তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণ: বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় এক অপূরণীয় শূন্যতা

Photo : AI
Photo : AI

মীম মাহমুদ : একজন সম্পাদক কেবল একটি সংবাদমাধ্যমের নেতৃত্ব দেন না; তিনি গড়ে তোলেন সংবাদচর্চার সংস্কৃতি, তৈরি করেন সাংবাদিকদের একটি প্রজন্ম এবং রেখে যান কিছু নীতি, যা তাঁর অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠানকে পথ দেখাতে পারে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণের সময় বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তাঁর অবদানের পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম উচ্চারিত হবে মূলত দুটি কারণে -অনলাইন সংবাদমাধ্যমকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা এবং সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা ও সম্পাদকীয় স্বাতন্ত্র্য ধরে রাখার প্রশ্নে তাঁর অবস্থান। তাঁর মৃত্যুতে একটি দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান ঘটেছে, কিন্তু তার চেয়েও বড় বিষয়, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম হারিয়েছে এমন একজন সম্পাদককে, যিনি প্রচলিত সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতাকে ডিজিটাল সংবাদযুগের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন।

তাঁর অনুপস্থিতি তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে শূন্যতা নয়। এটি এমন এক সময়ে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যখন সংবাদমাধ্যমকে একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ, প্রযুক্তিগত রূপান্তর, পাঠকের আস্থার সংকট এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল সংবাদ গ্রহণের অভ্যাস।

সংবাদমাধ্যমের রূপান্তরের এক প্রত্যক্ষ অংশীদার

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতা শুরু হয়েছিল এমন এক সময়ে, যখন সংবাদপত্রই ছিল জনপরিসরে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম। ১৯৮৯ সালে সানডে এক্সপ্রেস-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে তিনি পরবর্তী সময়ে দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যানশিয়াল এক্সপ্রেস এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেন। গবেষণার অভিজ্ঞতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কাজ এবং রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি ও বাণিজ্য বিষয়ে প্রতিবেদন তৈরির মধ্য দিয়ে তাঁর সাংবাদিকতার ভিত্তি তৈরি হয়।

এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সংবাদকে কেবল ঘটনাবিবরণ হিসেবে না দেখে তার পেছনের প্রেক্ষাপট, সিদ্ধান্ত ও প্রভাব অনুসন্ধানের সুযোগ করে দিয়েছিল। বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য এই দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এখানে অনেক সময় সংবাদপ্রবাহে ঘটনার তাৎক্ষণিক বিবরণ প্রাধান্য পেলেও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের পটভূমি, ক্ষমতার কাঠামো এবং জনজীবনে তার প্রভাব নিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানের জায়গা সীমিত থাকে।

২০০৬ সালে তাঁর নেতৃত্বে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রা শুরু হয়। তখন বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতা আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। সংবাদ প্রকাশের জন্য ছাপাখানা, মুদ্রণ ও বিতরণব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতার বাইরে গিয়ে তাৎক্ষণিক সংবাদপ্রবাহের একটি নতুন পরিসর তৈরি হচ্ছিল। সেই সময়ে একটি পূর্ণাঙ্গ অনলাইন নিউজরুম গড়ে তোলা ছিল একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত, পেশাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক চ্যালেঞ্জ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিকাশের মধ্য দিয়ে তৌফিক ইমরোজ খালিদী এই পরিবর্তনের একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে ওঠেন। সংবাদ প্রকাশের গতি, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উপযোগী উপস্থাপনা, বিভিন্ন শ্রেণির পাঠকের কাছে পৌঁছানো এবং নতুন ধরনের সাংবাদিকতার উদ্যোগ -এসব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটির অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের বিকাশের ইতিহাসের অংশ।

তবে একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠা করাই তাঁর অবদানের সম্পূর্ণ বিবরণ নয়। প্রযুক্তি সংবাদ প্রকাশের মাধ্যম বদলে দেয়, কিন্তু সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্নগুলো বদলে দেয় না: তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য, সংবাদ কতটা স্বাধীন, ভুল হলে সংশোধনের দায় কে নেবে এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম কতটা কার্যকর থাকবে? এই প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখেই তাঁর কর্মজীবনের মূল্যায়ন জরুরি।

সংবাদ প্রকাশের আগে প্রশ্ন ছিল: তথ্যের উৎস কী?

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাংবাদিকতাকে বোঝার ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ-তথ্যের উৎস উল্লেখ ও যাচাইয়ের ওপর তাঁর জোর। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সংবাদকক্ষে সূত্রের পরিচয় প্রকাশকে তিনি নিছক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখেননি; এটিকে পেশাগত শৃঙ্খলার অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন।

সাংবাদিকতার এই চর্চা বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো পরিবেশে তাৎপর্যপূর্ণ, যেখানে অনেক সংবাদই আসে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, ব্যবসায়িক কিংবা প্রভাবশালী বিভিন্ন সূত্রের কাছ থেকে। সূত্রের বক্তব্যকে সরাসরি সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করা আর বক্তব্যটির যথার্থতা যাচাই করে, প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট যুক্ত করে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্যই সংবাদকে নিছক প্রচার থেকে সাংবাদিকতায় রূপ দেয়।

তাঁর সাবেক সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, সংবাদকে নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন, সংবেদনশীল প্রতিবেদনেও সংযত ভাষা বজায় রাখা এবং চাপের মুখে পেশাগত অবস্থান ধরে রাখার বিষয়ে তিনি গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের কারও কারও কাছে তিনি ছিলেন সম্পাদক, কারও কাছে শিক্ষক বা পরামর্শদাতা, আবার কারও কাছে পেশাগত সংকটে আস্থার জায়গা।

একজন সম্পাদকের প্রভাব এভাবেই তাঁর নিজের লেখা বা সম্পাদিত প্রতিবেদনের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। তিনি সংবাদকক্ষে কী ধরনের প্রশ্ন করা হবে, কোন তথ্যকে যথেষ্ট মনে করা হবে, কীভাবে ভুল সংশোধন করা হবে এবং সাংবাদিকেরা নিজেদের দায়িত্ব কীভাবে বুঝবেন—এসব বিষয়েও প্রভাব রাখেন। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর রেখে যাওয়া শূন্যতার একটি বড় অংশ এই অদৃশ্য অথচ মৌলিক জায়গাটিতে।

তাঁর শূন্যতা কেন সহজে পূরণ হওয়ার নয়

প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে পরিবর্তন স্বাভাবিক। দায়িত্ব হস্তান্তর, নতুন নেতৃত্ব তৈরি এবং কাজের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য যেকোনো সংবাদমাধ্যমেরই প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে একটি সংবাদমাধ্যম গড়ে তোলা সম্পাদকের অনুপস্থিতি কেবল পদ পূরণের মাধ্যমে সামাল দেওয়া যায় না।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে প্রায় দুই দশক দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সময়ে তিনি শুধু সংবাদ সম্পাদনার কাজ করেননি; প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, নতুন উদ্যোগ নেওয়া এবং সাংবাদিকদের একটি দল গড়ে তোলার কাজেও যুক্ত ছিলেন। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণের মাত্র তিন সপ্তাহ পর প্রতিষ্ঠানটির ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল। প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, সেই আয়োজনের পরিকল্পনাতেও তিনি সক্রিয় ছিলেন।

এই তথ্যটি তাঁর অনুপস্থিতির তাৎপর্যকে আরও স্পষ্ট করে। কারণ, তিনি এমন এক সময়ে চলে গেলেন, যখন প্রতিষ্ঠানটি তার দুই দশকের পথচলা পর্যালোচনা করে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।

তাঁর শূন্যতা অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে অনুভূত হবে। প্রথমত, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও তাৎক্ষণিক বিচারবোধের অভাব। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি, সংবাদপ্রবাহ ও ব্যবসায়িক বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি ও অভিজ্ঞতার অনুপস্থিতি। তৃতীয়ত, নতুন ও অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, পরামর্শ এবং পেশাগত আস্থার সম্পর্কের বিচ্ছেদ।

তবে এই শূন্যতা পূরণের একমাত্র উপায় তাঁর বিকল্প একজন ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা নয়। বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত পেশাগত চর্চা, সম্পাদনাগত নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধকে ব্যক্তি-নির্ভরতা থেকে বের করে একটি টেকসই কাঠামোয় রূপ দেওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। একজন সম্পাদকের প্রকৃত উত্তরাধিকার তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তাঁর অনুপস্থিতিতেও প্রতিষ্ঠান তার মৌলিক নীতিগুলো ধরে রাখতে পারে।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা যে সংকটের মুখোমুখি

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণের সময় বাংলাদেশের সাংবাদিকতা নানা ধরনের পরিবর্তন ও চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদ প্রকাশকে সহজ করেছে, একই সঙ্গে তথ্যের সত্যতা যাচাইকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া অসম্পূর্ণ, বিভ্রান্তিকর কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্যের ভিড়ে পেশাদার সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব বেড়েছে।

একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক কাঠামোও পরিবর্তিত হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের বাজার, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রভাব, পাঠকের বিনামূল্যে সংবাদ পাওয়ার প্রত্যাশা এবং সংবাদ তৈরির ক্রমবর্ধমান ব্যয়-সবকিছুই সংবাদমাধ্যমের টেকসই পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে। এ বাস্তবতায় সম্পাদককে কেবল সংবাদ বাছাই ও সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করলেই চলে না; তাঁকে প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়েও ভাবতে হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনআস্থার প্রশ্ন। পাঠক যখন সংবাদে পক্ষপাত, অসম্পূর্ণতা কিংবা যাচাইহীন তথ্যের উপস্থিতি দেখতে পান, তখন একটি প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজন ধারাবাহিক ও স্বচ্ছ সংবাদচর্চা, ভুল হলে তা স্বীকার ও সংশোধন করার মানসিকতা এবং ক্ষমতাবান ও সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে একই পেশাগত মানদণ্ড প্রয়োগ।

সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রশ্নটিও এর বাইরে নয়। স্বাধীনতা মানে শুধু রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত থাকা নয়; মালিকানা, বিজ্ঞাপনদাতা, ব্যবসায়িক স্বার্থ কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সুবিধা থেকেও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তকে যথাসম্ভব স্বাধীন রাখা। সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা টিকিয়ে রাখতে হলে এই স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহি ও পেশাগত নৈতিকতার সমন্বয় অপরিহার্য।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কর্মজীবনে সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চাপ ও আইনি চ্যালেঞ্জের অভিজ্ঞতা ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার প্রশ্নে বিরোধ, ওয়েবসাইট বন্ধ থাকার ঘটনা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের বিষয়গুলো সংবাদমাধ্যমটির ইতিহাসে স্থান পেয়েছে। ২০২৪ সালে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি মামলা প্রত্যাহারের খবরও প্রকাশিত হয়।

এসব ঘটনা থেকে একটি বৃহত্তর বাস্তবতা সামনে আসে: সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কোনো একজন সম্পাদকের ব্যক্তিগত সাহসের ওপর নির্ভর করে থাকতে পারে না। এর জন্য প্রয়োজন কার্যকর আইনগত সুরক্ষা, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠান, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের অধিকারকে সম্মান করে এমন পরিবেশ। একজন সম্পাদক তাঁর অবস্থান দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন; কিন্তু সেই দৃষ্টান্তকে টেকসই করতে পারে সম্মিলিত পেশাগত উদ্যোগ ও প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা।

প্রযুক্তি বদলেছে, সাংবাদিকতার দায় বদলায়নি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রার সময় ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদ প্রকাশ বাংলাদেশের জন্য নতুন অভিজ্ঞতা ছিল। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় সংবাদ প্রক্রিয়াকরণ, ভিডিও ও মোবাইল সাংবাদিকতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সংবাদ পরিবেশনের নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। প্রযুক্তি সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার গতি বাড়িয়েছে, কিন্তু নির্ভুলতা ও প্রাসঙ্গিকতার নিশ্চয়তা দেয়নি।

এখন একটি ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তার ছবি, ভিডিও ও নানা ব্যাখ্যা ছড়িয়ে পড়তে পারে। এর মধ্যে কোনটি সত্য, কোনটি পুরোনো, কোনটি সম্পাদিত কিংবা কোনটি ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে নেওয়া -তা যাচাই করা সাংবাদিকতার অপরিহার্য কাজ। দ্রুততার প্রতিযোগিতায় ভুল তথ্য প্রকাশের ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সংবাদকক্ষের যাচাই-ব্যবস্থা, ডিজিটাল অনুসন্ধানী দক্ষতা এবং সম্পাদনাগত সতর্কতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী প্রযুক্তিকে সাংবাদিকতার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সংবাদ পরিবেশনের নতুন সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে শিশুদের জন্য ‘কিডজ’ ও শিশু সাংবাদিকদের প্ল্যাটফর্ম ‘হ্যালো’র মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। মোবাইল ফোনে সংবাদ পৌঁছে দেওয়ার সেবাও ছিল পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগের ধরন পরিবর্তনের প্রচেষ্টার অংশ।

এই উদ্যোগগুলোর তাৎপর্য কেবল নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরিতে সীমাবদ্ধ নয়। এগুলো দেখায়, সংবাদমাধ্যমকে নতুন পাঠক, নতুন প্রযুক্তি এবং নতুন ধরনের অংশগ্রহণের জন্য নিজেদের প্রস্তুত রাখতে হয়। ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার জন্য এই মানসিকতা গুরুত্বপূর্ণ-প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলানো, কিন্তু তথ্য যাচাই, নৈতিকতা ও জনস্বার্থের প্রশ্নে আপস না করা।

একজন সম্পাদক, অনেক শিক্ষার্থী

তাঁর সাবেক সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আরেকটি পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-তিনি ছিলেন অনেক সাংবাদিকের পেশাগত জীবনের পথপ্রদর্শক। কেউ তাঁর কাছ থেকে সংবাদ লেখার কৌশল শিখেছেন, কেউ সংবেদনশীল প্রতিবেদন উপস্থাপনের পদ্ধতি, আবার কেউ শিখেছেন চাপের মধ্যে কীভাবে সাংবাদিক হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হয়।

সাংবাদিকতার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাত্ত্বিক জ্ঞান ও পেশাগত ভিত্তি তৈরি করে। কিন্তু সংবাদকক্ষে প্রতিদিনের সিদ্ধান্ত, ভুল থেকে শেখা, সূত্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, তথ্য যাচাই এবং সম্পাদনার বাস্তব অভিজ্ঞতা একজন সাংবাদিকের দক্ষতাকে পরিণত করে। একজন অভিজ্ঞ সম্পাদক এই শেখার পরিবেশ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর পর তাঁর সাবেক সহকর্মীদের বক্তব্যে যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আস্থা ও শিক্ষার অভিজ্ঞতার কথা উঠে এসেছে, তা সাংবাদিকতা পেশায় মেন্টরশিপের গুরুত্বও তুলে ধরে। তবে এই শিক্ষা কোনো একজন ব্যক্তির সঙ্গে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। সংবাদকক্ষে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের কাছ থেকে নবীনদের শেখার সুযোগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সম্পাদকীয় আলোচনা এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলাই হবে তাঁর রেখে যাওয়া কাজের একটি অর্থবহ ধারাবাহিকতা।

ব্যক্তির স্মৃতি থেকে প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রয়াণে শোক প্রকাশের পাশাপাশি তাঁর কাজের সমালোচনামূলক ও প্রাসঙ্গিক মূল্যায়নও প্রয়োজন। কোনো সাংবাদিক বা সম্পাদককে স্মরণ করার অর্থ তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রশ্নাতীত ধরে নেওয়া নয়। বরং তাঁর কাজের অবদান, সীমাবদ্ধতা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা-সবকিছুকে পেশাগত আলোচনার অংশ করা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সামনে এখন তাৎক্ষণিক শোক সামলে সম্পাদকীয় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের নেতৃত্ব গড়ে তোলার দায়িত্ব রয়েছে। সংবাদ যাচাই, সূত্রের স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষ উপস্থাপন, ভুল সংশোধন এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মতো নীতিগুলোকে আরও সুসংহত করা জরুরি। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, নতুন প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং সংবাদমাধ্যমের আর্থিক ও সম্পাদকীয় স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়গুলোও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন।

এই দায়িত্ব শুধু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি সংবাদমাধ্যমের জন্যই এটি প্রাসঙ্গিক। কারণ, সাংবাদিকতার সংকট কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; আবার কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্যও সামগ্রিক সংবাদপরিসরের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। প্রয়োজন সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে পেশাগত মান, নৈতিকতা, স্বাধীনতা ও জনজবাবদিহির বিষয়ে বৃহত্তর ঐকমত্য।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মৃত্যুর খবরটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের দুই দশক পূর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এই সময়ের ব্যবধান যেন তাঁর কর্মজীবনের একটি প্রতীকী সমাপ্তি—একটি যাত্রা, যার শুরুতে ছিল অনলাইন সাংবাদিকতার সম্ভাবনা, আর শেষ প্রান্তে রয়েছে সেই সম্ভাবনাকে টেকসই ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার দায়িত্ব।

তাঁর অনুপস্থিতিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সংবাদকক্ষে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা ব্যক্তিগত স্মৃতি দিয়ে অনুভব করা যায়; কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারকে বাঁচিয়ে রাখার মাপকাঠি হবে পেশাগত চর্চা। কত দ্রুত সংবাদ প্রকাশিত হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সংবাদটি কতটা যাচাই করা, কতটা ন্যায্য এবং কতটা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট। কত বড় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলো, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে সেই প্রযুক্তি সাংবাদিকতার মান উন্নয়নে কতটা কাজে লাগল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের অংশীদার ছিলেন। তাঁর মৃত্যু সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; বরং তাঁর প্রতিষ্ঠিত চর্চাগুলোকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করার নতুন দায়িত্বের সূচনা। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে-সংবাদকে সংবাদ হিসেবেই রাখা, তথ্যের উৎস ও সত্যতা নিয়ে আপসহীন থাকা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও জনস্বার্থের পক্ষে পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাওয়া।