রনজিৎ সরকার রাজ : দিনাজপুরের বীরগঞ্জে হিমাগারে আলু সংরক্ষণে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন আলুচাষী ও ব্যবসায়ীরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যে ভাড়া আদায় না হলে কৃষক-শ্রমিক-জনতা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
কৃষক ও আলু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বীরগঞ্জের একাধিক হিমাগারে সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ থাকলেও হিমাগার মালিক কর্তৃপক্ষ অভিযোগ আমলে নিচ্ছে না বলে দাবি করেছেন তারা।
বীরগঞ্জের ২৫ মাইল এলাকার সততা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী নুর ইসলামসহ কয়েকজন আলু ব্যবসায়ী জানান, তারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি ভাড়া দিতে রাজি নন। তাদের অভিযোগ, দলুয়া এলাকার শাহী হিমাগার-২সহ কয়েকটি হিমাগারে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
ব্যবসায়ীদের দাবি, ৬০ কেজির প্রতি বস্তা আলু সংরক্ষণের জন্য কোথাও ৪২০ টাকা পর্যন্ত রশিদের মাধ্যমে নেওয়া হয়েছে। অথচ গত ৩১ আগস্ট আলু সংরক্ষণের জন্য সরকার প্রতি কেজি ৬ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। সে হিসাবে ৬০ কেজির একটি বস্তার নির্ধারিত ভাড়া ৩৬০ টাকা।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ৪২০ টাকা ভাড়া নেওয়া হলে প্রতি বস্তায় অতিরিক্ত ৬০ টাকা আদায় হচ্ছে। তাদের দাবি, এভাবে বিপুল পরিমাণ আলু সংরক্ষণের কারণে অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণও কয়েক কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বর সরেজমিনে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, শাহী হিমাগার দলুয়া, শাহী হিমাগার হাবলুহাট, হিমাদ্রি লিমিটেড চাকাই, রাহবার কোল্ড স্টোরেজ বটতলী এবং দেওয়ানবাড়ী কোল্ড স্টোরেজ দলুয়ায় মোট প্রায় ১২ লাখ ১৬ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষিত রয়েছে।
প্রতি বস্তায় ৬০ টাকা অতিরিক্ত আদায়ের হিসাব ধরলে মোট অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৭ কোটি ২৯ লাখ ৬ হাজার টাকা। তবে সংশ্লিষ্ট হিমাগারগুলোর কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা প্রতি বস্তায় ৩৯০ টাকা করে ভাড়া নিচ্ছেন। ফলে প্রকৃত অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগের বিষয়ে সরেজমিনে শাহী হিমাগার-২-এ গিয়ে ম্যানেজার মনির হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে হিমাগারের হিসাবরক্ষক সামিউল ইসলাম অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ইতোমধ্যে সংরক্ষণকারীদের অতিরিক্ত আদায় করা টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রাপ্তিস্বীকার ফরমে স্বাক্ষর নিয়ে প্রতি বস্তায় ৩০ টাকা করে ফেরত দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শাহী হিমাগার হাবলুহাটের ম্যানেজার হিরুর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে, দেওয়ানবাড়ী কোল্ড স্টোরেজ দলুয়ার ম্যানেজার ফাহিম হোসেন, রাহবার কোল্ড স্টোরেজ বটতলীর ম্যানেজার রুবেল ইসলাম এবং হিমাদ্রি কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেড চাকাইয়ের ম্যানেজার নুরন্নবী জানান, শুরু থেকে এখন পর্যন্ত প্রতি বস্তা আলুর জন্য ৩৯০ টাকা করে রশিদের মাধ্যমে ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। তাদের দাবি, মালিকপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী এই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে দেওয়ানবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের মো. কামাল হোসেনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলে তিনি জানান, সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির আগেই বীরগঞ্জের কোল্ড স্টোরেজ মালিকরা প্রতি বস্তা আলুর জন্য ৩৯০ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখনো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
কামাল হোসেন আরও বলেন, বীরগঞ্জের তুলনায় দেশের অন্যান্য এলাকায় আলু সংরক্ষণের ভাড়া আরও বেশি নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে জেলা কৃষি বিপণন কার্যালয়ের সিনিয়র অফিসার রবিউল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তারা পেয়েছেন। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ না হওয়ায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বীরগঞ্জের সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন।
এদিকে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত ভাড়ায় আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হয়ে থাকলে তা ফেরত দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় কৃষক-শ্রমিক-জনতা ও ব্যবসায়ীদের নিয়ে আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ক্ষুব্ধরা।