আরেকটি বিপ্লবের প্রস্তুতির আহ্বান মাহমুদুর রহমানের

জাতীয় প্রেসক্লাবে এবি পার্টির আয়োজিত জুলাই সনদবিষয়ক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।
জাতীয় প্রেসক্লাবে এবি পার্টির আয়োজিত জুলাই সনদবিষয়ক মতবিনিময় সভায় বক্তব্য দিচ্ছেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক মাহমুদুর রহমান।

মুক্তমন রিপোর্ট : জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটলেও তরুণ প্রজন্মের রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা এখনো পূরণ হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন দৈনিক আমার দেশ-এর সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেছেন, জুলাইয়ের চেতনা ও অর্জন ধরে রাখতে আরেকটি বিপ্লবের প্রস্তুতি নিতে হবে।

বুধবার (৪ নভেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) আয়োজিত ‘বছর পেরিয়ে জুলাই সনদ: গণ-অভ্যুত্থানের তরুণ অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়’ শীর্ষক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহমুদুর রহমান বলেন, জেন-জি ফ্যাসিবাদের আইকনকে পরাজিত করতে সফল হয়েছে। তবে রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তরুণেরা দেখেছিলেন, তা বাস্তবায়িত হয়নি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো এক দিনের ঘটনা নয়, বরং একটি চলমান প্রক্রিয়া। শহীদদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক বাস্তবতা ধরে রাখতে আরও একটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি প্রয়োজন।

জুলাই সনদ প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, সনদ তৈরির প্রক্রিয়ায় ভুল ছিল। রাজনৈতিক পরিপক্বতা থাকলে জুলাই সনদের আগে নির্বাচন দেওয়া হতো না। নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে স্বাক্ষরের প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের অগ্রাধিকার নির্ধারণে সমস্যা ছিল। তরুণেরা রাষ্ট্র সংস্কার চাইলেও তাদের আকাঙ্ক্ষা যথাযথভাবে অনুধাবন করা হয়নি। তাঁর মতে, সরকারটি জুলাইয়ের পক্ষের হলেও অনভিজ্ঞতার কারণে নানা চাপের মুখে পড়েছিল। জুলাইয়ের তরুণ সংগঠনগুলো এবং বিএনপিও সরকারকে যথাযথ সহযোগিতা করেনি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

নির্বাচনের পর জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যে বিভাজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এখন কে দেশের ভেতর থেকে এবং কে দেশের বাইরে থেকে আন্দোলনের নেপথ্যে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা নিয়ে কৃতিত্ব নেওয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন। বিভাজনমূলক বক্তব্যের দায় সরকারকেও নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

জুলাইয়ের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে মাহমুদুর রহমান বলেন, এবি পার্টিসহ বাংলাদেশপন্থি দলগুলোকে এক জায়গায় আসতে হবে। এ লক্ষ্যে একটি জাতীয় কনভেনশন আয়োজন করা যেতে পারে। বিভাজন অব্যাহত থাকলে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা কঠিন হবে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আবু সাঈদ শুধু বাংলাদেশের নন, গোটা বিশ্বের আইকন। জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগের কারণেই বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। তাই জুলাইয়ের চেতনা ও অর্জনকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে।

সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, বর্তমান সংবিধান এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব নয়। রাষ্ট্র মেরামতের জন্য নতুন করে সনদ তৈরি করতে হবে। সেই সনদে চার কোটি মানুষের স্বাক্ষর নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব দেন তিনি। রাষ্ট্র সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণকে প্রকৃত অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠার ওপরও গুরুত্ব দেন মঞ্জু।

অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, অদক্ষতা ও অনভিজ্ঞতার কারণে ড. ইউনূসের সরকারকে উপহাস করে ‘এনজিওগ্রাম সরকার’ বলা হতো। অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার কারণে বর্তমান সরকারকেও অনেকে ‘লন্ডনী-গো’ সরকার বলছে।

মঞ্জু আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ রুখতে গণ-অভ্যুত্থানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক বিপ্লব প্রয়োজন। গণ-অভ্যুত্থান কিংবা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সব সমস্যার সমাধান হয়নি; বরং সংকট আরও ঘনীভূত হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের বলা হচ্ছে, আন্দোলনের পর রাষ্ট্র নিয়ে আর ভাবার প্রয়োজন নেই, তাঁদের পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে হবে। কোনো কোনো রাজনীতিবিদ তরুণদের অবদানকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তাজুল ইসলাম বলেন, ১৭ বছর ধরে যে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব হয়নি, তরুণেরা তা পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর ভাষায়, ফ্যাসিবাদী শাসকগোষ্ঠীকে লক্ষ্মণ সেনের মতো দুপুরের খাবার ফেলে পালিয়ে যেতে হয়েছিল।

জুলাই সনদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সংবিধান ও প্রচলিত আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে জুলাই বিপ্লব হয়নি; এটি ছিল আইনি সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে জনগণের অভ্যুত্থান। আইন ও সংবিধানের দোহাই দিয়ে জুলাই সনদ অমান্য করা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাই সনদ তাঁদের কাছে ‘রেড লাইন’।

দৈনিক ওয়াদা-এর সম্পাদক ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, জুলাইকে শুধু রাজনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও ছড়িয়ে দিতে হবে। আওয়ামী ফ্যাসিবাদ যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য সাংস্কৃতিক আন্দোলন জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদ কীভাবে তৈরি হয় এবং এর পেছনে কারা ভূমিকা রাখে, তা চিহ্নিত করতে হবে। জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করা প্রয়োজন।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জুর সভাপতিত্বে সভায় আরও বক্তব্য দেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান, এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন, তারুণ্যের জুলাই ফাউন্ডেশনের নেতা সাগর উদ্দিন, পুসাবের সংগঠক তালহা বিন আমীন, জুলাই ঐক্যের নেতা রিয়াদুস ইসলাম জুবা এবং জুলাই যোদ্ধা লাবিব।

সভা সঞ্চালনা করেন এবি যুব পার্টির সদস্যসচিব হাদীউজ্জামান খোকন। এতে এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন।

Muktomon/TA