনা পয়সায়। ফলক আছে, কোদাল আছে, খাল আছে। খালি সামাজিক আর রাজনৈতিক আন্দোলনটা এখন প্যাকেজ। ঠিকাদারি আর ধান্দাবাজির উৎস। এইটা কেমনে জিয়ার খালকাটা হয়?
আর বাকিটা আমরা দেখি। দখল, চাঁদাবাজি, আবার দখল, ধান্দাবাজি। যারা এইগুলা করে, ওই মানুষটার নাম নিয়াই করে। গলাটা তাঁরাও ব্যবহার করেন, শুধু কথাগুলা এখন আর ওই শরীরটার না। ওরা শুধু টেম্পুস্ট্যান্ড দখল করে নাই। জিয়ারেও দখলই করসে।
ওই ছবির জিয়াকে ফিরায়া আনতে হবে। ওই জিয়া কোনো দলের চেয়ারম্যান না, প্রতিষ্ঠাতা না, দলের সম্পত্তি না, দলের আইকন না। জিয়া একটা রাজনীতির নাম, এই দেশের সবচেয়ে গরিব মানুষটার হাতে তার নিজের ভাগ্যটা তুইলা দেওয়া। কাজটা শেষ হয় নাই। পঞ্চাশ বছরে মাইকের সামনের মানুষটা বহুবার বদলাইসে। ছবির পাশের মানুষটা একবারও বদলায় নাই। সে আজও ভিড়ের মধ্যে দাঁড়ায়া আছে, খালি গায়ে, কারও কথা শোনার আশায়।
আমি জানি না ওই লোকটা কে ছিল। জানি না ওইদিন বাড়ি ফিরা ভাত পাইসিল কিনা, আর কত বছর বাঁচসিল। জানি না তার মেয়েটা কোনোদিন কারখানার দরজা পর্যন্ত পৌঁছাইসিল কিনা। শুধু জানি, সে ওইখানে দাঁড়ায়া ছিল একটা কথা শোনার জন্য, যেইটা তারে দুইশ বছর কেউ বলে নাই।
ছবিটা আপনাদের না। ছবির দ্বিতীয় মানুষটা আমাদের, আর যেই রাজনীতিটা তার জন্য শুরু হইসিল, ওইটাও। ফেরত নেওয়াটা আমাদের কাজ।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ।